শিশুদের সর্দি-কাশি ওষুধ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক, ক্লোরফেনিরামিন মেলিয়েট ও ফিনাইলএফ্রিন হাইড্রোক্লোরাইড সমন্বিত সব ফিক্সড-ডোজ কম্বিনেশন (এফডিসি) ওষুধের ক্ষেত্রে। শুক্রবার, ২১ আগস্ট জারি করা এক গেজেট বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, চার বছরের নিচে শিশুদের ক্ষেত্রে এই ওষুধ ব্যবহারে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকতে পারে বলে বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ।
মন্ত্রক প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে, ওষুধের লেবেল, প্যাকেজ ইনসার্ট এবং প্রচারমূলক সামগ্রীতে স্পষ্টভাবে লিখতে হবে—“ফিক্সড ডোজ কম্বিনেশন চার বছরের নিচে শিশুদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে না।” স্বাস্থ্য মন্ত্রকের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এই সংমিশ্রণ ওষুধের নিরাপদ বিকল্প বাজারে উপলব্ধ থাকায় এই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে জনস্বাস্থ্য রক্ষার লক্ষ্যে ।
ঠিক কী কারণে এই সিদ্ধান্ত
ওষুধ ও প্রসাধনী আইন, ১৯৪০-এর ধারা ২৬এ-এর অধীনে জারি করা এই বিজ্ঞপ্তি প্রথমবার আনা হয়েছিল ২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল, যখন কেন্দ্রীয় সরকার একই ধরনের সতর্কতা জারি করেছিল। তবে ২১ আগস্ট, ২০২৬-এর নতুন বিজ্ঞপ্তিতে এই নিষেধাজ্ঞা আরও কড়াকড়িভাবে পুনর্বহাল করা হয়েছে বলে দ্য হিন্দু বিজনেসলাইন জানিয়েছে 1085। বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, “কেন্দ্রীয় সরকার নিশ্চিত যে ক্লোরফেনিরামিন মেলিয়েট ও ফিনাইলএফ্রিন হাইড্রোক্লোরাইডের ফিক্সড ডোজ কম্বিনেশন ব্যবহার চার বছরের নিচে শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, এবং এই ওষুধের নিরাপদ বিকল্প ইতিমধ্যে বাজারে উপলব্ধ রয়েছে” ।
এই সংমিশ্রণ ওষুধ মূলত সাধারণ সর্দি-কাশি ও অ্যালার্জির উপসর্গ কমাতে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল, বিশেষত ড্রপ আকারে শিশুদের জন্য। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছিলেন যে এই ধরনের সংমিশ্রণ ওষুধ ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ঘুম, শ্বাসকষ্ট ও হৃদস্পন্দনের সমস্যা তৈরি করতে পারে। কেন্দ্রীয় ওষুধ মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (সিডিএসসিও) ইতিমধ্যে ২০২৩ সালেই একবার এই বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছিল, যা এখন আরও কড়া আকারে ফিরে এসেছে ।
বৃহত্তর প্রেক্ষাপট: শিশুমৃত্যু ও এফডিসি নিষিদ্ধকরণ
এই সিদ্ধান্তটি একটি বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের অংশ। গত জুন মাসে, ১১ জুন ২০২৬ তারিখে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রক দেশজুড়ে ১৬টি ফিক্সড-ডোজ কম্বিনেশন ওষুধের উৎপাদন, বিক্রয় ও বিতরণ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেছিল। এই তালিকায় ছিল ডেক্সট্রোমেথরফান, প্রোমেথাজিন ও ফিনাইলএফ্রিন সমন্বিত কাশির সিরাপ, এবং ক্লোরফেনিরামিন, ফিনাইলএফ্রিন ও প্যারাসিটামল সমন্বিত সাধারণ সর্দির ওষুধও ।
এই কড়াকড়ির পেছনে রয়েছে ২০২৫ সালে ঘটে যাওয়া একাধিক মর্মান্তিক শিশুমৃত্যুর ঘটনা। মধ্যপ্রদেশে দূষিত কোল্ডরিফ কাশির সিরাপ সেবনে অন্তত ২৪ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছিল, যাদের কিডনি বিকল হয়ে গিয়েছিল ডাইইথিলিন গ্লাইকল দূষণের কারণে। তামিলনাড়ুর শ্রীসান ফার্মাসিউটিক্যালসের একটি ব্যাচে ৪৬.২৮ শতাংশ পর্যন্ত এই বিষাক্ত রাসায়নিক পাওয়া গিয়েছিল বলে গবেষণাপত্রে উল্লেখ রয়েছে 1079। এই ঘটনার পরই স্বাস্থ্য সেবা মহাপরিচালকের দপ্তর নির্দেশিকা জারি করে জানিয়েছিল, দুই বছরের নিচে শিশুদের কোনো অবস্থাতেই কাশি বা সর্দির ওষুধ দেওয়া উচিত নয়, কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই উপসর্গ চিকিৎসা ছাড়াই সেরে যায় ।
অভিভাবকদের জন্য কী পরিবর্তন হচ্ছে
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ফার্মেসি ও ওষুধ বিক্রেতাদের এখন থেকে পণ্যের গায়ে স্পষ্ট সতর্কবার্তা যাচাই করেই বিক্রি করতে হবে। চিকিৎসকদেরও প্রেসক্রিপশন লেখার সময় এই নিষেধাজ্ঞা মাথায় রাখতে হবে, বিশেষত শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে যারা প্রায়ই সর্দি-কাশির জন্য এই ধরনের সংমিশ্রণ ওষুধ লিখে থাকেন। বিশেষজ্ঞ কমিটি ও ওষুধ প্রযুক্তি উপদেষ্টা বোর্ডের (ডিটিএবি) সুপারিশের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রক জানিয়েছে ।
সাধারণ অভিভাবকদের জন্য বার্তা স্পষ্ট—চার বছরের নিচে কোনো শিশুকে এই সংমিশ্রণ ওষুধ দেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বাধ্যতামূলক, এবং বাজারে থাকা নিরাপদ বিকল্প ওষুধের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ফার্মেসিগুলোকেও এখন থেকে এই ধরনের ওষুধ বিক্রির সময় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, বিশেষত শিশুদের জন্য নির্ধারিত ড্রপ বা সিরাপ আকারের পণ্যে।
হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের জন্য গুরুত্ব
হাইলাকান্দি জেলা ও লালা টাউনের মতো মফস্বল এলাকায় সাধারণত শিশুদের সর্দি-কাশির জন্য স্থানীয় ফার্মেসি থেকে সরাসরি ওষুধ কেনার প্রবণতা বেশি, যেখানে অনেক সময় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ওষুধ বিক্রি হয়ে থাকে। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় সরকারের এই নতুন নির্দেশনা স্থানীয় অভিভাবকদের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, কারণ প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র (পিএইচসি) ও স্থানীয় ফার্মেসিগুলোতে এখনও অনেক ক্ষেত্রে সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে।
লালা টাউনের অভিভাবকদের উচিত শিশুর সর্দি-কাশির উপসর্গে ওষুধের দোকান থেকে নিজে থেকে ওষুধ না কিনে নিকটবর্তী পিএইচসি বা শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া, বিশেষত চার বছরের নিচের শিশুদের ক্ষেত্রে। জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরও এই বিষয়ে স্থানীয় ফার্মেসি মালিকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে পারে, যাতে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা প্রত্যন্ত অঞ্চলেও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়।
ভবিষ্যতে কী প্রত্যাশিত
এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পর ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলোকে অবিলম্বে তাদের লেবেল ও প্যাকেজিং পরিবর্তন করতে হবে, এবং রাজ্য ওষুধ নিয়ন্ত্রকদের দায়িত্ব থাকবে এই নির্দেশনা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কিনা তা তদারকি করা। জুন মাসে ১৬টি এফডিসি ওষুধ নিষিদ্ধ হওয়ার পর এই নতুন পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে কেন্দ্রীয় সরকার শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিকে ক্রমেই আরও গুরুত্ব সহকারে দেখছে।
আগামী দিনগুলোতে দেখার বিষয় হলো, এই সতর্কবার্তা কতটা কার্যকরভাবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছায় এবং স্থানীয় ফার্মেসি ও চিকিৎসকরা কতটা দ্রুত এই নির্দেশনা মেনে চলেন। ততদিন পর্যন্ত অভিভাবকদের সচেতনতাই শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হয়ে থাকবে।