অসম এনআরসি প্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলিতে কেন্দ্র ও অসম সরকারের জবাব চেয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬ প্রধান বিচারপতির বেঞ্চে একাধিক আবেদনের শুনানিতে জাতীয় নাগরিকপঞ্জিতে অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের পরিচয়পত্র দেওয়া এবং তালিকা থেকে বাদ পড়া আবেদনকারীদের জন্য আপিলের ব্যবস্থা চালু না হওয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আদালত কেন্দ্র, অসম সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাঁদের অবস্থান জানাতে বলেছে ।
অসমে চূড়ান্ত এনআরসি প্রকাশের প্রায় সাত বছর পরেও পরবর্তী আইনি ও প্রশাসনিক ধাপগুলি সম্পূর্ণ না হওয়ায় এই শুনানি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। তবে আদালত এখনও কোনও চূড়ান্ত নির্দেশ দেয়নি বা এনআরসি তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত বা বাদ পড়ার বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি। এখন মূল নজর থাকবে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের লিখিত জবাবে এবং পরবর্তী শুনানিতে।
কোন বিষয় নিয়ে শুনানি
আবেদনকারীদের বক্তব্য, ২০১৯ সালের আগস্টে চূড়ান্ত এনআরসি প্রকাশিত হলেও অন্তর্ভুক্ত নাগরিকদের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। একইভাবে, তালিকায় নাম না থাকা ব্যক্তিদের হাতে প্রত্যাখ্যানের নথি বা rejection slip না পৌঁছানোয় তাঁদের আইনি আপিলের পথও কার্যত চালু হয়নি বলে আবেদনে দাবি করা হয়েছে ।
সুপ্রিম কোর্টে পেশ করা আবেদনে বলা হয়েছে, এনআরসি-তে অন্তর্ভুক্ত প্রায় ৩ কোটি ১১ লক্ষ মানুষের পরিচয়পত্র এখনও দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে প্রায় ১৯ লক্ষ আবেদনকারী চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পাননি। আবেদনকারীদের বক্তব্য, বাদ পড়া ব্যক্তিদের Foreigners Tribunal-এ আপিল করার সুযোগ থাকলেও প্রয়োজনীয় নথি না পাওয়ায় সেই প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না ।
শুনানিতে আবেদনকারীদের পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী কপিল সিবল উপস্থিত ছিলেন বলে দ্য হিন্দু জানিয়েছে। তাঁর পক্ষ থেকে আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলা হয়, পূর্বে নোটিস জারি হলেও কেন্দ্র ও রাজ্যের তরফে এখনও যথাযথ জবাব দেওয়া হয়নি । আদালত এখন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির বক্তব্য লিখিতভাবে জানতে চাইছে।
২০১৯ সালের এনআরসি ও পরিসংখ্যান
অসমের চূড়ান্ত এনআরসি ৩১ আগস্ট, ২০১৯ প্রকাশিত হয়। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট ৩ কোটি ৩০ লক্ষের বেশি আবেদনকারীর মধ্যে প্রায় ৩ কোটি ১১ লক্ষ নাম চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ১৯ লক্ষের কিছু বেশি আবেদনকারী বাদ পড়েন । এই তালিকা তৈরির কাজ সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়েছিল এবং এর উদ্দেশ্য ছিল অসমে বসবাসকারী প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকদের নথিভুক্ত করা।
তবে তালিকা প্রকাশের পর থেকেই এর পরবর্তী ধাপ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বাদ পড়া ব্যক্তিদের দাবি ও আপত্তি যাচাই, প্রত্যাখ্যানের কারণ জানানো, আপিলের সুযোগ এবং অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের পরিচয়পত্র দেওয়া—এই বিষয়গুলিকে এনআরসি প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ।
২০১৯ সালে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক বলেছিল, এনআরসি থেকে বাদ পড়া মানেই কাউকে সঙ্গে সঙ্গে বিদেশি ঘোষণা করা নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি Foreigners Tribunal, হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টে আইনি প্রতিকার চাইতে পারবেন—এমন আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল । বর্তমান আবেদনের মূল বক্তব্য হলো, সেই আইনি পথ বাস্তবে ব্যবহার করতে হলে প্রত্যাখ্যানের কারণ ও প্রয়োজনীয় নথি দ্রুত দিতে হবে।
পরিচয়পত্র ও তথ্যের নিরাপত্তা
এনআরসি-তে অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের পরিচয়পত্র দেওয়ার বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এর সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তাও যুক্ত। ২০২৫ সালে অসমের ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে আলোচনার সময় এনআরসি তথ্য ব্যবহারের আগে আধার-সদৃশ তথ্য-সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির প্রসঙ্গ উঠেছিল । সুপ্রিম কোর্টও এনআরসি তথ্য ভাগ করে নেওয়ার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় l
এনআরসি-র তথ্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। নাম, ঠিকানা, পারিবারিক সম্পর্ক, উত্তরাধিকার নথি এবং নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত কাগজপত্র এতে থাকতে পারে। তাই পরিচয়পত্র বিতরণ বা তথ্য ব্যবহারের আগে তথ্য ফাঁস, ভুল পরিচয় তৈরি এবং অননুমোদিত ব্যবহারের ঝুঁকি কমানো দরকার। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার আদালতে যে জবাব দেবে, তাতে এই নিরাপত্তা কাঠামোর অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে।
আবেদনকারীদের আরও দাবি, এনআরসি প্রক্রিয়ায় ইতিমধ্যে প্রায় ১,৬০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, কিন্তু তালিকা প্রকাশের পর প্রয়োজনীয় পরবর্তী কাজ থমকে রয়েছে । আদালত এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রশাসনিক বিলম্বের কারণ জানতে পারে।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির প্রাসঙ্গিকতা
অসম এনআরসি প্রক্রিয়ার প্রভাব বরাক উপত্যকার কাছাড়, হাইলাকান্দি ও করিমগঞ্জ জেলাতেও রয়েছে। এই অঞ্চলের বহু পরিবারের কাছে নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত পুরনো নথি, জমির কাগজ, ভোটার তালিকা, জন্মনিবন্ধন ও বংশপরিচয়ের দলিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লালা টাউন ও আশপাশের বাসিন্দাদের মধ্যে যাঁদের নাম এনআরসি-তে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বা বাদ পড়েছে, তাঁদের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর আদালতের নির্দেশ সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে কোনও ব্যক্তির নাম তালিকায় না থাকা মানেই তিনি বিদেশি—এমন সিদ্ধান্ত আইনগত প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার আগে নেওয়া যায় না । একইভাবে তালিকায় নাম থাকা ব্যক্তিদের পরিচয়পত্র কবে দেওয়া হবে, সেটিও এখনও স্পষ্ট নয়। তাই স্থানীয় মানুষজনকে গুজবের ওপর নির্ভর না করে সরকারি বিজ্ঞপ্তি, আইনজীবী এবং অনুমোদিত সহায়তা কেন্দ্রের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সামনে কী হতে পারে
এখন কেন্দ্র, অসম সরকার, রেজিস্ট্রার জেনারেল অব সিটিজেন রেজিস্ট্রেশন এবং রাজ্যের এনআরসি সমন্বয়কের জবাবের অপেক্ষা করবে সুপ্রিম কোর্ট। জবাব পাওয়ার পর আদালত পরিচয়পত্র বিতরণ, rejection slip দেওয়া এবং বাদ পড়া ব্যক্তিদের আপিল প্রক্রিয়া নিয়ে সময়সীমা বা নির্দিষ্ট নির্দেশ দিতে পারে। তবে সেই সিদ্ধান্ত পরবর্তী শুনানির ওপর নির্ভর করছে।
অসম এনআরসি প্রক্রিয়া নিয়ে সোমবারের শুনানি দীর্ঘ প্রশাসনিক স্থবিরতার মধ্যে নতুন আইনি গতি তৈরি করেছে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরবর্তী পদক্ষেপ যেন স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং আইনসম্মত হয়—যাতে অন্তর্ভুক্ত নাগরিকরা নথি পান এবং বাদ পড়া আবেদনকারীরা যথাযথ আপিলের সুযোগ লাভ করেন।