অসম বন্যা মৃতের সংখ্যা বুধবার বেড়ে দাঁড়াল ৭৫-এ, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে সাতজনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। অসম ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সাতটি মৃত্যুর সবকটিই ঘটেছে শিবসাগর জেলার নাজিরা রাজস্ব সার্কেলে, যদিও রাজ্যজুড়ে বন্যা-দুর্গত মানুষের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৩.৩২ লক্ষে । পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে রাজ্য সরকার মৃতদের পরিবারের জন্য এক্স-গ্রেসিয়া বাড়িয়ে ৯ লাখ টাকা করেছে এবং ক্ষতিপূরণ পাওয়ার নিয়মও শিথিল করেছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন ।
এক্স-গ্রেসিয়া বৃদ্ধির ঘোষণা যেভাবে এলো
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ফেসবুক লাইভে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বন্যায় নিহত বা নিখোঁজদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের নিয়ম শিথিল করার কথা জানান । তিনি বলেন, “বর্তমানে প্রতি ভুক্তভোগীর জন্য ৪ লাখ টাকা এক্স-গ্রেসিয়া দেওয়া হয়, তার ওপরে মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে অতিরিক্ত ৫ লাখ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে,” অসম ট্রিবিউনকে উদ্ধৃত করে জানানো হয়েছে । অর্থাৎ, মোট ৯ লাখ টাকা পাবে নিহতদের পরিবার। নিখোঁজ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে, একমাসের মধ্যে দেহ না পাওয়া গেলেও পরিবারকে ৯ লাখ টাকা এক্স-গ্রেসিয়া দেওয়া হবে, আর সার্কেল অফিসারকে এই সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেট ইস্যুর ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ।
এতদিন এক্স-গ্রেসিয়া পাওয়ার জন্য ময়নাতদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল, যা এখন তুলে নেওয়া হয়েছে। সার্কেল অফিসারের সার্টিফিকেটই এখন যথেষ্ট বলে গণ্য হবে, যা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য প্রক্রিয়া সহজ করবে বলে সরকারি সূত্রে জানা গেছে ।
রাজ্যজুড়ে বন্যা পরিস্থিতির ক্রমবিবর্তন
চলতি বছরের বন্যা পরিস্থিতি ধাপে ধাপে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। নিউজ১৮ ও ASDMA-র তথ্য অনুযায়ী, ২১ জুলাই মৃতের সংখ্যা ছিল ৩১, ২৫ জুলাই তা বেড়ে হয় ৬৬, আর এখন তা পৌঁছেছে ৭৫-এ । একইভাবে দুর্গত মানুষের সংখ্যাও ওঠানামা করেছে—২১ জুলাই ৫.৬৪ লক্ষ, ২৫ জুলাই ৬.৫৫ লক্ষ থেকে কমে এখন ৩.৩২ লক্ষে দাঁড়িয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয় L
এএনআই-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিবসাগর, চরাইদেও, গোলাঘাট, যোরহাট, নগাঁও ও কামরূপ (মেট্রোপলিটন) জেলা এবার বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যেখানে ৬৩১টি গ্রাম ২১টি রাজস্ব সার্কেলের অধীনে এখনও জলমগ্ন । কৃষিক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতিও উল্লেখযোগ্য—৩৭,১৩৯.৫২ হেক্টর ফসলি জমি জলের তলায় চলে গেছে, আর ২.৫৬ লক্ষেরও বেশি গবাদি পশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ২৬ হাজারের বেশি পশু ভেসে গেছে বলে ASDMA-র তথ্যে উঠে এসেছে । বর্তমানে ৯৭ জন গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী মা এবং ৪২ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ মোট ২৮,৬৯৫ জন ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন ।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির প্রেক্ষাপট
এবারের বন্যা মূলত উজান অসমের জেলাগুলোতে—বিশেষত শিবসাগর, চরাইদেও ও যোরহাটে—সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে, বরাক উপত্যকা এখনও পর্যন্ত এই দুর্যোগের বাইরে রয়েছে। তবে হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের বাসিন্দাদের জন্য এই খবরের গুরুত্ব ভিন্ন জায়গায়—রাজ্য সরকার যে এক্স-গ্রেসিয়া বৃদ্ধি ও নথিপত্র শিথিলের নীতি নিয়েছে, তা ভবিষ্যতে বরাক উপত্যকায় বন্যা বা অন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটলেও প্রযোজ্য হবে। প্রতি বছর বর্ষায় কাছাড় ও হাইলাকান্দি জেলার নিচু এলাকাগুলো জলমগ্ন হওয়ার অভিজ্ঞতা থাকায়, এই নীতিগত পরিবর্তন স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছেও প্রাসঙ্গিক।
একইসঙ্গে, রাজ্যের সামগ্রিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতিতে এই ধরনের পরিবর্তন ভবিষ্যতে জেলা প্রশাসনের কাজের ধরনও প্রভাবিত করবে। সার্কেল অফিসারের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ময়নাতদন্তের বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত হাইলাকান্দির মতো জেলাগুলোতেও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করার একটি নজির তৈরি করল।
সামনে কী দেখার আছে
অসম বন্যা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের হিসাব প্রতিদিনই বদলাতে পারে। ধানসিঁড়ি নদী এখনও বিপদসীমার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে বলে ASDMA জানিয়েছে, যা আগামী দিনেও পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা জরুরি করে তুলছে । এক্স-গ্রেসিয়া বৃদ্ধি ও নিয়ম শিথিলের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো দ্রুত ক্ষতিপূরণ পাবে কি না, তা নির্ভর করবে জেলা প্রশাসনের বাস্তবায়নের গতির ওপর। রাজ্যের দুর্যোগ মোকাবিলা নীতির এই পরিবর্তন সামনের বর্ষা মরসুমে বরাক উপত্যকাসহ গোটা অসমের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হয়ে থাকবে।