শিলচর মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের (SMCH) নতুন প্রিন্সিপাল কম চিফ সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন বিশিষ্ট চিকিৎসক ডাঃ অভিজিৎ স্বামী। অসম সরকারের মেডিকেল এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ বিভাগের কমিশনার ও সচিব ডাঃ সিদ্ধার্থ সিংহ, IAS-এর স্বাক্ষরিত একটি অফিসিয়াল অর্ডারে এই নিয়োগের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। আগস্ট ২৬ তারিখে জারি করা এই বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ডাঃ স্বামী তাৎক্ষণিকভাবে এই পদের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন এবং পূর্ববর্তী প্রিন্সিপাল ডাঃ ভাস্কর গুপ্তাকে এই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
শিলচর মেডিকেল কলেজ প্রিন্সিপাল পদে নতুন নেতৃত্ব
ডাঃ অভিজিৎ স্বামী বর্তমানে শিলচর মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাঁকে “অতিরিক্ত দায়িত্ব” হিসেবে এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং তিনি “পরবর্তী নির্দেশ পর্যন্ত” এই দায়িত্ব পালন করবেন। অসম সরকারের মেডিকেল এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ বিভাগ থেকে জারি করা এই অর্ডারে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, এই সিদ্ধান্তটি “জনসেবার স্বার্থে” নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, ডাঃ ভাস্কর গুপ্তা, যিনি ডার্মাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক হিসেবেও কর্মরত, তাঁকে এই অতিরিক্ত দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে যদিও এই পরিবর্তনের পেছনের সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি, তবে স্থানীয় সূত্র থেকে জানা গেছে যে, ডাঃ গুপ্তা নিজেই সরকারের কাছে এই দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার আবেদন করেছিলেন।
প্রশাসনিক পরিবর্তনের পেছনের প্রেক্ষাপট
এই প্রশাসনিক পরিবর্তনের পেছনে একটি উল্লেখযোগ্য প্রেক্ষাপট রয়েছে। ডাঃ ভাস্কর গুপ্তা সম্প্রতি শিলচর শহরের একটি বিতর্কিত স্পা কাম স্যালন মামলায় জড়িয়ে পড়েছিলেন। জুলাই মাসে কাছাড় পুলিশ শহরের ইম্পেরিয়াল মলে অবস্থিত দুটি স্পা কাম স্যালনে অভিযান চালায় এবং ২৮ জন মহিলাকে আটক করে, যারা অবৈধ কার্যকলাপে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। এই স্পাগুলির একটির মালিকানা ডাঃ গুপ্তার স্ত্রী শর্মিষ্ঠা গুপ্তার নামে ছিল বলে পুলিশ তদন্তে উঠে আসে।
এই ঘটনার পর জুলাই ১ তারিখে কাছাড় পুলিশ ডাঃ গুপ্তা এবং তাঁর স্ত্রীকে প্রায় চার ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করে। যদিও ডাঃ গুপ্তা পরবর্তীতে স্পা পরিচালনা বা মালিকানা অস্বীকার করেন এবং জানান যে, পুলিশ অভিযানের পর তিনি ভাড়াটেদের সাথে চুক্তি বাতিল করে দিয়েছেন। তবুও এই ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং মেডিকেল কলেজের প্রশাসনিক নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
বরাক উপত্যকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এই পরিবর্তনের প্রভাব
শিলচর মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল কেবল কাছাড় জেলারই নয়, বরং পুরো বরাক উপত্যকার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান। হাইলাকান্দি জেলার ললা টাউন এবং আশেপাশের এলাকার বাসিন্দারা গুরুতর চিকিৎসার জন্য প্রায়শই এই হাসপাতালে নির্ভর করেন। এই প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক নেতৃত্বের পরিবর্তন সরাসরি এই অঞ্চলের স্বাস্থ্য পরিষেবার মানকে প্রভাবিত করতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে অসম সরকার রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ‘স্বাস্থ্য চিন্তন শিবির ২০২৬’-এ স্বাস্থ্যমন্ত্রী অশোক সিংহল জানিয়েছেন যে, রাজ্যের মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতালগুলিতে ৪,২০০টিরও বেশি পদ শূন্য রয়েছে, বিশেষ করে কার্ডিওলজিস্ট এবং নিউরোলজিস্টের মতো সুপার-স্পেশালিটি বিশেষজ্ঞদের নিয়োগে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে সরকার। এই পরিস্থিতিতে শিলচর মেডিকেল কলেজের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বের পরিবর্তন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
নতুন প্রিন্সিপালের দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জ
ডাঃ অভিজিৎ স্বামীর সামনে এখন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। শিলচর মেডিকেল কলেজের মতো একটি বড় প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি, তাঁকে হাসপাতালের চিকিৎসা পরিষেবার মান উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করা এবং স্টাফদের সমন্বয় সাধনের মতো কাজগুলিও করতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে হাসপাতাল ক্যাম্পাস থেকে বাণিজ্যিক যানবাহন সরিয়ে নেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যাতে জরুরি পরিষেবায় কোনো বাধা না হয়। এই ধরনের উন্নয়নমূলক কাজ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি, নতুন প্রিন্সিপালকে হাসপাতালের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং রোগীদের পরিষেবার মান আরও উন্নত করার দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা
হাইলাকান্দি জেলার ললা টাউন এবং আশেপাশের গ্রামের বাসিন্দাদের জন্য শিলচর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য কেন্দ্র। গুরুতর অসুস্থতা বা জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রায়শই এই হাসপাতালেই নির্ভর করেন। তাই নতুন প্রিন্সিপালের নেতৃত্বে হাসপাতালের পরিষেবার মান আরও উন্নত হবে—এমনটাই আশা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দাদের জন্য হাসপাতালের জরুরি বিভাগের পরিষেবা, ওষুধের প্রাপ্যতা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শের ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন প্রশাসনিক নেতৃত্ব এই বিষয়গুলির দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভবিষ্যতের দিকে নজর
ডাঃ অভিজিৎ স্বামীর এই নতুন দায়িত্ব গ্রহণের পর শিলচর মেডিকেল কলেজের প্রশাসনিক কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হয়, তার দিকে এখন নজর থাকবে সব মহলের। সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি “পরবর্তী নির্দেশ পর্যন্ত” এই দায়িত্ব পালন করবেন, যা থেকে বোঝা যায় যে, ভবিষ্যতে এই পদে স্থায়ী নিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে।
বরাক উপত্যকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে এই নেতৃত্বের পরিবর্তন কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করে, তা আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠবে। স্থানীয় বাসিন্দারা আশা করছেন যে, নতুন প্রিন্সিপালের নেতৃত্বে শিলচর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আরও উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা প্রদান করতে সক্ষম হবে এবং বরাক উপত্যকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।