কাছাড়ে ভুয়া ডাক্তার গ্রেফতার অভিযানে ২৬ জুন ২০২৬ রাতে দুটি পৃথক অভিযানে দুইজন অভিযুক্তকে আটক করা হয়েছে। প্রথম জনের নাম বিশ্বজিৎ সিংহ (৫৩), বাসিন্দা বন্তারাপুর, কুচুধারাম থানার অন্তর্গত। তাঁকে সনাই থানার মামলা নং ৬৪/২০২৫-এর সূত্রে গ্রেফতার করা হয়। দ্বিতীয় অভিযুক্ত বিক্রম সিংহ (২৬), পিতা বিদ্যুৎ সিংহ, বাসিন্দা তারাপুর রায়গড়, মণিপুরবাস্তি, শিলচর। তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে শিলচর থানার মামলা নং ৫৮০/২০২৬-এর ভিত্তিতে। কাছাড় পুলিশের এই কোয়াক-বিরোধী অভিযান ২০২৫ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে চলছে এবং বরাক উপত্যকার স্বাস্থ্যসেবা রক্ষায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
কাছাড়ে ভুয়া ডাক্তার গ্রেফতার: দীর্ঘ অভিযানের প্রেক্ষাপট
কাছাড়ে ভুয়া ডাক্তার গ্রেফতারের ধারাটি শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের আগস্ট মাস থেকে l সে বছর আগস্টে শিলচরের পার্ক রোডের শিবসুন্দরী নারী শিক্ষাশ্রমে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ পরিচয়ে রোগী দেখে আসা পুলক মালাকারকে গ্রেফতার করে পুলিশ। কাছাড়ের তৎকালীন SSP নুমল মাহাত্তা নিশ্চিত করেন যে মালাকারের কাছে ওড়িশার শ্রীরামচন্দ্র ভঞ্জ মেডিকেল কলেজের জাল MBBS ডিগ্রি পাওয়া গেছে, যা মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে কেনা হয়েছিল। SSP মাহাত্তা বলেছিলেন, “মনে হচ্ছে বরাক উপত্যকাতেই একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে, যারা মোটা টাকার বিনিময়ে জাল সার্টিফিকেট সরবরাহ করছে।”
সেপ্টেম্বরে অভিযান আরও গতি পায়। কালাইনের একটি ওষুধের দোকান থেকে সুবীর চৌধুরীকে এবং ঘুঙ্গুরের নার্সিংহোম থেকে পঙ্কজ চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হয়। পঙ্কজের কাছে কাজাখস্তানের মেডিকেল কলেজের জাল MBBS ডিগ্রি এবং কলকাতার RG Kar Medical College থেকে MD-র জাল সার্টিফিকেট উদ্ধার হয়। SP নুমল মাহাত্তো বলেন, “অভিযোগ যাচাই করে রেইড করে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।” সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝির মধ্যে আরও বোরখোলার নিহার হুসেন মজরভূঁইয়া ও জিরিঘাটের রাধেশ্যাম রবিদাসকে ধরে কাছাড়ে মোট আট জন ভুয়া ডাক্তার গ্রেফতারের মাইলফলক ছুঁয়ে যায় পুলিশ।
শিলচর মেডিকেল কলেজেও হানা দেয় কোয়াক: চাঞ্চল্যকর ঘটনা
কাছাড়ে ভুয়া ডাক্তার গ্রেফতার অভিযানের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনা ছিল শিলচর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে (SMCH) ভুয়া ডাক্তারের অনুপ্রবেশ। সেপ্টেম্বরের শুরুতে কাটিগড়ার গণিরগ্রামের ২৩ বছর বয়সী মির হুসেন আহমেদ বরভূঁইয়া SMCH-এর স্ত্রীরোগ বিভাগে ২৯ আগস্ট থেকে রোগী দেখছিলেন। অনলাইনে কেনা স্টেথোস্কোপ নিয়ে মাত্র মেট্রিকুলেশন পাশ এই যুবক কয়েক দিন ধরে ধরা পড়েননি। শেষে স্থানীয়দের সন্দেহ থেকে পুলিশে খবর যায় এবং পুলিশ তাঁকে হাতেনাতে আটক করে। SSP নুমল মাহাত্তা বলেছিলেন, “তিনি সম্পূর্ণ ভুয়া ডাক্তার, কোনো মেডিকেল যোগ্যতাই নেই তাঁর।” দক্ষিণ অসমের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতালে এই অনুপ্রবেশ নিরাপত্তাব্যবস্থার গলদ নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছিল।
অক্টোবরে সনাইয়ের নাগদিরগ্রামে ‘বেবি হেলথ কেয়ার’ নামের অবৈধ ক্লিনিক চালানো রাজুল হক লস্করকে (৩৮) গ্রেফতার করে কাছাড়ে ভুয়া ডাক্তার ধরার সংখ্যা ১৫-তে পৌঁছায়। Additional SP (HQ) সুব্রত সেন জানান, কাছাড়ের বিভিন্ন এলাকায় জাল মেডিকেল সার্টিফিকেট সরবরাহের সিন্ডিকেটের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ধোলাইয়ের ভাগা এলাকা থেকে শামিম আহমেদ লস্করকে গ্রেফতার করা হয়; তাঁর কক্ষ থেকে জাল MBBS সার্টিফিকেট বাজেয়াপ্ত হয়। এই গ্রেফতারের সময় কাছাড়ে মোট ২০ জনেরও বেশি ভুয়া ডাক্তার আটক হয়েছে।
বরাক উপত্যকার স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ও হাইলাকান্দির প্রাসঙ্গিকতা
কাছাড়ে ভুয়া ডাক্তার গ্রেফতার অভিযান কেবল একটি জেলার সমস্যা নয়, এটি গোটা বরাক উপত্যকার জনস্বাস্থ্যের সংকটকে সামনে এনেছে। হাইলাকান্দি জেলার লালা টাউনসহ প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকায় সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সংখ্যা ও সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় বহু মানুষ অযোগ্য চিকিৎসকের উপর নির্ভর করেন। কাছাড়ের উদাহরণ প্রমাণ করছে যে এই সুযোগে জালিয়াতরা দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মানুষের জীবন বিপদে ফেলে আসছেন।
Assam Council of Medical Registration (ACMR)-এর অ্যান্টি-কোয়াকারি অফিসার ডা. অভিজিৎ নিওগ একাধিক মামলায় FIR করে পুলিশি অভিযানের ভিত্তি তৈরি করেছেন। তাঁর নথিভুক্ত অভিযোগের পর কাছাড় পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়েছে প্রতিটি ঘটনায়। CM হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ইতিমধ্যে নাগরিকদের সন্দেহজনক চিকিৎসক দেখলে ACMR বা পুলিশে জানাতে আহ্বান জানিয়েছেন। লালা টাউন ও হাইলাকান্দির মানুষের জন্য পরামর্শ হলো, চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগে তাঁর NMC রেজিস্ট্রেশন নম্বর যাচাই করুন এবং কোনো সন্দেহ হলে স্থানীয় থানায় অভিযোগ জানান।
কাছাড়ে ভুয়া ডাক্তার গ্রেফতার অভিযান থামার কোনো লক্ষণ নেই। বরং ২৬ জুনের দুই গ্রেফতার দেখাচ্ছে যে পুলিশ ও ACMR-এর সমন্বয়ে এই অভিযান আরও গতি পাচ্ছে। যেখানে রাজ্যব্যাপী ৬২টি গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে, সেখানে কাছাড় একাই বড় সংখ্যক মামলা নথিভুক্ত করেছে, যা প্রমাণ করে বরাক উপত্যকায় এই সমস্যার গভীরতা কতটা। পরবর্তী ধাপে জাল সার্টিফিকেট সরবরাহকারী চক্রটি ভাঙতে পারলে এই অভিযান সত্যিকার অর্থে ফলপ্রসূ হবে।