হাইলাকান্দি এসবিএন সন্দেহভাজন গ্রেফতারের ঘটনায় নতুন মোড় এলো বুধবার, ২৬ আগস্ট, যখন অসম পুলিশের বিশেষ কার্যবাহিনী (এসটিএফ) পাকিস্তানভিত্তিক শাহজাদ ভাট্টি নেটওয়ার্কের (এসবিএন) আরেকজন সন্দেহভাজন সদস্যকে গ্রেফতার করলো। ২১ বছরের ফজল ইসলাম বড়ভূঁইয়াকে হাইলাকান্দি জেলার রমনাথপুর এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়, যা এই মামলায় মোট গ্রেফতারের সংখ্যা চারে নিয়ে গেল ।
এসটিএফ ও হাইলাকান্দি পুলিশের যৌথ অভিযানে এই গ্রেফতারি সম্পন্ন হয়। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বড়ভূঁইয়া দীর্ঘদিন ধরে গ্রেফতারি এড়িয়ে চলছিল এবং এসটিএফ থানার মামলা নম্বর ০৬/২০২৬-এর সাথে যুক্ত ছিল। অভিযানকালে পুলিশ তার কাছ থেকে আপত্তিকর নথি ও কিছু সামগ্রী উদ্ধার করেছে, যা তদন্তের অংশ হিসেবে পরীক্ষা করা হবে ।
শাহজাদ ভাট্টি নেটওয়ার্ক কী
শাহজাদ ভাট্টি নেটওয়ার্ক হলো পাকিস্তানভিত্তিক একটি সন্ত্রাসী সংগঠন, যা ভারতের বিভিন্ন অংশে গ্রেনেড, আইইডি ও পেট্রোল বোমা হামলা এবং লক্ষ্যবস্তু করে হত্যার সাথে যুক্ত বলে সরকারি বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে । এই নেটওয়ার্ক স্থানীয় যোগাযোগকারীদের অর্থ প্রদান করে পুলিশ, প্রতিরক্ষা ও ধর্মীয় স্থানগুলোর রিকনেসান্স বা গোয়েন্দাগিরি করতে এবং গোয়েন্দাগিরির উদ্দেশ্যে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করতে বলে বলেও অভিযোগ রয়েছে ।
১২ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে ১৪টি রাজ্যে সমন্বিত অভিযানে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো এই নেটওয়ার্কটি ভেঙে ফেলে এবং স্বাধীনতা দিবসের আগে পরিকল্পিত নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ করে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তখন ঘোষণা করেছিলেন যে ২০০-রও বেশি এসবিএন সহযোগীকে গ্রেফতার করা হয়েছে ।
পূর্ববর্তী গ্রেফতারি ও তদন্তের অগ্রগতি
এই চতুর্থ গ্রেফতারির আগে এসটিএফ জুলাই মাসে ধুবড়ি, চিরাং ও বরপেটা জেলা থেকে তিনজন সন্দেহভাজন এসবিএন সদস্যকে গ্রেফতার করেছিল। তারা হলেন—ধুবড়ির বেপারিপাড়ার ২৬ বছরের আকরামুল ইসলাম, চিরাংয়ের পানবাড়ির ধুপিড়ির ২২ বছরের আমিনুর রহমান এবং বরপেটার কালগাছিয়ার দাবান্ডিয়ার ৫৪ বছরের আব্দুল হোসেন ।
এই তিনজনকে গ্রেফতারের পর পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই তদন্তকারীরা হাইলাকান্দির রমনাথপুর এলাকায় নেটওয়ার্কের উপস্থিতি খুঁজে পান। এসটিএফ-এর একজন কর্মকর্তা জানান, “এই গ্রেফতারি আমাদের অব্যাহত তদন্ত ও সন্ত্রাসী ও দেশবিরোধী নেটওয়ার্ক ও তাদের সদস্যদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের অংশ” ।
হাইলাকান্দি ও বরাক উপত্যকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি
হাইলাকান্দি জেলা বরাক উপত্যকার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে অবস্থিত এবং ঐতিহাসিকভাবে নিরাপত্তা সংবেদনশীল এলাকা হিসেবে বিবেচিত। এই জেলায় এমন একটি সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের সদস্যের উপস্থিতি পাওয়া স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করতে পারে, যদিও পুলিশ বারবার জানিয়েছে যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
লালা টাউন ও হাইলাকান্দির অন্যান্য এলাকার বাসিন্দাদের জন্য এই গ্রেফতারি একটি ইতিবাচক সংকেত যে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সক্রিয়ভাবে এই ধরনের নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে কাজ করছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদেরও উচিত সন্দেহজনক কোনো কার্যকলাপ দেখলে তা দ্রুত পুলিশকে জানানো, যাতে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারে।
উদ্ধার হওয়া নথি ও সামগ্রীর গুরুত্ব
পুলিশ জানিয়েছে যে গ্রেফতারির সময় বড়ভূঁইয়ার কাছ থেকে বেশ কিছু নথি ও সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে, যা বর্তমানে পরীক্ষাধীন। এই নথিগুলো থেকে তার নেটওয়ার্কের সাথে যোগসূত্রের প্রকৃতি এবং এই মামলার সাথে যুক্ত অন্য ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে সাহায্য পাবে তদন্তকারীরা ।
এসটিএফ-এর তদন্তকারীরা এখন এই বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন যে গ্রেফতারি ব্যক্তিরা একটি বৃহত্তর নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত ছিল কিনা। এই তদন্তের ফলাফল ভবিষ্যতে আরও গ্রেফতারি বা নেটওয়ার্কের অন্যান্য শাখা চিহ্নিত করার পথ দেখাতে পারে।
আইনি প্রক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
গ্রেফতারি ব্যক্তিকে এসটিএফ থানার মামলা নম্বর ০৬/২০২৬-এর অধীনে আটক রাখা হয়েছে। এই মামলাটি ইউএপিএ (Unlawful Activities Prevention Act) এর অধীনে দায়ের করা হয়েছে, যা সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ ও নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্যতার জন্য প্রাথমিক আইনি ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয় ।
তদন্তকারীরা এখন বড়ভূঁইয়ার জিজ্ঞাসাবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন এবং উদ্ধার হওয়া নথিগুলো বিশ্লেষণ করছেন। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা নেটওয়ার্কের অন্যান্য সদস্য, তাদের অর্থায়নের উৎস এবং ভারতের অন্যান্য অংশে তাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়ার আশা করছেন।
বরাক উপত্যকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার
এই গ্রেফতারির পর হাইলাকান্দি ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। পুলিশি সূত্রে জানা গেছে যে সীমান্ত এলাকা এবং সংবেদনশীল স্থানগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে, যাতে কোনো ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ করা যায়।
হাইলাকান্দি পুলিশ সুপার এবং এসটিএফ-এর যৌথ তদন্তকারী দল নিয়মিত এই অঞ্চলে নিরাপত্তা পর্যালোচনা বৈঠক করছে। স্থানীয় বাসিন্দাদেরও সচেতন করা হচ্ছে যে তারা কোনো সন্দেহজনক কার্যকলাপ দেখলে তা দ্রুত পুলিশকে জানায়, যাতে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারে।
উপসংহার
হাইলাকান্দিতে এই চতুর্থ এসবিএন সন্দেহভাজন গ্রেফতারি প্রমাণ করে যে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সক্রিয়ভাবে পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে কাজ করছে এবং তাদের কার্যকলাপ প্রতিরোধে সক্ষম। যদিও এই গ্রেফতারি স্থানীয়ভাবে কিছুটা উদ্বেগের সৃষ্টি করতে পারে, তবে এটি একই সাথে একটি ইতিবাচক সংকেত যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকরভাবে কাজ করছে।
আগামী দিনগুলোতে তদন্তের অগ্রগতি এবং আরও কোনো গ্রেফতারি হয় কিনা তার দিকে নজর থাকবে নিরাপত্তা মহলের। বরাক উপত্যকার বাসিন্দাদের জন্য বার্তা স্পষ্ট—নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সাথে সহযোগিতা করে এবং সন্দেহজনক কোনো কার্যকলাপ সম্পর্কে দ্রুত পুলিশকে জানিয়ে এই ধরনের সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশ নেওয়া।