ডিমা হাসাও দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং পানীয় জল সরবরাহ প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে গত ১২ জুন নর্থ কাছাড় হিলস অটোনমাস কাউন্সিল (NCHAC)-এর সচিবালয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো। অসমের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল, পার্বত্য অঞ্চল এবং বরাক উপত্যকা উন্নয়ন বিভাগের মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পল এই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। বর্ষার আগে জেলার প্রস্তুতির মাত্রা বোঝা এবং জল জীবন মিশনের আওতায় চলমান প্রকল্পগুলির বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়নই ছিল এই সফরের প্রধান উদ্দেশ্য ।
বর্ষার আগে ডিমা হাসাও দুর্যোগ প্রস্তুতি পর্যালোচনা
বৈঠকে জেলা প্রশাসন, স্বায়ত্তশাসিত কাউন্সিল এবং বিভিন্ন সরকারি বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। District Disaster Management Authority-র কর্মকর্তারা মন্ত্রীকে বর্তমান প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং জরুরি সাড়া দেওয়ার কাঠামো সম্পর্কে বিস্তারিত অবহিত করেন। বৈঠকে বন্যা, ঝড় এবং ভূমিধসের মতো মৌসুমি দুর্যোগ মোকাবিলায় কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা পুনরায় খতিয়ে দেখা হয় ।
ডিমা হাসাও অসমের সবচেয়ে দুর্যোগপ্রবণ জেলাগুলির একটি। ২০২২ সালে প্রলয়ঙ্করী বন্যা ও ভূমিধসে জেলার গত ৫–১০ বছরে গড়ে ওঠা বেশিরভাগ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যায় বলে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা স্বীকার করেছিলেন । সেই অভিজ্ঞতার পর থেকে রাজ্য সরকার প্রতিটি বর্ষার আগে জেলার প্রস্তুতি পর্যালোচনাকে বাধ্যতামূলক করেছে। অসম স্টেট ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (ASDMA) এবং ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (GSI) সঙ্গে চুক্তির আওতায় ডিমা হাসাও এবং কাছাড় জেলায় ভূমিধসের আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা তৈরির কাজও চলছে ।
জল জীবন মিশন: বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ
বৈঠকে জল সংরক্ষণ, পানীয় জল সরবরাহ এবং কেন্দ্রের “হর ঘর নল সে জল” কর্মসূচির অগ্রগতি নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, জল জীবন মিশন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে স্বায়ত্তশাসিত কাউন্সিলের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয় প্রয়োজন ।
বৈঠকে MLA রুপালি লংথাসা পার্বত্য জেলায় জল সরবরাহ প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক জটিলতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, যেকোনো প্রকল্প হাতে নেওয়ার আগে বিস্তারিত জরিপ অপরিহার্য। মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পল জানান, যেসব জল জীবন মিশন প্রকল্প অকার্যকর অবস্থায় পড়ে আছে, সেগুলি পরিদর্শন করা হবে এবং Public Works ও Public Health Engineering বিভাগকে সমন্বয় বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ।
পার্বত্য অঞ্চলে জল সরবরাহ প্রকল্প বাস্তবায়ন সমতল ভূমির তুলনায় অনেক বেশি কঠিন। দুর্গম পাহাড়ি পথ, ঘন ঘন ভূমিধস এবং অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ—এই তিন সমস্যা মিলিয়ে ডিমা হাসাওয়ে পাইপলাইন নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ দুটিই চ্যালেঞ্জের। মন্ত্রীর এই সফর সেই বাস্তবতাকে স্বীকার করেই সমাধানের পথ খোঁজার চেষ্টা।
কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও আলোচনায়
সরকারি কাজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির বিষয়টিও বৈঠকে উঠে আসে। মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পল স্পষ্ট বলেন, যেসব ঠিকাদার নির্ধারিত কাজে অবহেলা করবেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় । একই বৈঠকে জেলার কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রসঙ্গও আসে। স্বায়ত্তশাসিত কাউন্সিলের প্রতিনিধিরা বর্জ্য সংগ্রহ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার প্রস্তাব দেন।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মন্ত্রী পল বলেন, “অভিভাবক মন্ত্রী হিসেবে ডিমা হাসাওয়ে এটি আমার প্রথম সফর। দুর্যোগ প্রস্তুতি, যোগাযোগ পরিকাঠামো এবং জরুরি সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা মূল্যায়নের পাশাপাশি জেলার সামগ্রিক উন্নয়ন ও প্রশাসনিক অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়েছে।” বৈঠকে NCHAC-এর চিফ এক্সিকিউটিভ মেম্বার দেবলাল গরলোসা, কাউন্সিল চেয়ারম্যান মহিত হোজাই, জেলার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন বিভাগের প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির প্রেক্ষিত
ডিমা হাসাওয়ে কী হয় তা শুধু সেই জেলার মানুষের বিষয় নয়—এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বরাক উপত্যকার ওপরও। ডিমা হাসাওয়ের মধ্য দিয়ে যাওয়া জাতীয় সড়ক ও রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে হাইলাকান্দি, কাছাড় এবং করিমগঞ্জ জেলাও কার্যত দেশের বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় । ২০২২ সালে ঠিক এমনটাই হয়েছিল—ভূমিধসে রেল ও সড়কপথ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বরাক উপত্যকায় পণ্য সরবরাহে ব্যাপক সংকট তৈরি হয়েছিল।
লালা টাউন ও হাইলাকান্দির মানুষের কাছে তাই ডিমা হাসাওয়ের দুর্যোগ প্রস্তুতি নিজেদের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। পার্বত্য জেলায় ভূমিধস রোধে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা শক্তিশালী হলে এবং রাস্তা ও রেলপথ দ্রুত পুনর্বহাল রাখার ব্যবস্থা থাকলে সমতলের জেলাগুলির যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি অনেকটাই কমে। মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পলের এই সফর এই পারস্পরিক নির্ভরতার বাস্তবতাকেই তুলে ধরে।
সামনে কী করণীয়
বর্ষামৌসুম ইতিমধ্যে দরজায় কড়া নাড়ছে। ডিমা হাসাওয়ের ভূগোল এবং ভূমিধসপ্রবণ পরিবেশে শুধু বৈঠক করাই যথেষ্ট নয়—মাঠ পর্যায়ে সিদ্ধান্তের দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি। জল জীবন মিশনের অকার্যকর প্রকল্পগুলি চিহ্নিত করে সক্রিয় করার প্রতিশ্রুতি, ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার ঘোষণা এবং বিভাগগুলির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর নির্দেশ—এই তিনটি পদক্ষেপ কার্যকর হলে ডিমা হাসাও এবং পরোক্ষভাবে বরাক উপত্যকার মানুষও এই বর্ষায় কিছুটা বেশি নিরাপদ থাকবেন। এখন নজর থাকবে, প্রশাসনিক আশ্বাস বাস্তব কাজে কতটা পরিণত হয়।