ISRO YUVIKA 2026 কর্মসূচিতে বরাক উপত্যকার মেধাবী কিশোর আবু হাসিম নির্বাচিত হয়ে অঞ্চলজুড়ে আলোড়ন ফেলে দিয়েছেন। শ্রীভূমি জেলার এই নবম শ্রেণির ছাত্র সারা দেশ থেকে আসা এক লক্ষ ছয় হাজারেরও বেশি আবেদনকারীর মধ্যে থেকে মাত্র ৪৫৬ জনের নির্বাচিত তালিকায় জায়গা পেয়েছেন। ২০২৬ সালের মে মাসে দুই সপ্তাহের আবাসিক এই বিজ্ঞান কর্মসূচিতে তিনি অংশ নেন, যা ইসরোর উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মহাকাশ প্রয়োগ কেন্দ্র (NESAC), শিলং-এ আয়োজিত হয়েছিল। এটি কেবল আবু হাসিমের ব্যক্তিগত অর্জন নয়—শ্রীভূমি ও গোটা বরাক অঞ্চলের তরুণ বিজ্ঞান-প্রতিভার জন্য একটি অনুপ্রেরণামূলক মুহূর্ত।
কীভাবে নির্বাচিত হলেন আবু হাসিম
YUVIKA 2026-এ নির্বাচন কোনো সহজ প্রক্রিয়া নয়। ISRO এই কর্মসূচির জন্য একটি বহুস্তরীয় মেধা-মূল্যায়ন পদ্ধতি অনুসরণ করে। অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষার নম্বরকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়—মোট মূল্যায়নের ৫০ শতাংশ নির্ধারিত হয় সেখান থেকেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয় অনলাইন কুইজে পারফরম্যান্স (১০%), বিজ্ঞান মেলা ও সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ (২–১০%), অলিম্পিয়াড সাফল্য (২–৫%), খেলাধুলায় কৃতিত্ব (২–৫%), এবং স্কাউটস, NCC বা NSS সদস্যতা (৫%)।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, পঞ্চায়েত এলাকার গ্রামীণ স্কুলে পড়া শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত ১৫ শতাংশ নম্বর পান। আবু হাসিমের সাফল্যে এই বিভিন্ন মানদণ্ডে তাঁর সামগ্রিক শ্রেষ্ঠত্বের ছাপ স্পষ্ট। দেশের ২৮টি রাজ্য ও ৮টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে মাত্র ৪৫৬ জনকে বেছে নেওয়া হয়েছিল—এর মধ্যে সীমিত আসন নিয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একজন শিক্ষার্থীর থাকাটা নিজেই একটা অর্জন।
YUVIKA কর্মসূচি কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ
ISRO-র YUVIKA কর্মসূচির পুরো নাম YUva VIgyani KAryakram। এটি ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থার একটি প্রধান শিক্ষামূলক উদ্যোগ, যার লক্ষ্য দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মহাকাশ বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে আগ্রহ ও ভিত্তি গড়ে তোলা। এটি নবম শ্রেণি পাস করা স্কুলছাত্রছাত্রীদের জন্য দুই সপ্তাহের আবাসিক কর্মসূচি, যেখানে ISRO-র বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরা সরাসরি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করেন।
২০২৬ সালে এটি ষষ্ঠ সংস্করণ। ১১ মে ২০২৬ তারিখে ISRO চেয়ারম্যান ও মহাকাশ বিভাগের সচিব ড. ভি. নারায়ণন বেঙ্গালুরুর ISRO দেবনহল্লি গেস্ট হাউস থেকে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন এবং কর্মসূচি চলে ২২ মে পর্যন্ত। নয়টি ISRO কেন্দ্র একযোগে এই কর্মসূচি পরিচালনা করেছে, যার মধ্যে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কেন্দ্র হিসেবে শিলং-এর NESAC-ও ছিল।
NESAC-এর ষষ্ঠ সংস্করণে মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম ও নাগাল্যান্ড থেকে ৫২ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন বলে NESAC-এর সরকারি ওয়েবসাইটে জানানো হয়েছে। এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়, উত্তর-পূর্বের অংশগ্রহণ কতটা প্রতিযোগিতামূলক। নির্বাচিত সকল শিক্ষার্থীর দ্বিতীয় শ্রেণির এসি ট্রেনভাড়া বা সমতুল্য বাসভাড়া ISRO বহন করে এবং থাকা-খাওয়া ও পাঠ্যসামগ্রীর সম্পূর্ণ ব্যয় সংস্থা নিজেই দেয়।
বরাক ভ্যালি ও হাইলাকান্দির জন্য অনুপ্রেরণা
আবু হাসিমের এই সাফল্য শ্রীভূমির বাইরে বরাক ভ্যালির সব জেলার জন্য—হাইলাকান্দি, কাছাড় ও করিমগঞ্জের সব তরুণ শিক্ষার্থীর জন্য—একটি বাস্তব প্রমাণ যে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও জাতীয় পর্যায়ের কর্মসূচিতে জায়গা পাওয়া সম্ভব। লালা টাউনসহ হাইলাকান্দি জেলার অনেক স্কুলে বিজ্ঞান শিক্ষার মান উন্নয়নে কাজ চলছে এবং এই ধরনের সাফল্য সেই উদ্যোগকে আরও অর্থবহ করে তোলে।
YUVIKA-তে নির্বাচিত হওয়ার জন্য গ্রামীণ পঞ্চায়েত এলাকার স্কুলের শিক্ষার্থীরা যে অতিরিক্ত নম্বর পান, সেটি এই অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সুযোগ। বরাক ভ্যালির বহু ছাত্রছাত্রী গ্রামীণ স্কুলে পড়েন এবং তাঁরা যদি অষ্টম শ্রেণিতে ভালো ফলাফল করে এবং সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমে যুক্ত থাকেন, তাহলে YUVIKA-র মতো কর্মসূচিতে নির্বাচনের বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে। আসামের গোলপাড়া থেকেও এই বছর একজন ছাত্র YUVIKA 2026-এ নির্বাচিত হওয়ার খবর এসেছে, যা বলে দেয় সুযোগ কেবল বড় শহরের নয়। আবু হাসিম তাঁর সাফল্যের মধ্য দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন যে স্বপ্ন দেখার সঙ্গে কঠোর পরিশ্রম মেলালে শ্রীভূমির মাটি থেকেও ISRO পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব। আগামী বছরগুলোতে বরাক উপত্যকার আরও বেশি শিক্ষার্থী যদি এই পথ ধরে এগিয়ে আসেন, তাহলে অঞ্চলের বিজ্ঞানশিক্ষার চেহারাটাই পাল্টে যাবে। অভিভাবক, শিক্ষক এবং স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই ধরনের মেধাবী শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে সহযোগিতা করাটাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ।