শ্রীভূমিতে যুবকের অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘিরে রবিবার সকাল থেকেই শহরজুড়ে শোকের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। শহরের নীলমণি রোডের বাসিন্দা ৩০ বছর বয়সী দ্বৈপায়ন সেনকে শনিবার রাতের পর থেকে রবিবার ভোরের দিকে অস্বাভাবিক অবস্থায় পাওয়া যায় l পরিবার তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে গেলেও তাঁকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে।
পোষ্য কুকুর হারিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন দ্বৈপায়ন
কিছুদিন আগেই দ্বৈপায়নের পোষা দুটি কুকুর — মার্লি ও সিজার — পর পর মারা যায়। এই দুটি কুকুর তাঁর কাছে কেবল পোষ্য ছিল না, ছিল পরিবারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের হারানোর পর থেকে দ্বৈপায়ন গভীর মানসিক অবসাদে পড়েন বলে পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনরা জানিয়েছেন।
বরাক তরঙ্গের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দ্বৈপায়ন শুধু নিজের কুকুর নয়, শহরের পথকুকুরদের সেবাতেও সক্রিয় ছিলেন। কোথাও কোনো কুকুর অসুস্থ হলে তিনি সবার আগে ছুটে যেতেন। এমনকি পশু সেবার লক্ষ্যে একটি সংস্থাও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। তাঁর এই পশুপ্রেম শ্রীভূমিতে সুপরিচিত ছিল।
WhatsApp স্ট্যাটাস এবং তদন্তের অগ্রগতি
মৃত্যুর আগে ভোর ৩টা ৪৫ মিনিটে দ্বৈপায়ন সামাজিক মাধ্যমে একটি স্ট্যাটাস পোস্ট করেন। বরাক বুলেটিন ও টাইমস অফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই স্ট্যাটাসে তিনি লিখেছিলেন: “আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। আমি আমার মার্লি ও সিজারের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি।” এই বার্তাটি পরিবার ও বন্ধুদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং পুলিশ এখন এটিকে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।
তবে পুলিশ পরিষ্কার জানিয়েছে যে কেবল এই বার্তার ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্তে আসা যাবে না। টাইমস অফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন: “সব দিক খতিয়ে দেখা হবে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।” শরীরে বিষাক্ত পদার্থ সেবনের আলামত পাওয়া গেছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, তবে তদন্ত এখনও চলছে।
মানসিক স্বাস্থ্য এবং পোষ্য প্রাণীর সাথে মানবিক বন্ধন
এই ঘটনাটি একটি বৃহত্তর সামাজিক প্রশ্নের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে — মানুষ এবং তাদের পোষ্য প্রাণীর মধ্যে যে গভীর মানসিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তার গুরুত্ব কতটা স্বীকৃত। পশু মনোবিজ্ঞানীদের মতে, দীর্ঘদিনের সঙ্গী পোষ্য প্রাণীর মৃত্যু অনেকের ক্ষেত্রে পরিজন হারানোর সমতুল্য মানসিক আঘাত সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের শোক অনেক সময় সামাজিকভাবে স্বীকৃতি পায় না বলেই মানুষ একাকী তা বহন করতে থাকেন এবং মানসিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন।
ভারতে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা এখনও সীমিত। iCall এবং Vandrevala Foundation-সহ বেশ কয়েকটি সংস্থা মানসিক অবসাদে আক্রান্তদের জন্য সহায়তা প্রদান করে থাকে। যেকোনো মানসিক সংকটে iCall হেল্পলাইন নম্বর ৯১৫২৯৮৭৮২১ তে যোগাযোগ করা যেতে পারে।
বরাক উপত্যকায় মানসিক স্বাস্থ্য সংকট এবং স্থানীয় প্রাসঙ্গিকতা
শ্রীভূমিতে যুবকের এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা বরাক উপত্যকার বৃহত্তর মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতির দিকেও দৃষ্টি ফেরায়। হাইলাকান্দি, করিমগঞ্জ এবং শ্রীভূমি — এই তিনটি জেলায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ এখনও অপ্রতুল। লালা টাউনের মতো ছোট শহরে বসবাসকারী মানুষের পক্ষে বিশেষজ্ঞ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া কঠিন। ঘনিষ্ঠজনের আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করলে তাৎক্ষণিকভাবে সহায়তা প্রদান করা এই অঞ্চলে সামাজিক কর্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত বলে সামাজিক কর্মীরা মনে করেন।
দ্বৈপায়নের ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা জানিয়েছেন, তিনি কুকুর দুটির মৃত্যুর পর নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন। পরিবারের সদস্যরা বলেছেন, তাঁর আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করলেও পরিস্থিতি এতটা গুরুতর হয়ে উঠবে তা বুঝে ওঠা সম্ভব হয়নি l
দ্বৈপায়ন সেনের এই মর্মান্তিক পরিণতি শুধু শ্রীভূমির নয়, সমগ্র বরাক উপত্যকার মানুষকে একটি বার্তা দেয় — মানসিক কষ্টে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাঁর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনাটাই হতে পারে সবচেয়ে বড় সহায়তা। পুলিশের তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ আরও স্পষ্ট হবে বলে আশা করা হচ্ছে।