দীর্ঘ ২৬ দিন পর অনশন ভঙ্গ করলেন পরিবেশ কর্মী ও শিক্ষা সংস্কারক সোনম ওয়াংচুক। বৃহস্পতিবার গুরুগ্রামের মেদান্তা হাসপাতালে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিংয়ের উপস্থিতিতে তিনি এই অনশন ভাঙেন, যখন কেন্দ্র সরকার নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জবাবদিহিতা এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে সংসদে আলোচনার লিখিত আশ্বাস দেয়। ৫৯ বছর বয়সী ওয়াংচুক গত ২৮ জুন থেকে দিল্লির জন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র আন্দোলনে যোগ দিয়ে এই অনশন শুরু করেছিলেন, যাতে তিনি প্রায় ১১ কিলোগ্রাম ওজন হারান বলে বিবিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কেন শুরু হয়েছিল এই অনশন
চলতি বছরের মে মাসে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে জাতীয় স্তরের মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা নিট বাতিল হওয়ার পর দেশজুড়ে ছাত্র সমাজে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়। এই ক্ষোভ থেকেই জন্ম নেয় ককরোচ জনতা পার্টি নামের ছাত্র আন্দোলন, যার সূচনা হয় একজন বিচারকের এক মন্তব্য থেকে, যেখানে তিনি ভারতীয় যুবসমাজকে তুলনা করেছিলেন তেলাপোকার সঙ্গে বলে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। সোনম ওয়াংচুক ২৮ জুন এই আন্দোলনে যোগ দিয়ে অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেন, মূলত নিট পেপার লিকে জবাবদিহিতা এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে।
আন্দোলন যত দিন গড়িয়েছে, তত ওয়াংচুকের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়তে শুরু করে। নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনশনের সপ্তম দিনেই তিনি প্রায় ৫ কিলোগ্রাম ওজন হারান, এবং ১৪ তম দিনে তার ওজন হ্রাস দাঁড়ায় ৭.৫ কিলোগ্রামে, যখন তার রক্তচাপ রেকর্ড করা হয় ১০৬/৭৪ মিলিমিটার এইচজি। ১৮ জুলাই দিল্লি পুলিশ তাকে দিল্লি হাইকোর্টের নির্দেশে জন্তর মন্তর থেকে সরিয়ে সফদরজং হাসপাতালে নিয়ে যায়, কারণ চিকিৎসকরা তার শারীরিক পরিস্থিতিকে জরুরি অবস্থা বলে ঘোষণা করেছিলেন এবং অঙ্গ বিকল হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, দ্য উইকের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
সরকারের লিখিত আশ্বাসে যা বলা হয়েছে
কেন্দ্র সরকার লিখিতভাবে জানিয়েছে যে তারা “নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষা সংস্কার নিয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনার আশ্বাস আগেই দিয়েছে,” এবং সাম্প্রতিক নিট পেপার লিকের জেরে আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টিও “ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।” এছাড়াও সরকার জানিয়েছে, দিল্লির জন্তর মন্তরে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারী এবং ২০ জুলাই সংসদ অভিযানে যুক্ত থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা দায়ের করা হবে না।
অনশন ভাঙার পর এক ভিডিও বার্তায় ওয়াংচুক জানান, প্রায় ৬৫ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্য তার কাছে গিয়ে একটি চিঠিতে স্বাক্ষর করে অনশন ভাঙার আবেদন জানান এবং প্রতিশ্রুতি দেন যে নিট পেপার লিক ও দেশের পরীক্ষা ব্যবস্থার বিষয়টি সংসদে তোলা হবে। “সরকারের পক্ষ থেকে আসা মন্ত্রীরাও একই আশ্বাস দিয়েছেন,” তিনি বলেন। এক্স-এ দেওয়া পোস্টে ওয়াংচুক লিখেছেন, “অনশনের শেষ… জবাবদিহিতার শুরু…!” তিনি আরও জানান যে সম্ভাব্য সহিংসতা এড়াতে এবং দীর্ঘ আলোচনার পর তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এনডিটিভির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিট নিয়ে হাইলাকান্দির শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ
নিট পরীক্ষা বাতিল ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের এই বিতর্ক কেবল দিল্লি বা জাতীয় রাজনীতির বিষয় নয়—এর প্রভাব পড়ে হাইলাকান্দি জেলা সহ বরাক উপত্যকার শত শত মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষার্থীর ওপরও, যারা প্রতি বছর নিট পরীক্ষায় বসেন ডাক্তারি পড়ার স্বপ্ন নিয়ে। পরীক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে জাতীয় স্তরে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা ভবিষ্যতে হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের মতো প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কারণ পরীক্ষা পদ্ধতিতে যে কোনো সংস্কার সরাসরি প্রভাব ফেলবে তাদের কেরিয়ারের ওপর।
স্থানীয় অভিভাবক ও শিক্ষা মহলে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ শোনা যায় যে জাতীয় স্তরের পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ঘটনা প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিযোগীদের জন্য বিশেষভাবে ক্ষতিকর, কারণ তারা শহরাঞ্চলের তুলনায় ইতিমধ্যেই কোচিং সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে পিছিয়ে থাকেন। এই প্রেক্ষাপটে সংসদে প্রতিশ্রুত আলোচনার ফলাফল বরাক উপত্যকার শিক্ষার্থীদের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে।
সোনম ওয়াংচুকের এই অনশন ও তার সমাপ্তি ভারতের পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক মুহূর্ত তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনে সরকার তার প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন করে এবং নিট পেপার লিকের শিকার শিক্ষার্থী পরিবারগুলো ঠিক কী ধরনের ক্ষতিপূরণ পান। ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন আপাতত স্তিমিত হলেও, পরীক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতার দাবি দেশের ছাত্র সমাজের মধ্যে যে জায়গা করে নিয়েছে, তা আগামী দিনে সরকারের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।