হাইলাকান্দি জেলার কাটলিছড়া এলাকায় এক ১৫ বছর বয়সী কিশোরীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, কাটলিছড়া পুলিশ ফাঁড়ির অন্তর্গত অলইছড়া চতুর্থ খণ্ড এলাকায়, ৬ নম্বর জাতীয় সড়কের পাশের একটি বাড়িতে গতকাল রাত প্রায় ১১টা ৩০ মিনিটে এই ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ। নিহত কিশোরীর নাম বেবী দাস (১৫)। তিনি দশম শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন বলে জানা গেছে।
ঘটনার প্রতিবাদে আজ স্থানীয় বাসিন্দারা ৬ নম্বর জাতীয় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভে সামিল হন। তাঁদের দাবি, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অবরোধের ফলে অসম–মিজোরাম সংযোগকারী ৬ নম্বর জাতীয় সড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। ইতিমধ্যে পুলিশের একটি বড় দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত শুরু করেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সন্দেহভাজন ৫ জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে উল্লেখ্য, ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগের তদন্ত এখনও চলছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্ত শেষ হওয়ার পরই নিশ্চিতভাবে জানা যাবে।
কী জানা গেছে এখনও পর্যন্ত
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, মেয়েটির মা পার্শ্ববর্তী একটি বাড়িতে পারিবারিক অনুষ্ঠানে গেছিলেন। ফেরার পর তিনি মেয়েকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পান এবং চিৎকার করতে শুরু করলে প্রতিবেশীরা পুলিশকে খবর দেন। খবর পেয়ে হাইলাকান্দি এসপি অমিতভ সিনহা ও জেলা প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং পরিবারের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত তদন্তের আশ্বাস দেন।
পুলিশ জানিয়েছে, তারা এখনও ময়নাতন্ত্রের রিপোর্টের অপেক্ষা করছে, কারণ পারিবারিক অভিযোগ সত্ত্বেও যৌন হেনস্তার বিষয়টি চিকিৎসাগতভাবে নিশ্চিত হতে সময় লাগবে। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, মেয়েটিকে আগে যৌন হেনস্থা করা হয়েছে, পরে মেরে ফেলা হয়েছে। ময়নাতন্ত্রের জন্য দেহটি শুরুতে হাইলাকান্দির এসকে রয় সিভিল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল, পরে তা শিলচর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে (এসএমসিএইচ) স্থানান্তরিত করা হয়।
এনএইচ-৬ অবরোধ ও স্থানীয়দের দাবি
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বাসিন্দারা সকাল থেকেই এনএইচ-৬ অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। এই সড়কটি আসাম ও মিজোরামের মধ্যে অন্যতম প্রধান সংযোগ, তাই অবরোধের ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট তৈরি হয় এবং শতাধিক যান আটকে পড়ে। বিক্ষোভকারীরা দোষীদের দ্রুত গ্রেফতার, কঠোর শাস্তি এবং তদন্তে স্বচ্ছতা দাবি করেন।
পুলিশের একটি বড় বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং শেষ পর্যন্ত সড়ক খুলে দেওয়া হয়। তবে স্থানীয় ক্ষোভ এতটাই তীব্র ছিল যে কেউ কেউ “এনকাউন্টারের” দাবিও তোলেন বলে কিছু প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। জেলা প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, তদন্ত দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে শেষ করা হবে।
পাঁচজন গ্রেফতার, তদন্ত চলছে
পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, ঘটনার সাথে জড়িত থাকার সন্দেহে পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) শামিরদাপার বরুয়াহ নিশ্চিত করেছেন, ময়নাতন্ত্রের পরে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে, তবে আপাতত তদন্তের খাতিরে পাঁচজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
হাইলাকান্দির বিধায়ক মিলন দাস মৃতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছেন এবং দ্রুত, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি করেছেন। স্থানীয় রাজনীতি ও সমাজের একাংশ মনে করছে, এই ধরনের গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে শুধু গ্রেফতার নয়, দ্রুত বিচার ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থাই আসল প্রতিকার।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির প্রেক্ষাপট
হাইলাকান্দি জেলা বরাক উপত্যকার একটি সংবেদনশীল এলাকা, যেখানে নারী ও শিশু নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। এর আগেও জেলায় একাধিকবার নাবালিকা ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা শিরোনামে এসেছে, যার ফলে স্থানীয় সমাজে আতঙ্ক ও ক্ষোভ দুই-ই তৈরি হয়েছে। লালা টাউন ও আশপাশের এলাকার মানুষজনও প্রায়শই এমন খবরে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন, কারণ এটি শুধু একটি এলাকার সমস্যা নয়, বরং পুরো উপত্যকার নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই ইঙ্গিত করে।
এই পটভূমিতে হাইলাকান্দি ১৫ বছরের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক নয়, বরং পুরো অঞ্চলের জন্য একটি সতর্কবার্তা। স্থানীয় স্কুল, কলেজ ও এনজিও-গুলোর নারী নিরাপত্তা বিষয়ক সচেতনতা কর্মসূচির পাশাপাশি পুলিশি নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন, বিশেষ করে রাতের বেলায় একা চলাফেরা, বাড়িতে একা থাকা এবং সন্দেহজনক ব্যক্তির গতিবিধি নিয়ে।
সামনে কী দেখার আছে
এখন নজর থাকবে ময়নাতন্ত্রের রিপোর্ট কী বলে এবং পুলিশের তদন্ত কতটা দ্রুত অগ্রসর হয়। যদি যৌন হেনস্তার প্রমাণ মেলে, তবে মামলাটি আরও গুরুতর রূপ নেবে এবং আইনি প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হতে পারে। একইসঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের উচিত হবে বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভকে বোঝা এবং তদন্তে স্বচ্ছতা বজায় রাখা, যাতে ভবিষ্যতে এমন জনরোষ আর না ছড়ায়।
লালা টাউনসহ বরাক উপত্যকার মানুষজন প্রত্যাশা করবেন, এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে অন্তত ভবিষ্যতে এমন অপরাধের সংখ্যা কমানো সম্ভব হবে। নইলে হাইলাকান্দি ১৫ বছরের মৃত্যু শুধু একটি শিরোনাম হয়েই থাকবে, ব্যবস্থার পরিবর্তনের সূচনা নয়।