Read today's news --> ⚡️Click here 

হাইলাকান্দি ধান ক্রয়কেন্দ্র সিন্ডিকেটের কবলে, MSP থেকে বঞ্চিত জেলার কৃষকরা

হাইলাকান্দি জেলার বোয়ালিপাড়া এলাকায় সরকারি ধান ক্রয়কেন্দ্রকে ঘিরে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। হাইলাকান্দি ধান ক্রয়কেন্দ্র সিন্ডিকেট নিয়ে ক্ষুব্ধ কৃষকরা জানাচ্ছেন, একটি প্রভাবশালী চক্র পুরো ব্যবস্থাটিকে নিজেদের কাজে লাগাচ্ছে, ফলে প্রকৃত কৃষকরা সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বা MSP পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। চলতি মরশুমে প্রতি কুইন্টাল ধানের MSP নির্ধারিত হয়েছে ২,৩৬৯ টাকা, কিন্তু ক্রয়কেন্দ্রে সঠিকভাবে ধান বিক্রি করতে না পেরে অনেক কৃষককে বাধ্য হয়ে কম দামে রাইস মিলে ধান দিতে হচ্ছে।

সরকার যে উদ্দেশ্যে সরাসরি ধান ক্রয়ের ব্যবস্থা চালু করেছিল—মধ্যস্বত্বভোগী ও দালালচক্র দূর করা—সেই ব্যবস্থাই এখন হাইলাকান্দিতে কার্যত সিন্ডিকেটের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ। লালা টাউনসহ জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা কৃষকরা ন্যায্য দাম না পেয়ে চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

কী অভিযোগ করছেন কৃষকরা

কৃষকদের অভিযোগ মূলত দুটি স্তরে। প্রথমত, বোয়ালিপাড়ার প্যাডি প্রোকিউরমেন্ট সেন্টারে একজন কৃষকের কাছ থেকে ১০০ বস্তার বেশি ধান নেওয়া হচ্ছে না। বাস্তবে একজন মাঝারি কৃষকেরও উৎপাদন অনেক বেশি হতে পারে, ফলে বাড়তি ধান বাজারমূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ার অর্থ হলো সরকারি সুবিধা থেকে সরাসরি বঞ্চনা। এই সীমা যদি কৃত্রিমভাবে বজায় রাখা হয়, তাহলে সিন্ডিকেটের সদস্যরা সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, জাল বা প্রতারণামূলক উপায়ে সংগৃহীত কৃষক সনদ ব্যবহার করে একদল অসাধু ব্যবসায়ী ওই সরকারি কেন্দ্রেই বিপুল পরিমাণ ধান বিক্রি করছেন। অর্থাৎ যে সুবিধা প্রকৃত কৃষকের জন্য, তা ভুয়ো নথির জোরে দখল করছেন অন্যরা। এটি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, এটি একটি পরিকল্পিত দুর্নীতির ছবি।

হাইলাকান্দি ধান ক্রয়কেন্দ্র সিন্ডিকেট যদি সত্যিই সক্রিয় থাকে, তাহলে এই চক্রের হাত কেন্দ্র পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত কোনো স্তরে পৌঁছেছে বলে মনে করা যায়, কারণ ভুয়ো সনদ যাচাই না করেই গ্রহণ করা প্রশাসনিক দুর্বলতার ইঙ্গিত।

MSP ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য কী ছিল

ভারতে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বা MSP ব্যবস্থা চালু করার মূল লক্ষ্য ছিল কৃষককে বাজারের অনিশ্চয়তা থেকে সুরক্ষা দেওয়া। ফসল উৎপাদনের পর যদি বাজারদর কমে যায়, তাহলেও কৃষক যাতে সরকার নির্ধারিত একটি নির্দিষ্ট মূল্য পান, সেটাই এই নীতির ভিত্তি। কিন্তু বাস্তবে এই সুবিধা প্রান্তিক কৃষকের কাছে পৌঁছানো অনেক সময়েই কঠিন হয়ে পড়ে। প্রশাসনিক জটিলতা, সনদ সংগ্রহের ঝামেলা, এবং ক্রয়কেন্দ্রের সীমিত সক্ষমতা—এসবই কৃষককে মধ্যস্বত্বভোগীর কাছে ঠেলে দেয়।

অসমে ধান কেনার প্রক্রিয়ায় কৃষক নিবন্ধন, মোবাইল যাচাই ও সরাসরি ব্যাংক ট্রান্সফার ব্যবস্থা চালু থাকলেও মাঠ পর্যায়ে তার সুষম প্রয়োগ সবসময় নিশ্চিত হয় না। হাইলাকান্দির মতো দূরবর্তী জেলায় নজরদারির ঘাটতি থাকলে সেই সুযোগে সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়।

লালা টাউন বরাক ভ্যালির কৃষকদের প্রাসঙ্গিকতা

লালা টাউন এবং হাইলাকান্দি জেলার গ্রামীণ এলাকায় কৃষি একটি বড় জীবিকার উৎস। ধান উৎপাদন এখানে কেবল বাণিজ্যিক বিষয় নয়, পরিবারের সারা বছরের খাদ্য ও আয়ের নিশ্চয়তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। যে কৃষক নিজে ধান উৎপাদন করে সরকারি দামে বিক্রির আশায় থাকেন, তিনি যদি শেষ পর্যন্ত কম দামে রাইস মিলে বিক্রি করতে বাধ্য হন, তাহলে তাঁর পুরো মৌসুমের পরিশ্রম অনেকটাই বৃথা যায়।

হাইলাকান্দি ধান ক্রয়কেন্দ্র সিন্ডিকেট কার্যকর থাকলে বোয়ালিপাড়ার পাশাপাশি জেলার অন্য এলাকার কৃষকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। যদি বরাকের অন্য জেলা—কাছাড় বা করিমগঞ্জেও একই ধাঁচের অনিয়ম চলে, তাহলে উত্তর-পূর্বের কৃষক সুরক্ষা নীতির কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। লালা টাউনের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা, যাঁরা বড় লবির মতো প্রভাব দেখাতে পারেন না, তাঁরাই এই ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি দুর্বল।

তদন্ত সমাধানের দাবি

ক্ষুব্ধ কৃষকরা পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। জাল কৃষক সনদ ব্যবহারকারীদের চিহ্নিত করে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া, ক্রয়কেন্দ্রে প্রতিদিনের লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং প্রকৃত কৃষকের ধান-সীমা পুনর্বিবেচনা করার দাবিও উঠছে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো না হলেও, হাইলাকান্দির ফুড ও সিভিল সাপ্লাইজ বিভাগ এই অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখতে বাধ্য। কারণ যদি সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য অব্যাহত থাকে, তাহলে সরকারের কৃষক-বান্ধব নীতির সুফল জমিজীবী মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিনই থাকবে।

সামনের মরশুমে এই সমস্যা যদি সমাধান না হয়, তাহলে কৃষকদের মধ্যে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার প্রতি আস্থাই কমে যাবে। আর সেটা হবে MSP নীতির সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা—কাগজে সুবিধা আছে, কিন্তু মাঠে কৃষকের হাতে পৌঁছায় না।

হাইলাকান্দি ধান ক্রয়কেন্দ্র সিন্ডিকেটের কবলে, MSP থেকে বঞ্চিত জেলার কৃষকরা
Scroll to top