Read today's news --> ⚡️Click here 

মণিপুর জনগণনা প্রশিক্ষণ স্থগিত, এনআরসি দাবিতে তীব্র আন্দোলন

মণিপুর জনগণনা প্রশিক্ষণ স্থগিত করা হয়েছে ইম্ফল উপত্যকার একাধিক জেলায়, জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) হালনাগাদের দাবিতে চলা আন্দোলনের জেরে। বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দফতরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, জিরিবাম, ইম্ফল পশ্চিম, থৌবাল ও কাকচিং জেলা প্রশাসন সেন্সাস ২০২৭-এর প্রথম পর্যায়ের গণনাকারী ও তত্ত্বাবধায়কদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি তাৎক্ষণিকভাবে স্থগিত বা বাতিল করেছে । উল্লেখযোগ্যভাবে, পার্বত্য এলাকার জেলাগুলোতে একই ধরনের প্রশিক্ষণ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে বলেও ওই কর্মকর্তা জানান।

জাস্ট অ্যান্ড ফেয়ার ডিলিমিটেশন প্রচার কমিটির (জেএফডি) নেতৃত্বে চলা এই আন্দোলন মূলত সেন্সাস ২০২৭ শুরুর আগে মণিপুরে এনআরসি হালনাগাদের দাবিতে। সোমবার মধ্যরাত থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনের জেরে মঙ্গলবার ও বুধবার ৪৮ ঘণ্টার বনধে ইম্ফল উপত্যকায় স্বাভাবিক জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে ।

এনআরসি হালনাগাদের দাবি আন্দোলনের বিস্তার

জেএফডি সংগঠনের সচিব লংজাম রতন জানিয়েছেন, জরুরি সেবা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে এই বনধ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সংগঠনটি জনগণনার বিরোধী নয়, বরং তারা চায় অবৈধ অভিবাসীদের চিহ্নিতকরণ ও অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের (আইডিপি) পুনর্বাসনের পরই এই প্রক্রিয়া অনুষ্ঠিত হোক । জেএফডি ১৯৫১ সালকে ভিত্তিবর্ষ ধরে এনআরসি হালনাগাদের দাবি জানিয়েছে এবং প্রয়োজনে সরকারি কার্যালয় ঘেরাও ও প্রশিক্ষণ-মাঠকর্মে বাধা দেওয়ার হুমকিও দিয়েছে ।

৪৮ ঘণ্টার বনধ শেষ হওয়ার পর জেএফডি বৃহস্পতিবার থেকে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারি কার্যালয় বয়কটের ডাক দেয়, যদিও জল, বিদ্যুৎ ও চিকিৎসার মতো অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবাকে এই বয়কট থেকে ছাড় দেওয়া হয়েছে বলে জেএফডি আহ্বায়ক জিতেন্দ্র নিংওম্বা সাংবাদিকদের জানান । এই আন্দোলনে ছাত্র-যুব সংগঠন, নারী সংগঠন—বিশেষ করে প্রভাবশালী ‘মেইরা পাইবি’ (নারী মশালবাহিনী)—এবং বেসামরিক সমাজের সংগঠনগুলো সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে । প্রতিবাদকারীরা ইম্ফলের বিভিন্ন এলাকায় রাজনীতিবিদদের কুশপুত্তলিকা দাহ করেছেন এবং রাস্তা অবরোধ করেছেন ।

স্কুল-কলেজ বন্ধ নিরাপত্তা বৃদ্ধি

চলমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে মণিপুরের শিক্ষা দফতর ঘোষণা করেছে, রাজ্যের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট থেকে শনিবার, ২২ আগস্ট পর্যন্ত তিন দিনের জন্য বন্ধ থাকবে। রাজ্যপালের নির্দেশে জারি করা এক সরকারি আদেশে বলা হয়, সরকারি, সরকার-অনুমোদিত ও বেসরকারি—সব ধরনের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় এই বন্ধের আওতায় পড়বে ।

ইম্ফল পূর্ব, ইম্ফল পশ্চিম, থৌবাল, বিষ্ণুপুর, কাকচিং ও জিরিবাম—এই ছয়টি জেলা নিয়ে গঠিত ইম্ফল উপত্যকা জুড়ে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। তবে চুড়াচাঁদপুরসহ পার্বত্য জেলাগুলোতে এই আন্দোলনের কোনো প্রভাব পড়েনি বলে জানা গেছে । জনগণনা প্রক্রিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ১৭ আগস্ট থেকে স্ব-গণনা (সেলফ-এনুমারেশন) শুরু হয়েছে এবং গণনাকারীদের মাধ্যমে মূল বাড়ি-তালিকাকরণ কার্যক্রম ১ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত হবে বলে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তথ্য বলছে ।

রাজ্য সরকারের অবস্থান দিল্লিতে প্রতিনিধি দল

মণিপুর সরকার ইতিমধ্যেই এনআরসি হালনাগাদের দাবিকে সমর্থন জানিয়েছে এবং কেন্দ্রের কাছে বারবার এই বিষয়টি তুলে ধরেছে। রাজ্য সরকারের মুখপাত্র নিত্যাইপাত চুথেক এবং বিজেপি বিধায়ক সাপাম রঞ্জন সিং জানিয়েছেন, রাজ্য সরকার এনআরসি ও সেন্সাস সংক্রান্ত বিষয়ে গুরুত্ব সহকারে কাজ করছে এবং জনগণের উদ্বেগের পাশে আছে। রঞ্জন সিং, যিনি একসময় রাজ্যের মন্ত্রী ছিলেন, জানান যে মণিপুর বিধানসভা ২০২২ সালের ৫ আগস্ট এনআরসি বাস্তবায়নের দাবিতে একটি প্রস্তাব পাস করেছিল, যা পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ১ মার্চ পুনরায় অনুমোদিত হয় ।

এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন সম্প্রদায় ও সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে গঠিত ১০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লি রওনা হয়েছে, যাতে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে সেন্সাসের আগে এনআরসি হালনাগাদের দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরা যায় । প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এন. বীরেন সিং, যিনি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে সাক্ষাতের পর মঙ্গলবার ইম্ফলে ফিরেছেন, জানিয়েছেন যে কেন্দ্র সরকার মণিপুরে এনআরসি হালনাগাদের বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবে ।

বরাক উপত্যকা হাইলাকান্দির প্রেক্ষাপট

মণিপুরের এই এনআরসি-সেন্সাস বিতর্ক বরাক উপত্যকার বাসিন্দাদের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ অসমে এনআরসি হালনাগাদ প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে এবং এই প্রক্রিয়া ঘিরে হাইলাকান্দি জেলাসহ বরাক উপত্যকার বহু বাসিন্দা দীর্ঘদিন ধরে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত জটিলতার মুখোমুখি হয়েছেন। মণিপুরে একই ধরনের দাবি ও আন্দোলন প্রমাণ করে, উত্তর-পূর্ব ভারতের একাধিক রাজ্যে অভিবাসন ও জনসংখ্যা পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ কতটা গভীর।

হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের বাসিন্দাদের কাছে এই ঘটনা এই কারণেও প্রাসঙ্গিক যে, অসম-মণিপুর সীমান্তবর্তী জিরিবাম জেলা—যেখানে আন্দোলনের প্রভাব সরাসরি পড়েছে—বরাক উপত্যকার সঙ্গে ভৌগোলিক ও যোগাযোগসূত্রে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। জিরিবামে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে তা বরাক উপত্যকা হয়ে মণিপুরের সঙ্গে যাতায়াত ও বাণিজ্যেও প্রভাব ফেলতে পারে।

ভবিষ্যতে কী ঘটতে পারে

মণিপুরের এই আন্দোলন প্রমাণ করে যে জনগণনা ও নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রশ্নে রাজ্যের ইম্ফল উপত্যকার সংগঠনগুলো কতটা দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। রাজ্য সরকার এনআরসি দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল হলেও, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকায় দিল্লিতে যাওয়া প্রতিনিধি দলের আলোচনার ফলাফলের দিকেই এখন সবার নজর।

আগামী দিনগুলোতে সেপ্টেম্বরে শুরু হতে যাওয়া মূল বাড়ি-তালিকাকরণ কার্যক্রম নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয় কিনা, নাকি জেএফডি-র আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে গণনা প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে, তা স্পষ্ট হতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের মধ্যে সমন্বয় এবং জেএফডি-র মতো সংগঠনগুলোর সঙ্গে সংলাপের অগ্রগতির ওপরই নির্ভর করবে মণিপুরে সেন্সাস ২০২৭ কতটা মসৃণভাবে সম্পন্ন হয়।

মণিপুর জনগণনা প্রশিক্ষণ স্থগিত, এনআরসি দাবিতে তীব্র আন্দোলন
Scroll to top