অসম বন্যা মানচিত্র তৈরির কাজে চলতি বর্ষায় ইসরো অসম রাজ্য বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে ৩৩টি বন্যা-ডুবে যাওয়া এলাকার মানচিত্র ও মূল্য সংযোজিত তথ্য দিয়েছে। ২৮ জুলাই পর্যন্ত এই তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে বলে বুধবার লোকসভায় লিখিত জবাবে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং। স্যাটেলাইট-ভিত্তিক এই মানচিত্রগুলি বন্যার বিস্তার বোঝা, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা চিহ্নিত করা এবং প্রশাসনের ত্রাণ ও উদ্ধার পরিকল্পনায় সহায়তা করতে ব্যবহার করা হয় ।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ইসরো Synthetic Aperture Radar বা SAR এবং অপটিক্যাল স্যাটেলাইট ডেটা ব্যবহার করে এই মানচিত্র তৈরি করেছে। তথ্যগুলি National Database for Emergency Management বা NDEM পোর্টালের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির কাছে পৌঁছেছে । এর ফলে মাঠপর্যায়ে পৌঁছানো কঠিন এমন এলাকাগুলিরও বৃহত্তর ছবি প্রশাসনের হাতে এসেছে।
কীভাবে তৈরি হয় অসম বন্যা মানচিত্র
বন্যার সময় স্যাটেলাইট ছবি ব্যবহার করে কোন এলাকা জলের তলায় চলে গেছে, কোথায় নদীর জল ছড়িয়েছে এবং কোন বসতি বা সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—এসবের একটি সামগ্রিক চিত্র তৈরি করা যায়। অপটিক্যাল স্যাটেলাইট সাধারণত দৃশ্যমান আলো ও ইনফ্রারেড তথ্যের মাধ্যমে পৃথিবীর পৃষ্ঠের ছবি সংগ্রহ করে। তবে ঘন মেঘ বা ভারী বৃষ্টির সময় অপটিক্যাল ছবির ব্যবহার সীমিত হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে SAR প্রযুক্তি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। রাডার-ভিত্তিক এই পদ্ধতি মেঘ ও রাতের অন্ধকারের মধ্যেও ভূমির পরিবর্তন শনাক্ত করতে পারে। অসমের মতো বর্ষাপ্রবণ রাজ্যে, যেখানে টানা বৃষ্টি ও মেঘের কারণে বিমান বা সাধারণ ক্যামেরায় ছবি তোলা কঠিন হয়ে পড়ে, সেখানে SAR ডেটা প্রশাসনের জন্য কার্যকর বিকল্প হয়ে ওঠে ।
ইসরোর National Remote Sensing Centre বা NRSC আগে থেকেই অসমের জন্য নিকট-সময়ের বন্যা-মানচিত্র তৈরি করে আসছে। অসম স্টেট ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটির সরকারি প্ল্যাটফর্মে এই ধরনের মানচিত্র প্রকাশের ব্যবস্থা রয়েছে । মানচিত্রে জেলা ও উপ-জেলা স্তরে জলের বিস্তার দেখার সুযোগ থাকায় ত্রাণ পরিকল্পনাকে আরও নির্দিষ্ট করা যায়।
প্রশাসনের কাজে স্যাটেলাইট তথ্যের ব্যবহার
কেন্দ্রের লোকসভা-জবাবে বলা হয়েছে, স্থানিক বন্যা-তথ্য NDEM পোর্টালে প্রকাশ করা হয়, যাতে জেলা বা উপ-জেলা স্তরে তা দেখা যায় । প্রশাসনের কাছে এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও, সাধারণ মানুষের জন্য মানচিত্রের অর্থ বোঝা সবসময় সহজ নয়। তাই স্যাটেলাইট ডেটাকে স্থানীয় ভাষায় ব্যাখ্যা করে জেলা প্রশাসন, পঞ্চায়েত ও নগর সংস্থার কাছে পৌঁছে দেওয়াও জরুরি।
বন্যার জলের বিস্তার জানলে প্রশাসন ত্রাণ শিবিরের অবস্থান নির্ধারণ, নৌকা পাঠানো, রাস্তা বা সেতু বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত এবং ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব তৈরিতে সাহায্য পেতে পারে। তবে কোনও স্যাটেলাইট মানচিত্র একা প্রতিটি পরিবারের ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। স্থানীয় রাজস্ব কর্মী, পঞ্চায়েত, পুলিশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দলের মাঠ-পর্যায়ের যাচাইয়ের সঙ্গে উপগ্রহ তথ্য মিলিয়ে তবেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
অসমের বন্যা পর্যবেক্ষণে নতুন প্রযুক্তি
অসমে স্যাটেলাইট-ভিত্তিক বন্যা পর্যবেক্ষণ নতুন নয়। NRSC ও ASDMA-র সহযোগিতায় দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন স্যাটেলাইটের তথ্য ব্যবহার করে বন্যার বিস্তার এবং বন্যা-ঝুঁকির মানচিত্র তৈরি হয়েছে। ১৯৯৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ঐতিহাসিক স্যাটেলাইট ডেটা এবং জলস্তরের তথ্য ব্যবহার করে অসমের Flood Hazard Zonation Atlas-ও তৈরি করা হয়েছে বলে NRSC জানিয়েছে ।
চলতি মরসুমে ইসরোর NISAR স্যাটেলাইটও ব্রহ্মপুত্রের গতিপথ, চরাঞ্চল ও বন্যার বিস্তার পর্যবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ছবি তুলেছে। ইসরো ও NASA-র যৌথ উদ্যোগে তৈরি এই স্যাটেলাইটের রাডার ডেটা মেঘলা আবহাওয়াতেও নদী ও প্লাবিত এলাকার পরিবর্তন শনাক্ত করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞ-ভিত্তিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে । এই তথ্য দীর্ঘমেয়াদে নদীভাঙন, চ্যানেল পরিবর্তন এবং বন্যা-ঝুঁকি বোঝার ক্ষেত্রেও কাজে লাগতে পারে।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির প্রাসঙ্গিকতা
অসম বন্যা মানচিত্রের সুবিধা শুধু ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় সীমাবদ্ধ নয়। বরাক নদী ও তার উপনদীগুলির জলস্তর বাড়লে কাছাড়, হাইলাকান্দি ও করিমগঞ্জের নিচু এলাকাগুলিও দ্রুত জলমগ্ন হতে পারে। লালা টাউন ও আশপাশের বাসিন্দাদের জন্য তাই জেলার কোন অংশে জল বাড়ছে, কোন রাস্তা বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং কোথায় ত্রাণ শিবির খোলা হয়েছে—এই তথ্য সময়মতো পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ৩৩টি মানচিত্রের মধ্যে হাইলাকান্দি বা লালা টাউনের জন্য আলাদা কতগুলি তথ্যচিত্র দেওয়া হয়েছে, কেন্দ্রের জবাবে তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি । ফলে স্থানীয় প্রশাসনের উচিত NDEM, ASDMA এবং জেলা-স্তরের মাঠ-রিপোর্ট সমন্বয় করে জনগণকে নির্ভরযোগ্য আপডেট দেওয়া। মানচিত্রের তথ্য সরাসরি গুজবের বিকল্প নয়; সরকারি সতর্কতা ও স্থানীয় যাচাইয়ের ভিত্তিতেই বাসিন্দাদের যাতায়াত বা নিরাপত্তার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
সামনে কী দেখার আছে
ইসরোর পাঠানো ৩৩টি মানচিত্র দেখাচ্ছে, অসমের বন্যা ব্যবস্থাপনায় মহাকাশ-প্রযুক্তির ভূমিকা ক্রমশ বাড়ছে। আগামী দিনে এই তথ্য যদি দ্রুত জেলা প্রশাসন, উদ্ধারকারী দল এবং সাধারণ মানুষের কাছে ব্যবহারযোগ্যভাবে পৌঁছায়, তবে ত্রাণ বিতরণ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ আরও কার্যকর হতে পারে। একইসঙ্গে উপগ্রহ-ভিত্তিক পূর্বাভাসের সঙ্গে নদীর জলস্তর, আবহাওয়া এবং স্থানীয় পর্যবেক্ষণ যুক্ত করাই হবে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ। বর্ষা চলাকালীন নতুন মানচিত্র ও আপডেট প্রকাশ পেলে সেগুলিই এখন প্রশাসন ও বাসিন্দাদের নজরে রাখার বিষয়।