ইউটিউবারদের বন্যা সাহায্য তহবিল সংগ্রহ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অসম সরকার একটি বড় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা বুধবার জানিয়েছেন, অসমে বন্যা দুর্গতদের জন্য ৭২ জন ইউটিউবার যে তহবিল সংগ্রহ করেছেন, সরকার তা যাচাই করে দেখবে। এই অর্থ সঠিক উপায়ে অসমে পৌঁছেছে কিনা এবং তা কীভাবে ব্যয় করা হয়েছে, তা নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই ৭২ জন ইউটিউবার রাজ্যের ভেতর এবং বাইরে থেকে বন্যা দুর্গতদের সাহায্যের নামে অর্থ সংগ্রহ করেছেন। অনেকেই ভালো কাজ করেছেন, তবে দাতাদের অর্থ যাতে সঠিক হাতে পৌঁছায় এবং একই ত্রাণের পুনরাবৃত্তি না হয়, তার জন্য ব্যয়ের হিসাব নেওয়া জরুরি । অসম পুলিশের সাইবার সেল ইতিমধ্যেই এই তহবিল সংগ্রহ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত অ্যাকাউন্টগুলোর ওপর নজরদারি শুরু করেছে ।
কেন এই যাচাই প্রক্রিয়া
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অসমে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করলে অনেক কন্টেন্ট ক্রিয়েটর, ইউটিউবার এবং সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। তারা তাদের ভিডিওর মাধ্যমে আবেদন জানিয়ে ইউপিআই (UPI) বা কিউআর কোডের (QR Code) মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করেন । কিন্তু এই সংগৃহীত অর্থের কোনো সরকারি হিসাব না থাকায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলেন, “অনেকেই অর্থ সংগ্রহ করে সাহায্য করা শুরু করেছেন। কিন্তু আমরা তাদের কাছে জানতে চাইব এই অর্থ তারা কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহার করেছেন। এর ফলে কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকায় অতিরিক্ত ত্রাণ যাওয়া এবং অন্য এলাকার বঞ্চিত হওয়ার মতো ঘটনা এড়ানো যাবে।”
পুলিশ ও সাইবার সেলের নজরদারি
অসম পুলিশের ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (CID) এবং সাইবার সেল এই বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখছে। পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে যে, কিছু অসাধু চক্র বন্যা সাহায্যের নামে ভুয়ো অ্যাকাউন্ট তৈরি করে অর্থ সংগ্রহ করেছে। বর্তমানে প্রায় ৫০টি সন্দেহজনক অ্যাকাউন্ট পুলিশের বিশেষ নজরদারিতে রয়েছে। এই অ্যাকাউন্টগুলোর প্রতিটি লেনদেনের পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করা হচ্ছে ।
সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে, যারা সততার সঙ্গে ত্রাণের কাজ করেছেন, তাদের কাজকে সম্মান জানানো হবে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “ত্রাণ কাজে যুক্ত ইউটিউবার এবং অন্যান্য ব্যক্তিদের অবদানকে আমরা স্বীকার করতে চাই এবং তাদের প্রথাগত গামোসা দিয়ে সম্মান জানাব। তবে তার আগে তাদের অ্যাকাউন্টগুলো যাচাই করতে হবে।”
বরাক উপত্যকা ও লালার উপর প্রভাব
এই সরকারি নির্দেশিকা বরাক উপত্যকা, বিশেষ করে কাছাড়, করিমগঞ্জ এবং হাইলাকান্দি জেলার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই জেলাগুলোর লালা টাউনের মতো অনেক এলাকাও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং স্থানীয় মানুষজন সোশ্যাল মিডিয়ায় ত্রাণের আবেদন দেখে অনুদান দিয়ে থাকেন।
স্থানীয় দাতারা এখন নিশ্চিত হতে পারবেন যে তাদের দেওয়া অনুদান সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে। লালা টাউনের মতো ছোট শহরগুলোর বাসিন্দারা, যারা বিভিন্ন সময় ইউটিউবারদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বন্যার্তদের সাহায্য করেছেন, তারাও সরকারের এই স্বচ্ছতা আনার পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
সরকারের নিজস্ব ত্রাণ উদ্যোগ
ইউটিউবারদের তহবিলের পাশাপাশি অসম সরকার নিজস্ব ত্রাণ কার্যক্রমও জোরদার করেছে। সম্প্রতি রাজ্য সরকার ডাইরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার (DBT) ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রায় ৭৫,০০০ বন্যা দুর্গত পরিবারকে ১৫,০০০ টাকা করে আর্থিক সাহায্য দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে । এছাড়া মুখ্যমন্ত্রী দলীয় কর্মীদের সহায়তায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে ২ লাখ মেখেলা-চাদর এবং ২ লাখ শিশুদের পোশাক বিতরণের একটি উদ্যোগও হাতে নিয়েছেন ।
ইউটিউবারদের বন্যা সাহায্য তহবিল যাচাইয়ের এই পদক্ষেপ দাতাদের আস্থা ফেরাতে সাহায্য করবে। যারা প্রকৃতই মানুষের পাশে দাঁড়াতে চান, তাদের কাজের হিসাব দেওয়া কঠিন হবে না। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অসম সরকার নিশ্চিত করতে চাইছে যে, বিপদের সময়ে সাধারণ মানুষের দেওয়া প্রতিটি টাকার সঠিক ব্যবহার হয় এবং কোনো প্রতারণার সুযোগ না থাকে।