হর ঘর তিরঙ্গা অভিযানে দেশবাসীকে উৎসাহের সঙ্গে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ২০২৬ সালের এই কর্মসূচি ৯ থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, জাতীয় পতাকা ভারতের গর্ব এবং প্রত্যেক নাগরিককে দেশের জন্য নিজের সেরাটা দেওয়ার অনুপ্রেরণা জোগায়। এ বছর হর ঘর তিরঙ্গা অভিযানটি ‘বন্দে মাতরম’-এর ১৫০ বছর পূর্তির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে ।
সামাজিক মাধ্যমে এক বার্তায় প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন, “আমাদের তেরঙ্গা আমাদের গর্ব এবং দেশের জন্য সর্বোত্তম কাজ করার নিরন্তর অনুপ্রেরণা। আসুন, হর ঘর তিরঙ্গা আন্দোলনে উৎসাহের সঙ্গে অংশ নিই এবং বিকশিত ভারত গড়ার জন্য আমাদের সম্মিলিত সংকল্পকে নতুন করে দৃঢ় করি” । তাঁর এই আহ্বানের লক্ষ্য ঘর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি দপ্তর এবং বিভিন্ন সামাজিক পরিসরে নাগরিক অংশগ্রহণ বাড়ানো।
কীভাবে পালিত হচ্ছে অভিযান
হর ঘর তিরঙ্গা অভিযান ২০২২ সালে ‘আজাদি কা অমৃত মহোৎসব’-এর অধীনে শুরু হয়েছিল। কয়েক বছরের মধ্যে এটি স্বাধীনতা দিবসকে ঘিরে দেশের অন্যতম বড় জনঅংশগ্রহণমূলক কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে। নাগরিকদের বাড়িতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, পতাকার সঙ্গে ছবি তোলা এবং দেশাত্মবোধক কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয় ।
২০২৬ সালের কর্মসূচির অংশ হিসেবে তেরঙ্গা যাত্রা, তেরঙ্গা র্যালি, সঙ্গীতানুষ্ঠান এবং ‘বন্দে মাতরম’ সমবেতভাবে গাওয়ার মতো নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংস্কৃতি মন্ত্রক নাগরিকদের বাড়িতে পতাকা উত্তোলনের পাশাপাশি হর ঘর তিরঙ্গা পোর্টালে নিজেদের ছবি আপলোড করতে উৎসাহিত করেছে । এর মাধ্যমে সরকারি অনুষ্ঠানকে শুধু নির্দিষ্ট মঞ্চে সীমাবদ্ধ না রেখে সাধারণ মানুষের বাড়ি ও পাড়ায় পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।
এবারের অভিযানে দেশাত্মবোধের পাশাপাশি জাতীয় ঐক্য ও নাগরিক দায়িত্বের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। পতাকা উত্তোলনকে একটি আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে আটকে না রেখে দেশের প্রতি সম্মান, দায়িত্ববোধ এবং সম্মিলিত অংশগ্রহণের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
বন্দে মাতরমের ১৫০ বছর পূর্তির প্রেক্ষাপট
এই বছরের হর ঘর তিরঙ্গা অভিযান ‘বন্দে মাতরম’-এর ১৫০ বছর পূর্তির কারণে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এই সংযোগের কথা উল্লেখ করে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন । ‘বন্দে মাতরম’ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং বহু প্রজন্মের কাছে এটি দেশপ্রেমের প্রতীক হিসেবে পরিচিত।
এই উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, দেশাত্মবোধক গান, আলোচনা এবং শিক্ষামূলক কর্মসূচির আয়োজন করা হচ্ছে। তবে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী জাতীয় পতাকার মর্যাদা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পতাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রে সময়, সংরক্ষণ ও ব্যবহারের নিয়ম মানা এবং অনুষ্ঠান শেষে পতাকার যথাযথ মর্যাদা রক্ষা করা নাগরিকদের দায়িত্ব।
আগের বছরগুলিতে অনলাইন অংশগ্রহণও এই অভিযানের বড় অংশ হয়ে উঠেছিল। ২০২৫ সালের কর্মসূচিতে ৭.৫০ কোটির বেশি ‘তিরঙ্গা সেলফি’ আপলোড হয়েছিল বলে সরকারি তথ্য জানায় । এই পরিসংখ্যান দেখায়, সামাজিক মাধ্যম কীভাবে একটি জাতীয় কর্মসূচিকে দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারে।
আসাম, বরাক উপত্যকা ও লালা টাউনের ভূমিকা
আসামেও হর ঘর তিরঙ্গা অভিযানকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন জেলা ও স্থানীয় প্রশাসন কর্মসূচি নিতে পারে। স্কুল, কলেজ, যুব ক্লাব, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং পৌর সংস্থার উদ্যোগে তেরঙ্গা র্যালি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও দেশাত্মবোধক গান পরিবেশনের আয়োজন করা সম্ভব। বরাক উপত্যকার শিলচর, হাইলাকান্দি ও করিমগঞ্জ জেলার মানুষও এই জাতীয় কর্মসূচিতে যুক্ত হতে পারেন।
লালা টাউনের বাসিন্দাদের জন্য এই অভিযান স্থানীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করে। বাজার এলাকা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পাড়া সংগঠন এবং সরকারি কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলনের পাশাপাশি স্বাধীনতা সংগ্রাম, সংবিধান এবং নাগরিক কর্তব্য নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। এতে কর্মসূচিটি শুধু ছবি তোলা বা পতাকা টাঙানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দেশের ইতিহাস ও গণতান্ত্রিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়বে।
তবে স্থানীয় আয়োজকদের নিশ্চিত করতে হবে, যেন অনুষ্ঠানে জাতীয় পতাকার ব্যবহার যথাযথ নিয়ম মেনে হয়। ছেঁড়া বা নোংরা পতাকা ব্যবহার না করা, পতাকা মাটিতে পড়ে না যেতে দেওয়া এবং কর্মসূচি শেষে তা সম্মানের সঙ্গে সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
নাগরিকদের কীভাবে অংশ নেওয়া উচিত
নাগরিকরা বাড়িতে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের পাশাপাশি পরিবারের শিশু ও তরুণদের কর্মসূচির উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানাতে পারেন। স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীরা তেরঙ্গা যাত্রা, রচনা প্রতিযোগিতা, বক্তৃতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা সমবেত গান পরিবেশনে অংশ নিতে পারে। স্থানীয় সংগঠনগুলি প্রবীণ স্বাধীনতা সংগ্রামী, প্রাক্তন সেনাকর্মী এবং সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষকে নিয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করতে পারে।
অনলাইনে অংশ নিতে চাইলে সরকারি হর ঘর তিরঙ্গা পোর্টালে পতাকার সঙ্গে ছবি আপলোড করার সুযোগ রয়েছে । তবে সামাজিক মাধ্যমে ছবি দেওয়ার চেয়ে কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য—দেশের প্রতি দায়িত্ব, ঐক্য এবং নাগরিক অংশগ্রহণ—বোঝা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যে পরিবার পতাকা তুলতে পারছে না, তারাও দেশাত্মবোধক গান, পরিচ্ছন্নতা অভিযান বা স্থানীয় সামাজিক কাজে যুক্ত হয়ে অংশ নিতে পারে।
সামনে কী দেখার আছে
হর ঘর তিরঙ্গা অভিযান ১৭ আগস্ট পর্যন্ত চলবে। এই সময়ে দেশজুড়ে কত মানুষ পতাকা উত্তোলন করেন, কতগুলি স্থানীয় কর্মসূচি হয় এবং তরুণদের অংশগ্রহণ কতটা বাড়ে, তা নজরে থাকবে । কর্মসূচির সাফল্য শুধু পতাকার সংখ্যা দিয়ে নয়, নাগরিকদের মধ্যে ঐক্য, দায়িত্ববোধ এবং দেশের প্রতি সম্মান কতটা গভীর হয়, তা দিয়েও বিচার করা উচিত।
লালা টাউনসহ বরাক উপত্যকার মানুষ যদি নিজেদের পাড়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে এই উদ্যোগে যুক্ত হন, তাহলে স্বাধীনতা দিবসের আবহ আরও অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে। জাতীয় পতাকার মর্যাদা রক্ষা করে সম্মিলিত অংশগ্রহণই হর ঘর তিরঙ্গা অভিযানের মূল বার্তাকে বাস্তব রূপ দেবে।