Read today's news --> Click here

বিশ্ব ঐতিহ্য দিবস ২০২৬: সংঘাত ও দুর্যোগে জীবন্ত সাংস্কৃতিক সংরক্ষণের বৈশ্বিক আহ্বান ১৮ এপ্রিল

বিশ্ব ঐতিহ্য দিবস ২০২৬ শনিবার ১৮ এপ্রিল বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে — এবার এই দিনটির মূল সুর হলো সংঘাত ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাঝেও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখার জরুরি প্রয়োজনীয়তা। ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অন মনুমেন্টস অ্যান্ড সাইটস (ICOMOS) এ বছরের থিম নির্ধারণ করেছে: “Emergency Response for Living Heritage in Contexts of Conflicts and Disasters” — অর্থাৎ সংঘাত ও দুর্যোগের প্রেক্ষাপটে জীবন্ত ঐতিহ্যের জন্য জরুরি সাড়া দেওয়া। সারা পৃথিবীতে সরকার, হেরিটেজ সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সচেতন নাগরিকরা আজকের দিনটিকে ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি পুনরায় ঘোষণার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছেন।

কেন এই থিম এবার, কেন এটি এত জরুরি

বিশ্ব ঐতিহ্য দিবস ২০২৬-এর থিম নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয় — এর পেছনে রয়েছে একটি তীব্র বাস্তবতা। ইউক্রেন থেকে গাজা, সিরিয়া থেকে সুদান — বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান সংঘাত অসংখ্য ঐতিহাসিক স্থাপনা, সাংস্কৃতিক নিদর্শন এবং মানুষের মুখের লোককথা ও হাতের কারুশিল্প চিরতরে ধ্বংস করে দিচ্ছে। ICOMOS-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী “জীবন্ত ঐতিহ্য” বা Living Heritage কেবল পাথরের দেওয়াল বা প্রাচীন মন্দির নয় — এর মধ্যে পড়ে মৌখিক ঐতিহ্য, লোকশিল্প, সামাজিক উৎসব-অনুষ্ঠান, প্রকৃতি ও মহাবিশ্ব সংক্রান্ত সম্প্রদায়গত জ্ঞান এবং কারিগরি দক্ষতাও। এই অদৃশ্য ঐতিহ্যগুলো প্রায়ই পাথরের চেয়েও দ্রুত হারিয়ে যায়, কারণ এগুলো বেঁচে থাকে কেবল মানুষের মধ্যে — আর মানুষই যখন বাস্তুচ্যুত হয়, তখন তাদের সঙ্গে সেই ঐতিহ্যও উড়ে যায়।

এ বছরের থিমটি ICOMOS-এর ৬০ বছরের সংকটকালীন ঐতিহ্য রক্ষার অভিজ্ঞতা থেকে সরাসরি উৎসারিত। ২০২৫ সালের ICOMOS প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছিল যে প্রতিরোধ, প্রশমন, প্রস্তুতি, জরুরি সাড়া ও পুনরুদ্ধার — এই পাঁচটি ধাপে ঐতিহ্য সংরক্ষণের সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। ২০২৬ সালে সেই বার্তাকে আরও প্রসারিত করা হয়েছে, সংকটের মাঝেই সক্রিয় সংরক্ষণের উপর জোর দিয়ে।

বিশ্ব ঐতিহ্য দিবসের ইতিহাস ভারতের অবস্থান

বিশ্ব ঐতিহ্য দিবস ২০২৬ পালনের পেছনে রয়েছে একটি চার দশকের পুরনো উদ্যোগ। ১৯৮২ সালের ১৮ এপ্রিল তিউনিশিয়ার হামামেতে ICOMOS-এর সিম্পোজিয়ামে প্রথমবার এই দিনটি পালনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। পরে ১৯৮৩ সালে UNESCO-এর ২২তম সাধারণ অধিবেশনে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয় এবং তখন থেকে প্রতি বছর ১৮ এপ্রিল “আন্তর্জাতিক স্মারক ও স্থান দিবস” নামে পালিত হয়ে আসছে।

ভারতের জন্য এই দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম। ২০২৬ সালের হিসাবে ভারতে UNESCO স্বীকৃত ৪৩টি (কিছু সূত্রে ৪৪টি) বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান রয়েছে — যার মধ্যে তাজমহল, সুন্দরবন, অজন্তা-ইলোরার গুহা, কাজিরাঙ্গা জাতীয় উদ্যান, মানস বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এবং সাম্প্রতিকভাবে নালন্দা মহাবিহার প্রত্নস্থানও স্থান পেয়েছে। প্রতি বছর এই দিনে ASI (আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া) সংরক্ষিত স্থানগুলোতে বিনা মূল্যে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়, হেরিটেজ ওয়াক, প্রদর্শনী ও বিশেষজ্ঞ বক্তৃতার আয়োজন করা হয়। INTACH-সহ বিভিন্ন সংস্থা এই দিনটিকে জনসচেতনতা বাড়ানোর প্রধান উপলক্ষ হিসেবে ব্যবহার করে।

আসাম বরাক উপত্যকার ঐতিহ্য: রক্ষার দায়িত্ব আমাদের

বিশ্ব ঐতিহ্য দিবস ২০২৬-এর বার্তা আসাম ও বরাক উপত্যকার জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। আসামে রয়েছে দুটি UNESCO বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান — কাজিরাঙ্গা জাতীয় উদ্যান (১৯৮৫) এবং মানস বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য (১৯৯০)। এর বাইরে সমগ্র রাজ্যজুড়ে রয়েছে অসংখ্য প্রত্নস্থান, বাঁশ-বেত শিল্প, বিহু নৃত্যের ঐতিহ্য, তাঁতের গামোছা ও মেখেলা-চাদরের হস্তশিল্প, এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মৌখিক লোকসাহিত্য — যেগুলো জীবন্ত ঐতিহ্যের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

বরাক উপত্যকায় হাইলাকান্দি জেলার লালা টাউনসহ এই অঞ্চলে বাংলা সংস্কৃতির গভীর শিকড় রয়েছে। লোকগান, পুঁথিপাঠ, বাউল, ঢোলের তাল, এবং রাঢ়বঙ্গ থেকে আসা নানা লোকাচার এই উপত্যকায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বেঁচে আছে। কিন্তু শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও তরুণ প্রজন্মের শহরমুখিতার কারণে এই জীবন্ত ঐতিহ্যগুলো আজ সংকটের মুখে। আজকের বিশ্ব ঐতিহ্য দিবসে ICOMOS-এর থিম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ঐতিহ্য রক্ষা শুধু সরকার বা বিশেষজ্ঞদের কাজ নয় — এটি প্রতিটি সম্প্রদায়ের দায়িত্ব।

বিশ্ব ঐতিহ্য দিবস ২০২৬-এর মূল বার্তা হলো, ঐতিহ্য রক্ষার জন্য শান্তিকালের পরিকল্পনা যথেষ্ট নয় — সংকটের মাঝেও যেন ঐতিহ্য রক্ষার ব্যবস্থা সক্রিয় থাকে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে শুরু করে স্থানীয় সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী — সবাইকে একযোগে এই কাজে এগিয়ে আসতে হবে। পৃথিবীজুড়ে যতদিন সংঘাত ও দুর্যোগ থাকবে, ততদিন এই দিনটির প্রাসঙ্গিকতা কমবে না — বরং বাড়তেই থাকবে।

বিশ্ব ঐতিহ্য দিবস ২০২৬: সংঘাত ও দুর্যোগে জীবন্ত সাংস্কৃতিক সংরক্ষণের বৈশ্বিক আহ্বান ১৮ এপ্রিল
Scroll to top