শিলং হামলার প্রতিবাদ ক্রমশ জোরালো হয়ে উঠছে অসমজুড়ে। বৃহস্পতিবার রাজ্যের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠন মেঘালয়ে অসমীয় নম্বরপ্লেটযুক্ত গাড়ি ও যাত্রীদের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। বুধবার শিলংয়ে খাসি স্টুডেন্টস ইউনিয়নের (KSU) একটি প্রতিবাদ র্যালি চলাকালীন এই হামলার ঘটনা ঘটে, যার প্রেক্ষিতে উত্তেজনা প্রশমনে সংলাপের আহ্বান জানানো হয়েছে বিভিন্ন মহল থেকে ।
অসম প্রদেশ মহিলা কংগ্রেসের সভানেত্রী মীরা বরঠাকুর রাজ্য সরকারকে প্রশ্ন করেছেন, প্রতিবেশী রাজ্যগুলোতে বারবার অসমীয় চালক ও পর্যটকদের সঙ্গে এই ধরনের ঘটনা কেন ঘটছে। বুধবারের সহিংসতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “নিজেকে বারবার ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী মুখ্যমন্ত্রীদের একজন বলে দাবি করার পরও কেন মেঘালয়, অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড ও মিজোরামের মতো প্রতিবেশী রাজ্যগুলোতে অসমীয় চালক ও পর্যটকরা বারবার আক্রান্ত হচ্ছেন? ক্ষতির দায় কে নেবে? মেঘালয় সরকার কেন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলো?” ।
কংগ্রেসের ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা
মীরা বরঠাকুর উত্তর-পূর্ব গণতান্ত্রিক জোটের (NEDA) আহ্বায়ক হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মাকে হস্তক্ষেপ করে উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোর মধ্যে যাতায়াতকারী মানুষদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “আমরা দাবি জানাচ্ছি যে মুখ্যমন্ত্রী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই বিষয়টির সমাধান করুন এবং ক্ষতিগ্রস্ত গাড়িগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করুন” ।
এই ঘটনার ফলে অসম-মেঘালয় সম্পর্কের ওপর যে প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অল অসম স্টুডেন্টস ইউনিয়নও (AASU)। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সমীরণ ফুকন সমস্যা সমাধানে সংলাপের আহ্বান জানিয়ে বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতি অসম ও মেঘালয়ের সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে। উভয় সরকারের উচিত আলোচনায় বসে একটি সমাধান খুঁজে বের করা। যারা মুখ ঢেকে অসমীয় গাড়ি ও যাত্রীদের ওপর হামলা চালিয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার ও শাস্তি দিতে হবে” ।
AASU-র NESO মঞ্চে সংলাপের উদ্যোগ
সমীরণ ফুকন জানিয়েছেন, AASU এই বিষয়ে KSU এবং নর্থ ইস্ট স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশনের (NESO) সঙ্গেও আলোচনা চালাবে। তিনি বলেন, “মানুষ যেন কোনো ভয় ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবেশী রাজ্যে যাতায়াত করতে পারে। আমরা ভ্রাতৃত্বের কথা বলি, কিন্তু অসমের গাড়ি লক্ষ্য করে হামলা চালানো গ্রহণযোগ্য নয়” ।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অতীতেও যখন মেঘালয়গামী অসমীয় পর্যটকদের গাড়ি আটকে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল, তখন AASU ও KSU যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছিল যে তারা NESO-র ছত্রছায়ায় এই বিষয়ে গুরুত্ব সহকারে আলোচনা করেছে এবং KSU স্পষ্ট করেছিল যে তারা এই ধরনের কোনো উদ্যোগ সমর্থন করে না । বর্তমান ঘটনার ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমন্বয়ের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
অসম জাতীয় পরিষদ ও চালক সমিতির প্রতিক্রিয়া
অসম জাতীয় পরিষদের (AJP) সভাপতি লুরিনজ্যোতি গগৈও অসমের ট্যাক্সিচালক ও যাত্রীদের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “অসমের ট্যাক্সিচালকদের ওপর হামলা এবং অসমীয় মানুষের প্রতি কথিত নৃশংসতার ঘটনায় আমি গভীর দুঃখ প্রকাশ করছি। এই ধরনের হামলা মেনে নেওয়া যায় না। আমি মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমার কাছে আবেদন জানাচ্ছি যেন দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হয় এবং মেঘালয়ে ভ্রমণরত কোনো ট্যাক্সিচালক, পর্যটক বা অসমের মানুষ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হন” ।
এর আগে অসম স্টেট ড্রাইভার্স অ্যাসোসিয়েশনও (ASDA) জবাবদিহিতা দাবি করেছিল, ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির ক্ষতিপূরণ এবং মেঘালয়ে অসমীয় চালকদের নিরাপত্তার লিখিত নিশ্চয়তা চেয়েছিল। সংগঠনটি মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমা ও পর্যটনমন্ত্রী টিমোথি ডি. শিরার কাছ থেকে ক্ষমা প্রার্থনারও দাবি জানিয়েছে। চালকরা অভিযোগ করেছেন, হামলাকারীরা গাড়ির নম্বরপ্লেট পরীক্ষা করেই পাথর ছোঁড়ার লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন করেছিল, যা যাত্রীদের মধ্যে গভীর আতঙ্ক ছড়িয়েছে । সংগঠনটি এমনকি জোড়াবাটের মাধ্যমে অসমে মেঘালয়ের গাড়ি প্রবেশে সম্ভাব্য বিধিনিষেধের হুঁশিয়ারিও দিয়েছে ।
KSU-র দাবি ও পটভূমি
উল্লেখ্য, KSU-র পাঁচ দফা দাবির মধ্যে ইনার লাইন পারমিট (ILP) ব্যবস্থা কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত মেঘালয় রেসিডেন্টস সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাক্ট (MRSSA), ২০১৬-এর বাস্তবায়ন, মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কমেন অ্যাক্ট সংশোধনী কার্যকর করা, এবং সরকারি নিয়োগে সংস্কার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পুলিশের ভাষ্যমতে, সহিংসতায় বিশেষভাবে অ-স্থানীয় ব্যক্তিদের গাড়িকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল এবং মোট ৩১টি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে 1003।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির জন্য প্রাসঙ্গিকতা
বরাক উপত্যকা থেকেও অনেক মানুষ কর্মসূত্রে বা পর্যটনের উদ্দেশ্যে মেঘালয়ে যাতায়াত করেন। হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের বাসিন্দাদের মধ্যেও যারা গাড়ি চালিয়ে বা পর্যটক হিসেবে শিলং ভ্রমণ করেন, তাদের জন্য এই ঘটনা একটি সতর্কবার্তা। রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই প্রতিবাদের ঢেউ বরাক উপত্যকার চালক সংগঠন ও পর্যটন ব্যবসায়ীদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে যারা নিয়মিত আন্তঃরাজ্য পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।
স্থানীয় পরিবহন সংগঠনগুলোর উচিত এই পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা এবং প্রয়োজনে রাজ্য সরকার ও ASDA-র সঙ্গে সমন্বয় রেখে সদস্যদের সতর্ক করা। আন্তঃরাজ্য যাতায়াতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয়ভাবে আলোচনার ফলাফলের দিকেই এখন সবার নজর।
ভবিষ্যতে কী প্রত্যাশিত
মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা এখনও এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না জানালেও, ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের মুখে তার পক্ষ থেকে শীঘ্রই একটি পদক্ষেপ আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। AASU-র নেতৃত্বে NESO মঞ্চে KSU-র সঙ্গে আলোচনা শুরু হলে উত্তেজনা প্রশমনের একটি বাস্তব পথ খুলতে পারে।
আগামী দিনে মেঘালয় সরকার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবহনকারীদের ক্ষতিপূরণ ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় কিনা, এবং দুই রাজ্যের ছাত্র সংগঠনগুলো একটি স্থায়ী সমাধানে পৌঁছাতে পারে কিনা, তার ওপরই নির্ভর করবে অসম-মেঘালয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি। উভয় পক্ষের শান্তিপূর্ণ সংলাপই এখন এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ।