নকল প্রসাধনী জব্দ করে একটি সক্রিয় চক্র ভেঙে দিল কোহিমা পুলিশ। নাগাল্যান্ডের রাজধানী কোহিমার রাঝু পয়েন্ট ও ওয়াই-জাংকশন এলাকায় পাঁচটি দোকানে তল্লাশি চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ভেজাল সৌন্দর্য পণ্য উদ্ধার করা হয়েছে — যেগুলো লাকমে-সহ দেশের সুপরিচিত ব্র্যান্ডের নাম জাল করে বাজারে বিক্রি হচ্ছিল। এই ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তারা বর্তমানে বিচারিক হেফাজতে রয়েছেন। ঘটনাটি শুধু নাগাল্যান্ডে সীমাবদ্ধ নয় — আসাম ও বরাক উপত্যকার মতো পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের বাজারগুলোতেও এই ধরনের ভুয়া প্রসাধনী সহজেই ঢুকে পড়ে, তাই লালা ও হাইলাকান্দির ক্রেতাদের সতর্ক থাকা এখন জরুরি।
কীভাবে উদ্ধার হল, কী মামলা দায়ের হয়েছে?
কোহিমা পুলিশের PRO জানিয়েছেন, বেশ কিছুদিন ধরে বিশ্বস্ত সূত্র থেকে খবর আসছিল যে শহরের কয়েকটি দোকানে সন্দেহজনক নকল প্রসাধনী বিক্রি হচ্ছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে নর্থ থানার পুলিশ রাঝু পয়েন্ট ও ওয়াই-জাংকশনের পাঁচটি দোকানে একযোগে তল্লাশি পরিচালনা করে। দোকানগুলো থেকে বড় পরিমাণ প্রসাধনী পণ্য জব্দ করা হয় — যেগুলো লাকমে ব্র্যান্ডের মোড়কে বিক্রি হচ্ছিল, কিন্তু আসল পণ্যের সাথে এগুলোর কোনো সম্পর্ক ছিল না।
মামলাটি নথিভুক্ত হয়েছে নর্থ থানায়, কেস নম্বর ০০১১/২০২৬। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS) ২০২৩-এর ধারা ৩১৮(৪) এবং কপিরাইট আইন ১৯৫৭-এর ধারা ৬৩-এর অধীনে মামলা দায়ের হয়েছে। BNS-এর ৩১৮(৪) ধারাটি প্রতারণামূলক বিক্রয় সম্পর্কিত — যেখানে পণ্যকে অন্য পণ্য বলে মিথ্যাভাবে উপস্থাপন করার অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। কপিরাইট আইনের লঙ্ঘনে আলাদা শাস্তির সম্মুখীন হবেন অভিযুক্তরা। পুলিশ জানিয়েছে, নকল প্রসাধনীর সরবরাহ নেটওয়ার্ক কোথা থেকে পরিচালিত হচ্ছে তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত অব্যাহত আছে।
নকল প্রসাধনী কেন বিপজ্জনক — স্বাস্থ্য ঝুঁকির বাস্তবতা
নকল প্রসাধনী জব্দের ঘটনাটি একটি গভীর স্বাস্থ্য সমস্যার দিকে আঙুল তুলছে। কোহিমা পুলিশ তাদের বিবৃতিতে স্পষ্ট জানিয়েছে: “এই ধরনের ভুয়া প্রসাধনী বিক্রি শুধু বৈধ কোম্পানিগুলোর মেধাসম্পত্তির লঙ্ঘন নয় — এতে ক্ষতিকর ও অনিয়ন্ত্রিত উপাদান থাকার কারণে ভোক্তাদের মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হয়।”
বিশেষজ্ঞরা বলেন, নকল প্রসাধনীতে প্রায়ই অতিরিক্ত পারদ, সীসা, আর্সেনিক, ক্ষতিকর রং এবং নিষিদ্ধ রাসায়নিক মেশানো থাকে — যা ত্বকে র্যাশ, অ্যালার্জি, রাসায়নিক পোড়া এবং দীর্ঘমেয়াদে কিডনি ও লিভারের ক্ষতি করতে পারে। ভারতের Drug Controller General-এর নেতৃত্বে ২০১৮ সালে আটটি রাজ্যে পরিচালিত অভিযানে দেখা গিয়েছিল, জব্দ করা নকল প্রসাধনীতে মানব শরীরের জন্য ক্ষতিকর স্টেম সেল উপাদান ও নিষিদ্ধ উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছিল। এই সমস্যা দেশজুড়ে। মাত্র ক’দিন আগে, ১৩ এপ্রিল দিল্লির সঞ্জয় গান্ধী ট্রান্সপোর্ট নগরে একটি নকল প্রসাধনী তৈরির কারখানা উদ্ধার হয় — সেখান থেকে ২০,০০০-এরও বেশি ভুয়া হেয়ার রিমুভাল ক্রিমের টিউব জব্দ করা হয়।
লালা ও হাইলাকান্দির ক্রেতাদের জন্য সতর্কবার্তা
কোহিমার এই নকল প্রসাধনী জব্দের ঘটনা উত্তর-পূর্ব ভারতের একটি বৃহত্তর সমস্যাকে সামনে এনেছে। নাগাল্যান্ড, মণিপুর, আসাম ও মিজোরামের মতো রাজ্যগুলোতে মিয়ানমার ও চীনের সীমান্ত দিয়ে অনিয়ন্ত্রিত পণ্য সহজেই প্রবেশ করে — এবং সেগুলো স্থানীয় বাজারে বিভিন্ন নামী ব্র্যান্ডের মোড়কে বিক্রি হয়। হাইলাকান্দি জেলার লালা বাজার, হাইলাকান্দি সদর বা কাটলিছড়ার বাজারেও এই ধরনের ভুয়া পণ্য পৌঁছানোর সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
কোহিমা পুলিশ ভোক্তাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন — যা লালা ও হাইলাকান্দির পাঠকদের জন্যও সমান কার্যকর:
- কিনুন কেবল অনুমোদিত বিক্রেতার কাছ থেকে — পরিচিত ও নির্ভরযোগ্য দোকান থেকে কিনুন, অপরিচিত উৎস থেকে কেনা এড়িয়ে চলুন
- পণ্যের মোড়ক ভালো করে যাচাই করুন — বানান ভুল, ঝাপসা লোগো বা অস্পষ্ট ছাপা নকল পণ্যের প্রথম লক্ষণ
- দাম অস্বাভাবিক কম হলে সন্দেহ করুন — নামী ব্র্যান্ডের পণ্য বাজার দরের চেয়ে অনেক কম দামে পাওয়া গেলে সতর্ক হন
- Batch নম্বর ও উৎপাদনের তারিখ মিলিয়ে নিন — ব্র্যান্ডের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট বা QR কোড দিয়ে পণ্য যাচাই করার সুযোগ থাকলে সেটি ব্যবহার করুন
- সন্দেহজনক পণ্য দেখলে জানান — নিকটস্থ থানায় বা জেলা প্রশাসনকে জানান
নকল প্রসাধনীর বিরুদ্ধে লড়াই শুধু পুলিশের কাজ নয় — সচেতন ভোক্তারাই এই চক্রকে ভেঙে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। কোহিমার মামলাটি তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে এবং পুলিশ সরবরাহ নেটওয়ার্কের মূল হোতাদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে। যদি দেখা যায় যে কোহিমার এই চক্রটি আসামের বাজারেও পণ্য সরবরাহ করত, তাহলে আসামের পুলিশও একই সুতোয় তদন্ত শুরু করতে পারে। এই ঘটনা থেকে একটি বার্তা স্পষ্ট — কম দামে বেশি পাওয়ার লোভে ত্বকের স্বাস্থ্য বিপদে ফেলা কোনোভাবেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়।