নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও হিমবাহ ধসের ফলে আটকা পড়া অসম রাজ্যের নাগরিকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে আসাম সরকার একটি ২৪ ঘণ্টা জরুরি হেল্পলাইন ব্যবস্থা চালু করেছে। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ঘোষণা করেন যে, সরকার নেপালে আটকা পড়া রাজ্যের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং তাদের দ্রুত বাড়ি ফেরাতে প্রাসঙ্গিক সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বয় করে কাজ করছে। এই উদ্দেশ্যে নতুন দিল্লির আসাম ভবনে একটি বিশেষ কন্ট্রোল রুম-কাম-হেল্প ডেস্ক স্থাপন করা হয়েছে, যা ২৪ ঘণ্টা সক্রিয় থাকবে 1362।
আসাম ভবন দিল্লি কন্ট্রোল রুমের যোগাযোগ ব্যবস্থা
আসাম সরকারের মুখ্য সচিব রবি কোটা জানিয়েছেন যে, নেপালে ত্রাণ সংক্রান্ত যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে বা উদ্ধার সহায়তার প্রয়োজন হলে মানুষ আসাম হাউস, নতুন দিল্লির সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। কন্ট্রোল রুমের হেল্পলাইন নম্বরগুলো হলো—০১১-২৩০১০২৯৯/৯৮ এবং ২৬৮৭৭১১১। এছাড়া ব্যক্তিগত যোগাযোগের জন্য অনুরণ মেধি, এসিএস (মোবাইল: ৯১০১০৮৯১৫১) এবং হাউস ম্যানেজার বিনোদ কলিতা (মোবাইল: ৮৯২০৫৭০৫০৭)-এর সাথেও যোগাযোগ করা যাবে ।
রবি কোটা আরও জানান যে, “আমরা তাৎক্ষণিকভাবে নেপালে এই বিপর্যয়ের পর দিল্লির আসাম হাউসে একটি কন্ট্রোল রুম ও হেল্প ডেস্ক খুলেছি।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এখন পর্যন্ত পরিবারের পক্ষ থেকে তাদের আত্মীয়স্বজন বা প্রিয়জনদের সম্পর্কে তথ্য জানতে চাওয়ার মতো কোনো ডিসট্রেস কল আসেনি, যা ইঙ্গিত করে যে অসমের অধিকাংশ মানুষ নিরাপদে আছেন অথবা ইতিমধ্যেই ফিরে এসেছেন ।
হিমন্ত বিশ্ব শর্মার আশ্বাস ও সরকারি উদ্যোগ
মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে বলেছেন, “আমরা জানতে পেরেছি যে নেপালে চলমান বন্যার মধ্যে অসমের কিছু মানুষ আটকা পড়েছেন। আমরা তাদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করছি এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং যত দ্রুত সম্ভব তাদের বাড়ি ফেরাতে প্রাসঙ্গিক সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বয় করছি” ।
এই বিপর্যয়ের প্রেক্ষিতে আসাম সরকারের এই পদক্ষেপটি ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মতোই, যেখানে ওড়িশা, তেলেঙ্গানা এবং অন্যান্য রাজ্যও তাদের নিজস্ব নাগরিকদের সহায়তার জন্য দিল্লিতে কন্ট্রোল রুম খুলেছে। ওড়িশা সরকার উদাহরণস্বরূপ ওড়িশা নিবাসে ২৪x৭ কন্ট্রোল রুম খুলেছে, যার হেল্পলাইন নম্বর ৯১-৭৪২৮১৩৫০৪৪/৮৫২৭৫৮০২৪৫ এবং ল্যান্ডলাইন ০১১-২৩০১২৮০৭ ।
নেপাল বন্যার বর্তমান পরিস্থিতি ও ভারতের সহায়তা
নেপালে এই বন্যা পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর আকার ধারণ করেছে। নেপাল সরকারি সূত্র অনুযায়ী, ২৬ আগস্ট সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে রাসুয়া জেলার ভোটে কোশি নদীতে ভয়াবহ বন্যার সূত্রপাত হয়, যা রাসুয়া, নুওয়াকোট, ধাদিং এবং গোর্খা জেলার নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করেছে। নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জানিয়েছেন যে, উদ্ধার, ত্রাণ এবং পুনর্বাসনের জন্য সমস্ত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করছে ।
ভারত সরকার এখন পর্যন্ত নেপালে ৪৭.৫ টন মানবিক সহায়তা ও ত্রাণ সামগ্রী পাঠিয়েছে, যার মধ্যে প্রথম দিন ১০ টন এবং পরের দিন আরও ৩৭.৫ টন সামরিক পরিবহন বিমানের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রক (MEA) একটি ২৪x৭ কন্ট্রোল রুম চালু করেছে, যার হেল্পলাইন নম্বর +৯১ ১১ ২৩০৮ ৮৭১৮/৮৭১৯ এবং হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগের জন্য +৯১ ৯৯৬৮২৯১৯৮৮ নম্বরটি ব্যবহার করা যাবে ।
হাইলাকান্দি ও বরাক উপত্যকার বাসিন্দাদের জন্য প্রাসঙ্গিকতা
হাইলাকান্দি জেলা এবং ললা টাউন সহ বরাক উপত্যকার অনেক বাসিন্দা ধর্মীয় তীর্থযাত্রা, পর্যটন বা ব্যবসায়িক কাজে নেপাল ভ্রমণ করে থাকেন। বিশেষ করে কৈলাস মানসরোবর যাত্রার সময় অনেক স্থানীয় বাসিন্দা নেপাল হয়ে তিব্বত সীমান্তে যান। এই পরিস্থিতিতে আসাম সরকারের এই হেল্পলাইন ব্যবস্থা হাইলাকান্দির বাসিন্দাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কোনো পারিবারিক সদস্য নেপালে আটকা পড়লে তাঁরা সরাসরি এই নম্বরগুলোতে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় সহায়তা পেতে পারেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো এই তথ্য যে, হেল্পলাইনটি ২৪ ঘণ্টা সক্রিয় থাকবে এবং আসাম ভবনের কর্মকর্তারা বাংলা ও হিন্দি—উভয় ভাষাতেই সহায়তা প্রদানে সক্ষম। এছাড়াও কাঠমান্ডুতে ভারতীয় দূতাবাসের হেল্পলাইন নম্বরগুলোও সংরক্ষণ করে রাখা উচিত: +৯৭৭ ৯৮৫ ১৩১ ৬৮০৭, +৯৭৭ ৯৭০ ৯১০ ৭৫০০ এবং +৯৭৭ ৯৮১ ০৩২ ৬১১৭, যা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমেও ব্যবহারযোগ্য ।
আগামী দিনের পরিকল্পনা ও প্রত্যাশা
আসাম সরকারের এই উদ্যোগ কেবল বর্তমান বিপর্যয়ের মোকাবিলাই নয়, বরং ভবিষ্যতে অনুরূপ পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর একটি মডেল হিসেবেও কাজ করবে। মুখ্য সচিব রবি কোটা জানিয়েছেন যে, সরকারি কর্মকর্তারা ক্রমাগত নেপালের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং প্রয়োজনে আরও সহায়তা প্রদানের জন্য প্রস্তুত রয়েছেন।
নেপাল সরকারের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ১,৫৪৫ জন আহত ও আটকা পড়া মানুষকে বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ৮৪ জন কাঠমান্ডুর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আসাম সরকারের এই হেল্পলাইন ব্যবস্থা রাজ্যের নাগরিকদের জন্য একটি নিরাপত্তা বলয় হিসেবে কাজ করবে এবং প্রয়োজনে তাদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করবে বলে আশা করা হচ্ছে ।