অরুণোদয় প্রকল্প টাকা আগামী ১ আগস্ট থেকে ফের সুবিধাভোগীদের অ্যাকাউন্টে জমা পড়তে শুরু করবে, বৃহস্পতিবার এই ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। রাজ্যের ৩৭.১ লক্ষ মহিলা সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে এই আর্থিক সহায়তা পাবেন, আর বন্যা-বিধ্বস্ত চার জেলার সুবিধাভোগীরা এই মাসে বাড়তি অর্থ পাবেন বলে ইন্ডিয়া টুডে এনই-কে উদ্ধৃত করে জানানো হয়েছে । ডিসপুরে সমস্ত জেলা কমিশনারের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সের পর এই ঘোষণা আসে, যেখানে রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন পর্যালোচনা করা হয়।
কারা পাবেন বাড়তি টাকা
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, “১ আগস্ট থেকে আমরা আধার-সংযুক্ত অরুণোদয় প্রকল্পের অর্থ প্রদান পুনরায় শুরু করব,” এবং সাধারণভাবে ৩৭.১ লক্ষ “মা ও বোন” মাসিক ১,২৫০ টাকা করে পাবেন । তবে শিবসাগর, চরাইদেও, যোরহাট ও গোলাঘাট—এই চার বন্যা-বিধ্বস্ত জেলার সুবিধাভোগীরা পুনর্বাসন ও ক্ষয়ক্ষতি পুনরুদ্ধারে সহায়তার জন্য এই মাসে ২,৫০০ টাকা করে পাবেন, অর্থাৎ স্বাভাবিক পরিমাণের দ্বিগুণ । এক্স-এ দেওয়া পোস্টে মুখ্যমন্ত্রী লিখেছেন, “বন্যা পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমরা ১ আগস্ট থেকে অরুণোদয়ের অর্থ বিতরণ পুনরায় শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি,” বলে জানানো হয়েছে ।
প্রয়োজনে সহায়তা পেতে সুবিধাভোগীদের পাশে থাকবেন অরুণোদয় সহায়করা, যাঁরা প্রকল্প সংক্রান্ত যেকোনো সমস্যায় সহায়তা করবেন বলে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন । ২০২০ সালে চালু হওয়া অরুণোদয় প্রকল্প অসম সরকারের প্রধান ডাইরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার (DBT) কর্মসূচি, যেখানে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর মহিলা সদস্যদের প্রধান সুবিধাভোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ।
নির্বাচনের পর প্রকল্প স্থগিত হওয়ার প্রেক্ষাপট
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, চলতি বছরের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার কারণে অরুণোদয় প্রকল্পের অর্থ প্রদান কিছুদিনের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছিল, যা এখন পুনরায় চালু হতে চলেছে । গত ১৯ জুলাই মুখ্যমন্ত্রী প্রথম ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে অরুণোদয়, ভর্তুকিযুক্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য এবং ছাত্র কল্যাণ প্রকল্পগুলো আগস্ট থেকে ফের রাজ্যবাসীর দোরগোড়ায় পৌঁছাবে । এই ঘোষণার সময়সূচি অনুযায়ী, ভর্তুকিযুক্ত মসুর ডাল ও চিনি বিতরণ ১ আগস্ট থেকে এবং অরুণোদয়ের মাসিক আর্থিক সহায়তা আগস্টের প্রথম সপ্তাহ থেকে পুনরায় শুরু হবে বলে জানানো হয়েছিল ।
জুলাই মাসে রাজ্যজুড়ে প্রায় ৭০ লক্ষ পরিবারকে ১,৩৪,২৩৭ মেট্রিক টন চাল বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়েছে বলে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, এবং এখন ভর্তুকিযুক্ত মসুর ডাল ও চিনি বিতরণও পুনরায় শুরু হচ্ছে । মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ১০ আগস্ট থেকে রাজ্যের ৭০ লক্ষেরও বেশি সুবিধাভোগী মাত্র ১০০ টাকায় রেশন কার্ড পিছু ১ কেজি মসুর ডাল ও ১ কেজি চিনি পাবেন বিনামূল্যে চালের সঙ্গে ।
ছাত্র কল্যাণ প্রকল্পেও নতুন গতি
অরুণোদয়ের পাশাপাশি আগস্ট মাসকে “অসমের জন্য একটি বিশেষ মাস” হিসেবে বর্ণনা করে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, নিজুট ময়না ও নিজুট বাবু প্রকল্পের আবেদনপত্র বিতরণ শুরু হবে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ থেকে । তিনি বলেন, “অক্টোবরে আমরা পাঁচ লক্ষেরও বেশি শিক্ষার্থীকে ৩০০ কোটি টাকারও বেশি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্য রেখেছি,” যা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সাহায্য করবে । ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে এই দুই প্রকল্পের অধীনে ইতিমধ্যে ২.৫ লক্ষেরও বেশি শিক্ষার্থী ১৭৬ কোটি টাকারও বেশি সহায়তা পেয়েছেন বলে সরকারি পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে ।
মুখ্যমন্ত্রী জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন, যোগ্য সমস্ত সুবিধাভোগীকে কল্যাণমূলক প্রকল্পের আওতায় আনতে হবে এবং বিলম্ব ছাড়াই পরিষেবা পৌঁছে দিতে হবে । প্রসঙ্গত, এবারের বন্যায় রাজ্যে মৃতের সংখ্যা ৭৮-এ পৌঁছেছে এবং তিন লক্ষেরও বেশি মানুষ শিবসাগর, চরাইদেও ও যোরহাট জেলায় এখনও ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছেন, যার প্রেক্ষাপটেই এই বাড়তি আর্থিক সহায়তার সিদ্ধান্ত এসেছে ।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির জন্য প্রাসঙ্গিকতা
যদিও এবারের বাড়তি ২,৫০০ টাকার সুবিধা শুধু উজান অসমের চার বন্যা-বিধ্বস্ত জেলার জন্য নির্দিষ্ট, তবে অরুণোদয় প্রকল্পের সাধারণ মাসিক সহায়তা হাইলাকান্দি ও লালা টাউনসহ গোটা রাজ্যের যোগ্য মহিলা সুবিধাভোগীদের জন্যই প্রযোজ্য। প্রতি মাসের এই ১,২৫০ টাকা বহু নিম্ন আয়ের পরিবারের সংসার খরচ মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, এবং আগস্ট থেকে অর্থপ্রদান পুনরায় চালু হওয়ায় হাইলাকান্দি জেলার সুবিধাভোগীরাও স্বস্তি পাবেন। একইসঙ্গে ভর্তুকিযুক্ত রেশন ব্যবস্থা ও ছাত্র কল্যাণ প্রকল্পের পুনরুদ্ধারও স্থানীয় পরিবার ও শিক্ষার্থীদের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নির্বাচনী কারণে স্থগিত থাকা এই প্রকল্পগুলোর অনুপস্থিতি বহু পরিবারের মাসিক বাজেটে প্রভাব ফেলেছিল।
স্থানীয় সুবিধাভোগীদের উচিত নিজেদের আধার-সংযুক্তি ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য হালনাগাদ রাখা, যাতে আগস্ট থেকে অর্থ প্রদান শুরু হলে কোনও প্রযুক্তিগত সমস্যায় তাঁরা বঞ্চিত না হন। প্রয়োজনে স্থানীয় অরুণোদয় সহায়কদের সাহায্য নেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।
সামনে কী দেখার আছে
অরুণোদয়, ভর্তুকিযুক্ত রেশন ও ছাত্র কল্যাণ প্রকল্পের এই পুনরুদ্ধার রাজ্য সরকারের আগস্ট মাসের বৃহত্তর কল্যাণমূলক কর্মসূচির অংশ, যার সুফল ধাপে ধাপে সামনের মাসগুলোতে স্পষ্ট হবে। বন্যা-বিধ্বস্ত জেলাগুলোর জন্য বাড়তি সহায়তা কতটা কার্যকরভাবে বিতরণ হয় এবং নির্বিঘ্নে সুবিধাভোগীদের হাতে পৌঁছায় কিনা, তা এখন নজরে রাখার বিষয়। রাজ্য সরকার যেভাবে একের পর এক কল্যাণমূলক প্রকল্প পুনরায় চালু করছে, তাতে আগামী কয়েক মাস অসমের সাধারণ মানুষ, বিশেষত মহিলা ও শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণিত হতে চলেছে।