শিশু গৃহ থেকে পালিয়ে উদ্ধার হলো তিনটি শিশু, যাদের মঙ্গলবার সকালে নিউ বঙাইগাঁও রেলওয়ে স্টেশন থেকে উদ্ধার করে সরকারি রেল পুলিশ (GRP)। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শিশুরা জানায়, তারা গুয়াহাটির বেটকুচি এলাকায় অবস্থিত একটি শিশু যত্ন কেন্দ্র থেকে পালিয়ে এসেছে। ঘটনাটি ঘটেছে ১৮ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে, এবং বর্তমানে শিশুরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে রয়েছে ।
পুলিশ জানিয়েছে, শিশুরা যে কেন্দ্র থেকে পালিয়েছে তার নাম ইলা স্নেহালয়, যা বেটকুচিতে অবস্থিত এবং বৃহত্তর স্নেহালয় নেটওয়ার্কের একটি অংশ হিসেবে পরিচালিত হয়। এই কেন্দ্রটি সংকটাপন্ন শিশুদের যত্ন ও সহায়তা প্রদানের জন্য প্রতিষ্ঠিত। শিশুরা পুলিশকে জানায়, কেন্দ্রে তাদের শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল, যার কারণে তারা সেখান থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছে ।
কীভাবে উদ্ধার হলো শিশুরা
নিউ বঙাইগাঁও রেলওয়ে স্টেশনে শিশুদের অস্বাভাবিকভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখে জিআরপি কর্মীরা তাদের হেফাজতে নেন এবং জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। জিজ্ঞাসাবাদে শিশুরা জানায় যে তারা গুয়াহাটি থেকে বহু দূরের এই স্টেশন পর্যন্ত কীভাবে পৌঁছেছে, তা এখনও সম্পূর্ণ স্পষ্ট নয়। পুলিশ বর্তমানে শিশুদের পলায়নের সম্পূর্ণ পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছে, যার মধ্যে রয়েছে তারা কীভাবে কেন্দ্র থেকে বেরিয়েছিল এবং কীভাবে ট্রেনে চড়ে এত দূর পর্যন্ত পৌঁছাল ।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শিশুদের নির্যাতনের অভিযোগ এখনও স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি এবং তদন্ত চলছে। কেন্দ্রের পরিস্থিতি এবং শিশুদের অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান চালাচ্ছে। কোনো অন্যায় সংঘটিত হয়েছে কিনা এবং তার জন্য কারা দায়ী, তা নির্ধারণের জন্য আরও তদন্তের প্রয়োজন হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে ।
শিশু যত্ন কেন্দ্রে অতীতের অভিযোগ ও উদ্বেগ
এটি প্রথমবার নয় যে অসমের কোনো শিশু যত্ন কেন্দ্র থেকে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। ২০১৮ সালে গুয়াহাটির বোরঝারে অবস্থিত এসওএস চিলড্রেনস ভিলেজে তিনজন আবাসিকের যৌন নির্যাতনের অভিযোগে তদন্ত হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট সহকারী পরিচালককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল । এছাড়াও ২০২৩ সালে শিবসাগরের একটি চিলড্রেনস হোমে শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের ঘটনায় গৌহাটি হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে যথাযথ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিল ।
গৌহাটি হাইকোর্ট তার নির্দেশে স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল যে, রাজ্য সরকার ও অসম রাজ্য শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশনকে (ASCPCR) শিশু অধিকার সংক্রান্ত যেকোনো ঘটনার তদন্তে চাইল্ড রাইটস অ্যাক্ট, ২০০৫-এর বিধান কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। আদালত আরও নির্দেশ দিয়েছিল যে এই ধরনের ঘটনার প্রতিবেদন প্রতি ছয় মাসে হাইকোর্টের জুভেনাইল জাস্টিস কমিটির কাছে জমা দিতে হবে । জাতীয় শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশনও (NCPCR) অতীতে অসমের একাধিক শিশু যত্ন প্রতিষ্ঠানে তহবিল অপব্যবহার ও অপর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থার প্রমাণ পেয়েছিল ।
শিশু কল্যাণ কমিটির ভূমিকা
অসমের প্রতিটি জেলায় জুভেনাইল জাস্টিস (কেয়ার অ্যান্ড প্রোটেকশন অফ চিলড্রেন) অ্যাক্ট, ২০১৫ অনুযায়ী একটি করে শিশু কল্যাণ কমিটি (Child Welfare Committee বা CWC) থাকা বাধ্যতামূলক। এই কমিটি সুরক্ষা ও যত্নের প্রয়োজন এমন শিশুদের বিষয়ে মামলা নিষ্পত্তি এবং তাদের মৌলিক চাহিদা ও অধিকার সুরক্ষার দায়িত্ব পালন করে ।
নিয়ম অনুযায়ী, কোনো শিশু গৃহে নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট কমিটি তদন্ত করতে পারে এবং পুলিশ বা জেলা শিশু সুরক্ষা ইউনিটকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে পারে। বর্তমান ঘটনায় উদ্ধার হওয়া তিন শিশুকেও যথাযথ কর্তৃপক্ষের হাতে হস্তান্তর করা হয়েছে, যারা আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী তাদের ভবিষ্যত সুরক্ষা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করবে ।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির জন্য প্রাসঙ্গিকতা
যদিও এই ঘটনাটি গুয়াহাটি ও বঙাইগাঁওতে ঘটেছে, তবে এটি সমগ্র রাজ্যের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতার দিকেই ইঙ্গিত করে। বরাক উপত্যকার কাছাড়, শ্রীভূমি ও হাইলাকান্দি জেলাতেও একাধিক শিশু যত্ন কেন্দ্র এবং হোম পরিচালিত হয়। এই ঘটনা স্থানীয় পর্যায়েও শিশু সুরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মিত পরিদর্শন ও নজরদারির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
হাইলাকান্দি জেলার শিশু কল্যাণ কমিটি এবং জেলা শিশু সুরক্ষা ইউনিটের উচিত এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে স্থানীয় শিশু গৃহগুলোতে নিয়মিত পরিদর্শন ও অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা। লালা টাউনসহ জেলার বাসিন্দাদের মধ্যেও শিশু অধিকার ও সুরক্ষা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন, যাতে কোনো শিশু নির্যাতনের শিকার হলে তা দ্রুত প্রশাসনের নজরে আনা যায়।
ভবিষ্যতে কী পদক্ষেপ প্রত্যাশিত
পুলিশের তদন্ত শেষ হওয়ার পর ইলা স্নেহালয় কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি ব্যবস্থা, অভিযোগ নিষ্পত্তির স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা আরও একবার সামনে এলো এই ঘটনার মাধ্যমে।
উদ্ধার হওয়া তিন শিশুর ভবিষ্যত পুনর্বাসন এবং মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করাই এখন প্রশাসনের প্রধান অগ্রাধিকার। এই ঘটনা রাজ্যের সমস্ত শিশু যত্ন কেন্দ্রের কার্যক্রম পুনর্মূল্যায়নের একটি সুযোগ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো শিশুকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়।