অসম HPV টিকাকরণ অভিযানে এ পর্যন্ত ১.০৭ লক্ষেরও বেশি কিশোরীকে সার্ভিকাল ক্যান্সার প্রতিরোধী ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। ১২ জুন ২০২৬ সালে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম X-এ এই তথ্য জানিয়ে বলেন, রাজ্যের মেয়েরা যেন কোনো প্রতিরোধযোগ্য রোগের কারণে তাদের স্বপ্নের পথ থেকে দূরে সরে না যায়, সেটা নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ। রাজ্যে মোট ৩.২৭ লক্ষ কিশোরীকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে, এবং এর মধ্যে ইতিমধ্যেই এক তৃতীয়াংশেরও বেশি কাজ সম্পন্ন হয়েছে ।
অসম HPV টিকাকরণ অভিযানের লক্ষ্য ও পরিধি
এই টিকাকরণ কার্যক্রম কেবল একটি স্বাস্থ্য প্রকল্পের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সার্ভিকাল ক্যান্সারমুক্ত অসম গড়ার বৃহত্তর স্বপ্নের অংশ। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা জানিয়েছেন, “অসমের কন্যারা দীর্ঘ ও সুস্থ জীবন পাওয়ার যোগ্য। এই HPV ভ্যাকসিন তাদের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং রাজ্যে সার্ভিকাল ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইকে আরও শক্তিশালী করবে” ।
টিকাটি হলো Gardasil-4 বা quadrivalent HPV ভ্যাকসিন, যা HPV-র চারটি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ ধরনের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, ভাইরাস সংক্রমণের আগেই দেওয়া হলে এই টিকা সার্ভিকাল ক্যান্সার ও এর পূর্ববর্তী অবস্থার বিরুদ্ধে ৯৭% পর্যন্ত সুরক্ষা দিতে পারে । অসমের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের অধীনে এই অভিযান পরিচালনা করছে এবং সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে বিনামূল্যে এই টিকা দেওয়া হচ্ছে। বাজারে প্রতিটি ডোজের দাম যেখানে ৪,০০০ থেকে ৯,০০০ টাকা পর্যন্ত, সেখানে বিনামূল্যে পাওয়ার এই সুযোগ অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারগুলির জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ।
সার্ভিকাল ক্যান্সার কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু
সার্ভিকাল ক্যান্সার প্রতিরোধ অসমের এবং সামগ্রিকভাবে ভারতের জন্য একটি জরুরি জনস্বাস্থ্য প্রশ্ন। ভারতে প্রতি বছর প্রায় ১ লক্ষ ২৭ হাজার মহিলা সার্ভিকাল ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং প্রায় ৮০ হাজার মারা যান, যা বিশ্বের মোট ক্যান্সার মৃত্যুর প্রায় এক পঞ্চমাংশ । দেশে মহিলাদের ক্যান্সারের মধ্যে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ । বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য—কারণ সার্ভিকাল ক্যান্সারের ৯০% এরও বেশি ক্ষেত্রে Human Papillomavirus বা HPV সংক্রমণ দায়ী, এবং টিকা দিলে এই সংক্রমণ বহুলাংশে ঠেকানো যায় ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ২০৩০ সালের মধ্যে সার্ভিকাল ক্যান্সার নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, এবং এর জন্য টিকাকরণ, স্ক্রিনিং ও চিকিৎসার সমন্বয় জরুরি । ভারত সরকার ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে একটি জাতীয় HPV টিকাকরণ কার্যক্রম চালু করেছে, যেখানে ১৪ বছর বয়সী কিশোরীদের বিনামূল্যে এই টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে । প্রাথমিক পর্যায়ে সারা দেশের ১.১৫ কোটি কিশোরীকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে । অসম সেই জাতীয় অভিযানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজস্ব রাজ্য পর্যায়ের উদ্যোগও সমান্তরালভাবে চালিয়ে যাচ্ছে।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির প্রাসঙ্গিকতা
অসম HPV টিকাকরণ অভিযানের প্রভাব বরাক উপত্যকার জন্যও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, বরাক উপত্যকায় মহিলাদের মধ্যে HPV-16 ও HPV-18 সংক্রমণের উপস্থিতি রয়েছে, যা সার্ভিকাল ক্যান্সারের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ধরন । হাইলাকান্দি জেলায় স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো তুলনামূলকভাবে সীমিত হওয়ায় জটিল রোগের চিকিৎসায় দেরি হওয়া বা বড় শহরে যাওয়ার বাড়তি চাপের মতো সমস্যা দেখা দেয়। এমন পরিস্থিতিতে একটি বিনামূল্যের প্রতিরোধমূলক টিকা কতটা জরুরি, তা সহজেই বোঝা যায়।
লালা টাউন ও আশপাশের এলাকার পরিবারগুলির কাছে সরকারি বার্তা হলো—সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে ১৪-১৫ বছর বয়সী কিশোরীদের এই টিকা নিশ্চিত করুন। বাজারমূল্যে যে টিকা হাজার হাজার টাকার, তা এখন বিনামূল্যে পাওয়া যাচ্ছে। সচেতনতার অভাবে যাতে কেউ এই সুযোগ না হারান, সেজন্য স্থানীয় পর্যায়ে প্রচার জোরদার করা দরকার। হাইলাকান্দিতে HPV টিকাকরণ প্রস্তুতি পর্যালোচনা সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জেলা প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়, যা ইঙ্গিত দেয় যে স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছে।
সামনে কী দেখার
অসম HPV টিকাকরণ অভিযানের অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক, কিন্তু সামনে পথ আরও দীর্ঘ। ৩.২৭ লক্ষ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এখন পর্যন্ত ১.০৭ লক্ষ কিশোরী টিকা পেয়েছে, অর্থাৎ বাকি রয়েছে দুই তৃতীয়াংশেরও বেশি। যেসব জেলায় টিকাগ্রহণের হার কম, সেখানে স্কুল, আঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র ও স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে আরও বেশি প্রচার দরকার। এই উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে দুটি বিষয়ের ওপর—পরিবারের মধ্যে সচেতনতা এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোয় টিকার ধারাবাহিক সরবরাহ নিশ্চিত রাখা।
একটি প্রজন্মকে সার্ভিকাল ক্যান্সার থেকে রক্ষা করার এই উদ্যোগ অসমের নারী স্বাস্থ্য নীতিতে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সূচনা করছে। আগামী মাসগুলোতে টিকাকরণের গতি কেমন থাকে এবং হাইলাকান্দির মতো প্রত্যন্ত জেলায় কতটা পৌঁছানো সম্ভব হয়, সেটাই দেখার বিষয় ।