হাইলাকান্দি শিশুশ্রমিক উদ্ধার অভিযানে বুধবার আলগাপুর বাজারের দুটি পৃথক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে দুই শিশুকে উদ্ধার করেছে জেলা প্রশাসনের গঠিত ডিস্ট্রিক্ট লেভেল টাস্ক ফোর্স। জেলা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, শিশুশ্রম নির্মূলের লক্ষ্যে চালানো এই বিশেষ অভিযানে উদ্ধার হওয়া শিশু দুটিকে অবিলম্বে জেলা শিশু সুরক্ষা কমিটির (District Child Protection Committee) হেফাজতে দেওয়া হয়েছে এবং সুরক্ষার স্বার্থে একটি শিশু নিবাসে (children’s home) স্থানান্তর করা হয়েছে । এই ঘটনা হাইলাকান্দি জেলা প্রশাসনের শিশুশ্রম মুক্ত সমাজ গড়ার প্রচেষ্টার সর্বশেষ ধাপ বলে জানানো হয়েছে।
কীভাবে চলল উদ্ধার অভিযান
জেলা প্রশাসনের নির্দেশে গঠিত এই টাস্ক ফোর্সে রয়েছেন জেলা প্রশাসনের যুগ্ম কমিশনার, শ্রম দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং জেলা শিশু সুরক্ষা কমিটির প্রতিনিধিরা । কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শিশুদের কর্মে নিয়োগ থেকে বিরত রাখা এবং তাদের পুনরায় শিক্ষা ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য । উদ্ধার হওয়া দুই শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় যত্ন, সুরক্ষা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে ।
জেলা প্রশাসন স্পষ্ট করেছে যে হাইলাকান্দির বিভিন্ন এলাকায় এই ধরনের অভিযান নিয়মিতভাবে চালানো হবে, যাতে শিশুশ্রমে নিযুক্ত শিশুদের চিহ্নিত করে উদ্ধার করা যায় । আইন লঙ্ঘনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি, শিশু অধিকার ও শিশুশ্রম মুক্ত সমাজ গড়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে জনসচেতনতা তৈরির ওপরও জোর দিচ্ছে প্রশাসন ।
রাজ্যজুড়ে শিশুশ্রম বিরোধী অভিযানের প্রেক্ষাপট
হাইলাকান্দির এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং রাজ্যজুড়ে চলা একাধিক জেলা টাস্ক ফোর্সের সক্রিয়তার অংশ। কামরূপ (মেট্রো) জেলায় গত বছর অক্টোবরে একই ধরনের অভিযানে ন’জন শিশুকে গ্যারেজ, রেস্তোরাঁ ও মিষ্টির দোকান থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল, এবং শ্রম দপ্তরের এক আধিকারিক নিয়োগকর্তাদের বিরুদ্ধে FIR দায়ের করেছিলেন । একইভাবে হোজাই জেলা প্রশাসনও গত বছর আগস্টে সাতজন শিশুকে উদ্ধার করে জানিয়েছিল, “উদ্ধার হওয়া শিশুদের পুনর্বাসন করে কল্যাণমূলক প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করা হবে,” বলে এক আধিকারিক মন্তব্য করেছিলেন ।
এই ধরনের অভিযানে সাধারণত জুভেনাইল জাস্টিস (JJ) আইনের বিধান অনুযায়ী উদ্ধার হওয়া শিশুদের চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির (CWC) সামনে হাজির করা হয়, এবং তারপর কমিটি পুনর্বাসন ও পুনঃএকত্রীকরণের ব্যবস্থা নেয় । শিশুশ্রম (নিষেধাজ্ঞা ও নিয়ন্ত্রণ) সংশোধনী আইন, ২০১৬ অনুযায়ী ১৪ বছরের কম বয়সী কোনও শিশুকে গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োগ করাও একটি আমলযোগ্য অপরাধ, যার ভিত্তিতে নিয়োগকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয় ।
হাইলাকান্দিতে শিশুশ্রমের পুরনো চ্যালেঞ্জ
হাইলাকান্দি জেলায় শিশুশ্রম বিরোধী অভিযান নতুন নয়। ২০১৯ সালের জুন মাসে আলগাপুর ও পাঁচগ্রাম বাজার থেকে জেলা টাস্ক ফোর্স তিনজন শিশুশ্রমিককে উদ্ধার করেছিল, আর একই বছরের আরেকটি অভিযানে শ্রম দপ্তর, জেলা শিশু সুরক্ষা ইউনিট (DCPO), CWC, চাইল্ডলাইন ও পুলিশের যৌথ দল বন্ধুয়া শ্রমে নিযুক্ত পাঁচজন নাবালককে উদ্ধার করেছিল, এবং নিয়োগকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু হয়েছিল । ফলে আলগাপুর বাজার এলাকা বহুদিন ধরেই জেলা প্রশাসনের নজরদারিতে রয়েছে, যা এবারের অভিযানের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে তোলে।
বরাক উপত্যকা ও লালা টাউনের জন্য তাৎপর্য
হাইলাকান্দি জেলার লালা টাউন ও তার আশপাশের বাজার এলাকাগুলোতেও ছোট দোকান, ধাবা ও কারখানায় নাবালক কর্মী নিয়োগের ঘটনা মাঝেমধ্যে শোনা যায়, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য উদ্বেগের বিষয়। জেলা প্রশাসনের এই ধরনের নিয়মিত অভিযান লালা টাউনের অভিভাবক ও ব্যবসায়ীদের জন্যও একটি স্পষ্ট বার্তা—নাবালকদের কর্মে নিয়োগ করলে আইনি পদক্ষেপ অনিবার্য। স্থানীয় সমাজকর্মী ও অভিভাবকদের পক্ষ থেকেও প্রায়ই দাবি ওঠে যে লালা বাজার ও তার আশপাশের বাণিজ্যিক এলাকাতেও নিয়মিত নজরদারি চালানো হোক, যাতে কোনও শিশু শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়।
জেলা শিশু সুরক্ষা কমিটির তৎপরতা ও চাইল্ডলাইন ১০৯৮-এর মতো হেল্পলাইন নম্বরের সহজলভ্যতা বরাক উপত্যকার প্রতিটি জেলাতেই আরও বেশি প্রচারের প্রয়োজন রয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষ শিশুশ্রমের তথ্য দ্রুত প্রশাসনের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন।
সামনে কী দেখার আছে
হাইলাকান্দি জেলা প্রশাসন ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে যে আলগাপুরের মতো অভিযান জেলার অন্যান্য বাজার ও এলাকাতেও চলবে, যা আগামী দিনে আরও শিশুকে উদ্ধারের সম্ভাবনা তৈরি করছে। উদ্ধার হওয়া দুই শিশুর দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন ও শিক্ষায় প্রত্যাবর্তন কতটা সফল হয়, তা নজরে রাখা এখন গুরুত্বপূর্ণ। রাজ্যের অন্যান্য জেলার অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট, নিয়মিত অভিযান, কড়া আইনি ব্যবস্থা ও জনসচেতনতার সমন্বয়েই শিশুশ্রম মুক্ত হাইলাকান্দি গড়ার লক্ষ্য বাস্তবায়িত হতে পারে।