সারা ভারতে আজ ঈদুল আজহা ২০২৬ উদযাপিত হচ্ছে ধর্মীয় উৎসাহ ও আবেগের সঙ্গে। ২০২৬ সালের ২৮ মে দেশের প্রতিটি কোণে মসজিদ, ঈদগাহ ও খোলা মাঠে বিশেষ নামাজ আদায় হয়। মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ নতুন পোশাক পরে প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। ঈদুল আজহা ২০২৬ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
ঈদুল আজহার তাৎপর্য ও কুরবানির রীতি
ঈদুল আজহা ইসলামের অন্যতম প্রধান উৎসব। হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর আল্লাহর পথে সর্বোচ্চ ত্যাগের স্মরণে প্রতি বছর জিলহজ মাসের দশ তারিখে বিশ্বব্যাপী মুসলিম সম্প্রদায় এই উৎসব পালন করে। কুরবানির পশু জবাই করে গোশত তিন ভাগে বিভক্ত করা হয় — একভাগ পরিবারের জন্য, একভাগ আত্মীয়স্বজনের জন্য এবং একভাগ গরিব-দুঃখী মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
দেশজুড়ে মসজিদ ও ঈদগাহে ফজরের পর বিশেষ ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। দিল্লির জামা মসজিদ, হায়দরাবাদের মক্কা মসজিদ, মুম্বাইয়ের মিন্টো রোড ঈদগাহ এবং কলকাতার রেড রোড ময়দানে লক্ষাধিক মানুষ নামাজ আদায় করেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উৎসব পালিত হয়।
ঈদুল আজহা ২০২৬ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু বলেন, “ঈদুল আজহা আমাদের ত্যাগ, সহানুভূতি ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা দেয়। এই উৎসব আমাদের সমাজের সামাজিক বন্ধন আরও মজবুত করে।” প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও দেশবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, “ঈদুল আজহা সকলের জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধির বার্তা বহন করে।”
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঈদুল আজহা উদযাপন
উত্তর ভারতে উত্তর প্রদেশ, বিহার ও রাজস্থানে বিশেষ আয়োজনে ঈদুল আজহা পালিত হচ্ছে। লখনউয়ের ঐতিহাসিক আসফি মসজিদ এবং বারাণসির শাহি মসজিদে হাজার হাজার মুসল্লি একত্রিত হন। উত্তর প্রদেশ সরকার উৎসব উপলক্ষে নিরাপত্তার বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানা গেছে।
দক্ষিণ ভারতে কেরালা, তামিলনাড়ু ও কর্ণাটকে ঈদুল আজহা বিশেষ মাত্রায় উদযাপিত হয়। কেরালায় ঈদ উপলক্ষে রাজ্য সরকার সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে। হায়দরাবাদে ঐতিহ্যবাহী বিরিয়ানি ও হালিমের আয়োজনে উৎসব বিশেষ রূপ নেয়।
পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় রেড রোড ময়দানে বিশাল নামাজের আয়োজন হয়। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঈদুল আজহার শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, “বাংলা সাম্প্রদায়িক সৌহার্দ্যের ভূমি। ঈদুল আজহা আমাদের একতার উৎসব।” রাজ্যে মুসলিম সম্প্রদায়ের পাশাপাশি হিন্দু, খ্রিস্টান ও শিখ সম্প্রদায়ের মানুষরাও ঈদের শুভেচ্ছা জানান।
অসম ও লালা টাউনে ঈদুল আজহার উদযাপন
অসমে ঈদুল আজহা ২০২৬ বিশেষ উৎসাহের মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে। গুয়াহাটির কাটাপাড়া জামে মসজিদ ও হাজো পীরগাছা দরগায় বিশেষ নামাজের আয়োজন হয়। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ঈদুল আজহার শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, “ঈদুল আজহা সামাজিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা বহন করে। অসমের মুসলিম সম্প্রদায়ের উৎসবে রাজ্য সরকারের শুভকামনা রইল।”
বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি জেলা ও লালা টাউনে ঈদুল আজহা ২০২৬ বিশেষ আনন্দ ও ধর্মীয় পরিবেশে পালিত হচ্ছে। লালা টাউনের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ ও ঈদগাহ মাঠে সকাল থেকেই মুসল্লিরা নামাজের জন্য সমবেত হন। স্থানীয় ইমাম মাওলানা আবদুল করিম নামাজের পর খুতবায় বলেন, “ঈদুল আজহা আমাদের ত্যাগ ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা দেয়। আমরা যেন কুরবানির মাধ্যমে নিজেদের লোভ ও স্বার্থ পরিত্যাগ করতে পারি।”
লালা টাউনের বাজারে ঈদের আগেই পশু ক্রয়-বিক্রয়ের জমজমাট আয়োজন হয়। স্থানীয় পশু ব্যবসায়ী সিরাজ উদ্দিন বলেন, “এবারে গরু ও ছাগলের দাম গত বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি। তবে ক্রেতার সংখ্যা ভালো।” হাইলাকান্দির বিভিন্ন গ্রামে কুরবানির পশুর গোশত দরিদ্র পরিবারের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
ঈদুল আজহার সামাজিক বার্তা ও ভবিষ্যৎ প্রভাব
ঈদুল আজহা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয় — এটি সামাজিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য প্রকাশ। কুরবানির গোশত বিতরণের মাধ্যমে সমাজের দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই ঐতিহ্য ইসলামের মূল শিক্ষার প্রতিফলন। ভারতের মতো বহু ধর্মের দেশে ঈদুল আজহা সাম্প্রদায়িক সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার উদাহরণ তৈরি করে।
এ বছর ঈদুল আজহা ২০২৬ পালনে সারা দেশে শান্তি ও সহাবস্থানের যে ছবি দেখা গেছে, তা ভবিষ্যতের জন্যও অনুপ্রেরণাদায়ক। লালা টাউন ও হাইলাকান্দির মতো বহু সম্প্রদায়ের মিলিত এলাকায় এই উৎসব সামাজিক বন্ধনকে আরও মজবুত করে। আগামী বছরগুলোতেও এই ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির ধারা অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।