জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির গুয়াহাটী সফর বাতিল হয়ে গেছে। একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে ২৩ জুন ২০২৬ তারিখের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, আসামে প্রস্তাবিত ভারত-জাপান শীর্ষ বৈঠক এখন দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত। তাকাইচির ১ থেকে ৩ জুলাইয়ের ভারত সফরে সময়স্বল্পতা ও লজিস্টিক সমস্যার কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি তাকাইচির প্রথম ভারত সফর হতে চলেছে l
গুয়াহাটীতে বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনার ঘোষণা আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা কিছুদিন আগেই দিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্যে উত্তর-পূর্ব ভারতের কূটনৈতিক গুরুত্বের একটি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছিল বলে মনে করা হয়েছিল। কিন্তু বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এবং ফার্স্টপোস্টের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, এখন সেই পরিকল্পনা পরিবর্তিত হয়েছে এবং বৈঠকের স্থান গুয়াহাটী থেকে সরে দিল্লিতে আসতে চলেছে।
কেন বাতিল হলো গুয়াহাটী সফর
জাপানের ঘরোয়া রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির কারণে তাকাইচির ভারত সফরের জন্য সময় অত্যন্ত কম। মাত্র তিন দিনের মধ্যে (১–৩ জুলাই) সম্পূর্ণ সফর সম্পন্ন করতে হবে, এবং দিল্লির বাইরে গুয়াহাটীতে যাওয়া ও ফেরার জন্য যে অতিরিক্ত সময় ও আয়োজন দরকার, তা এই সীমিত সূচিতে সম্ভব নয়। বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানিয়েছে, “logistical issues” বা লজিস্টিক সমস্যার কথা উল্লেখ করেই গুয়াহাটী সফর বাতিলের কথা জানানো হয়েছে।
সফর কেবল রাজধানী দিল্লিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তবে কোনো সরকারিভাবে চূড়ান্ত সূচি এখনও প্রকাশ পায়নি, ফলে শেষ পর্যন্ত কোনো পরিবর্তন হয় কিনা তা অনিশ্চিত। এই পরিস্থিতিতে আসামের প্রশাসন ও জনমানসে একটি হতাশার অনুভূতি তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক, কারণ এই সফরকে ঘিরে উত্তর-পূর্বে প্রচুর প্রত্যাশা জমেছিল।
দ্বিপাক্ষিক আলোচনার বিষয়বস্তু কী থাকছে
স্থান পরিবর্তন হলেও মোদী-তাকাইচি বৈঠকের গুরুত্ব কমেনি। জাপান ভারতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখে—বিশেষ করে মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে। এই বৈঠকে মূল আলোচনার বিষয় হবে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, সরবরাহ শৃঙ্খল সহনশীলতা, ক্রিটিক্যাল মিনারেলস এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। চীনের অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে ভারত ও জাপান কীভাবে একসঙ্গে কাজ করতে পারে, তা-ও আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
এছাড়াও, আগে পরিকল্পনা ছিল যে তাকাইচি গুয়াহাটীতে সুজুকি মোটর, টয়োটা সুশো ও ইতোচু সহ ৫০-এরও বেশি জাপানি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে আসবেন। সফরের স্থান পরিবর্তন হলেও এই ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদল আসছেন কিনা তা এখনও নিশ্চিত হয়নি। তবে এই তালিকা থেকেই বোঝা যায়, জাপান উত্তর-পূর্ব ভারতে বিনিয়োগের বিষয়ে কতটা আগ্রহী।
আসাম ও উত্তর-পূর্বের জন্য কী হারাল
২০১৯ সালে তৎকালীন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের আসাম সফর CAA বিরোধী আন্দোলনের কারণে বাতিল হয়েছিল। সেই ঘটনার পর এটি আসামে জাপানের কোনো শীর্ষনেতার দ্বিতীয় বড় সুযোগ ছিল। কিন্তু এবার লজিস্টিক কারণে সেই সুযোগ আবারও হাতছাড়া হলো—যদিও এবার বিষয়টি রাজনৈতিক সংকটজনিত নয়।
ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর একসময় বলেছিলেন, আসাম ভারতের অ্যাক্ট ইস্ট নীতির “স্প্রিংবোর্ড”। ভারত ও জাপান মিলে আসামে ব্রহ্মপুত্রের ওপর ধুবরি-ফুলবাড়ি সেতু নির্মাণ, গুয়াহাটীর জলসরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন প্রকল্পে হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ করেছে বলেও জানা গেছে। এই পটভূমিতে গুয়াহাটীতে শীর্ষ বৈঠক হলে তা কেবল কূটনীতির আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং উত্তর-পূর্বকে বৈশ্বিক উন্নয়ন মানচিত্রে আরও দৃঢ়ভাবে স্থাপন করার একটি সুযোগ হতো।
জাপানের সাবেক রাষ্ট্রদূত সাতোশি সুজুকি বলেছিলেন, উত্তর-পূর্ব ভারত সেই জায়গা যেখানে ভারতের অ্যাক্ট ইস্ট নীতি এবং জাপানের মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক দৃষ্টিভঙ্গি একত্রিত হয়। গুয়াহাটীতে বৈঠক হলে সেই কথার প্রতীকী মূল্য অনেক বেশি থাকত।
বরাক ভ্যালি ও লালা টাউনের দৃষ্টিকোণ
বরাক উপত্যকার মানুষের কাছে এই পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাব তাৎক্ষণিক না হলেও পরোক্ষ তাৎপর্য আছে। গুয়াহাটীতে বৈঠক হলে জাপানি বিনিয়োগকারীরা উত্তর-পূর্বের বিভিন্ন এলাকা সম্পর্কে সরাসরি আগ্রহ দেখাতে পারতেন—যার মধ্যে কাছাড়, হাইলাকান্দি ও করিমগঞ্জের মতো জেলাও থাকত। জাপানের অর্থসহায়তায় পরিকাঠামো প্রকল্প, যোগাযোগ-ব্যবস্থা ও দক্ষতা উন্নয়নে লালা টাউনের মতো ছোট শহরও উপকৃত হতে পারত।
তবে বৈঠক দিল্লিতে হলেও যদি বিনিয়োগ আলোচনা ও প্রকল্প পরিকল্পনায় উত্তর-পূর্বের নাম থাকে, তাহলে বরাক উপত্যকার জন্যও সুযোগের দরজা বন্ধ হয়ে যায় না। JICA-র সহায়তায় আসামে চলমান প্রকল্পগুলো প্রমাণ করে যে জাপান কেবল দিল্লিকেন্দ্রিক নয়—তারা মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে আগ্রহী।
চূড়ান্ত সূচি এখনো সরকারিভাবে ঘোষণা না হওয়ায় আগামী কয়েকদিনের মধ্যে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হবে। মোদী-তাকাইচি বৈঠকটি যেখানেই হোক, ভারত-জাপান সম্পর্কের গতিপথ এবং উত্তর-পূর্বে জাপানি বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ—দুটো বিষয়ই আসামের মানুষ মনোযোগ দিয়ে দেখছেন।