কেন্দ্রীয় সরকারের অন্যতম উচ্চাভিলাষী আর্থিক অন্তর্ভুক্তি প্রকল্প প্রধানমন্ত্রী জন ধন যোজনা (PMJDY) আজ, ২৮ আগস্ট তার ১২ বছর পূর্ণ করল। কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পের অধীনে এখন পর্যন্ত ৫৯.০৯ কোটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে, যাতে সঞ্চিত অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ২০১৪ সালের ২৮ আগস্ট এই প্রকল্পের সূচনা করেছিলেন, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের ব্যাংকিং সুবিধা থেকে বঞ্চিত মানুষদের প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসা ।
জন ধন যোজনা ১২ বছরে যেসব উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১২ বছরে জন ধন যোজনার অ্যাকাউন্টে জমা অর্থের পরিমাণ ১২.৮ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯ আগস্ট, ২০২৬ পর্যন্ত প্রতি অ্যাকাউন্টে গড় সঞ্চয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫,৩৫৬ টাকা, যা গত এক দশকে ৩.৪ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই বৃদ্ধি কেবল অ্যাকাউন্টের সংখ্যা বৃদ্ধিই নির্দেশ করে না, বরং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা এবং সঞ্চয়ের অভ্যাস গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলেই প্রমাণ করে ।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী শুক্রবার এই মাইলফলক প্রসঙ্গে বলেছেন যে, “জন ধন যোজনার অভূতপূর্ব ব্যাপ্তি এবং রূপান্তরমূলক ফলাফল দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় এক অসাধারণ পরিবর্তন এনে দিয়েছে।” তিনি আরও জানান যে, গত ১২ বছরে ৫৯ কোটিরও বেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার মাধ্যমে এই প্রকল্প দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে ।
নারী ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আর্থিক ক্ষমতায়নে বিশেষ ভূমিকা
জন ধন যোজনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হলো নারীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে ব্যাপক অগ্রগতি। মোট অ্যাকাউন্টের মধ্যে ৩২.৯২ কোটি অ্যাকাউন্ট নারীদের নামে খোলা হয়েছে, যা সামগ্রিক অ্যাকাউন্টের ৫৫.৭ শতাংশ। এছাড়া ৪৫.৯৫ কোটি অ্যাকাউন্ট, অর্থাৎ প্রায় ৭৭.৮ শতাংশ, গ্রামীণ ও আধা-শহরাঞ্চলের বাসিন্দাদের নামে খোলা হয়েছে, যা প্রকল্পটির গ্রামীণ অভিমুখী প্রকৃতিকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে ।
এই প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রসার। এখন পর্যন্ত ৪১.২৯ কোটি রুপে ডেবিট কার্ড উপভোক্তাদের দেওয়া হয়েছে, যা সহজ ও সুরক্ষিত লেনদেনের সুযোগ তৈরি করেছে। প্রতিটি জন ধন অ্যাকাউন্টের সাথে বিনামূল্যে দুই লাখ টাকার দুর্ঘটনা বিমা কভারেজ যুক্ত থাকে এবং অ্যাকাউন্ট হোল্ডাররা ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত ওভারড্রাফট সুবিধাও পান, যা জরুরি প্রয়োজনে একটি নিরাপত্তা বলয় হিসেবে কাজ করে ।
জ্যাম ত্রয়ীর মাধ্যমে সরকারি সুবিধা বিতরণ
জন ধন যোজনা, আধার এবং মোবাইল—এই তিনটি উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত “জ্যাম ত্রয়ী” (Jan-Dhan-Aadhaar-Mobile Trinity) ব্যবস্থা কেন্দ্রীয় সরকারের কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোর অর্থ সরাসরি উপভোক্তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। অর্থ মন্ত্রণালয় এই ব্যবস্থাকে “ডাইভারশন-প্রুফ মেকানিজম” বলে অভিহিত করেছে, যার মাধ্যমে সরকারি সহায়তা কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই সরাসরি উপভোক্তাদের কাছে পৌঁছে যায় ।
২০১৫ সালে যেখানে এই প্রকল্পের অধীনে ১৪.৭২ কোটি অ্যাকাউন্ট ছিল, সেখান থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত অ্যাকাউন্টের সংখ্যা প্রায় চারগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ৫৯.০৯ কোটিতে পৌঁছেছে। এই তথ্য থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, প্রকল্পটি ধারাবাহিকভাবে দেশের প্রতিটি প্রান্তে ব্যাংকিং সুবিধা বিস্তৃত করার লক্ষ্যে কাজ করে চলেছে ।
অসম ও বরাক উপত্যকায় আর্থিক অন্তর্ভুক্তির প্রভাব
জন ধন যোজনার এই সাফল্য অসম এবং বিশেষ করে হাইলাকান্দি জেলার মতো গ্রামীণ ও আধা-শহরাঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ললা টাউন এবং তার আশেপাশের গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী বহু পরিবার, বিশেষত কৃষিজীবী এবং দিনমজুর শ্রেণির মানুষ, এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সাথে যুক্ত হয়েছেন। প্রকল্পের অধীনে জিরো ব্যালেন্স অ্যাকাউন্ট খোলার সুবিধা এবং কোনো রক্ষণাবেক্ষণ চার্জ না থাকার বিষয়টি বরাক উপত্যকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য অত্যন্ত সহায়ক হয়েছে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, দেশজুড়ে জন ধন যোজনার প্রায় ৭৮ শতাংশ অ্যাকাউন্ট গ্রামীণ ও আধা-শহরাঞ্চলে খোলা হয়েছে, যা হাইলাকান্দির মতো মূলত গ্রামভিত্তিক জেলার বাসিন্দাদের জন্য এই প্রকল্পের প্রাসঙ্গিকতাকেই তুলে ধরে। স্থানীয় ব্যাংক শাখাগুলোতে জন ধন অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সরকারি ভর্তুকি, পেনশন এবং অন্যান্য কল্যাণমূলক সুবিধা সরাসরি প্রাপ্তির ব্যবস্থা এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের আর্থিক নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
আগামী দিনের লক্ষ্য ও পরিকল্পনা
অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, জন ধন যোজনা তার ১৩তম বর্ষে প্রবেশ করার সাথে সাথে সরকারের মূল লক্ষ্য থাকবে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পরিধি আরও বিস্তৃত করা, সঞ্চয়ের অভ্যাস উৎসাহিত করা এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে আরও সহজলভ্য করে তোলা। প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে থাকা মানুষদের মূলধারায় নিয়ে আসার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলেও মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে ।
আগামী বছরগুলোতে জন ধন যোজনার এই সাফল্যগাথা কীভাবে আরও এগিয়ে যায়, তার দিকে নজর থাকবে সবার। বরাক উপত্যকা এবং হাইলাকান্দি জেলার মতো অঞ্চলগুলোতে এই প্রকল্পের প্রভাব ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে, যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আর্থিক স্বনির্ভরতা অর্জনের পথকে আরও সুগম করে তুলবে।