আসাম জ্বালানি অনুসন্ধান কেন্দ্র আলোচনায় মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ১ জুন ২০২৬ তারিখে নয়াদিল্লিতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন। পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রী হার্দীপ সিং পুরী, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রী পীযূষ গোয়েল এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক মন্ত্রী নিতিন গড়করির সাথে এই বৈঠকগুলো অনুষ্ঠিত হয়। হাইড্রোকার্বন উৎপাদন বৃদ্ধি, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা এবং রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো প্রকল্পের অগ্রগতি — এই তিনটি বিষয় আলোচনার কেন্দ্রে ছিল।
হাইড্রোকার্বন অনুসন্ধান ও জ্বালানি নিরাপত্তা
আসাম জ্বালানি অনুসন্ধান কেন্দ্র আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হার্দীপ সিং পুরীর সাথে বৈঠক। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা সামাজিক মাধ্যম X-এ লিখেছেন, “তাঁর বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ। আমরা রাজ্যের হাইড্রোকার্বন সম্ভাবনা বিস্তার, সর্বত্র অনুসন্ধান কার্যক্রম প্রসার এবং বিদ্যমান তেলক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন বৃদ্ধির উপায় নিয়ে আলোচনা করেছি, যাতে আসাম ভারতের বিকাশের গল্পে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।”
আসাম দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। আসাম ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল উৎপাদনের প্রায় ১৫ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ১৪ শতাংশ সরবরাহ করে থাকে। রাজ্যে বর্তমানে চারটি পরিশোধনাগার (রিফাইনারি) চালু রয়েছে এবং মোট পরিশোধন ক্ষমতা ৭.৪৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন। ২০৩০ সালের মধ্যে অপরিশোধিত তেলের উৎপাদন দ্বিগুণ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন ৩.২ বিসিএম থেকে ৬.৩ বিসিএমে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
চা শিল্প ও FTA-র সুযোগ
বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েলের সাথে বৈঠকে ভারতের সাম্প্রতিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিগুলো আসামের অর্থনীতিতে কীভাবে সুবিধা বয়ে আনতে পারে তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেছেন, “এই চুক্তিগুলো ভারতীয় উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে। আমরা আসামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কৃষকরা কীভাবে এই সুবিধা নিতে পারবেন তা নিয়েও কথা বলেছি।” তিনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে সফল আলোচনা পরিচালনার জন্য অভিনন্দন জানান।
বিশেষভাবে আসামের চা শিল্পের সমস্যা সমাধান নিয়েও দুজন নেতা কথা বলেছেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, “আমরা আমাদের চা শিল্প সংক্রান্ত সমস্যাগুলো সমাধানের বিষয়েও আলোচনা করেছি।” উল্লেখ্য, কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ভারতের চা রপ্তানি ৯৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৮,৭১৯ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ভারত এখন ৩৮টি দেশের সাথে নয়টি FTA-র আওতায় বাণিজ্য করছে।
ব্রহ্মপুত্র টানেল ও পরিকাঠামো প্রকল্প
নিতিন গড়করির সাথে বৈঠকে আসামের বিভিন্ন বড় পরিকাঠামো প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। মুখ্যমন্ত্রী এই বৈঠককে “সবসময় একটি শেখার অভিজ্ঞতা” বলে অভিহিত করেছেন। ফেসবুক পোস্ট এবং মিডিয়া সূত্র অনুযায়ী, বৈঠকে যে প্রকল্পগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে সেগুলো হলো — ব্রহ্মপুত্র নদের নিচে টানেল নির্মাণ, কাজিরাঙা এলিভেটেড করিডোর (দৈর্ঘ্য ৩৫ কিমি, প্রাক্কলিত ব্যয় ৫,৫০০ কোটি টাকা), গোহপুর-নুমালিগড় আন্ডারওয়াটার টানেল (দৈর্ঘ্য ১৫.৬ কিমি) এবং জাতীয় মহাসড়ক সম্প্রসারণ প্রকল্প।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা ব্রহ্মপুত্র নদের নিচে টুইন-টিউব TBM রোড টানেল নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছিল। এই প্রকল্পগুলো আসামের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা রাখবে। মুখ্যমন্ত্রী গড়করিকে আসাম বিধানসভা নির্বাচনের সময় দিকনির্দেশনার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন এবং রাজ্যের পরিকাঠামো নেটওয়ার্ক কেন্দ্রীয় সহায়তায় উল্লেখযোগ্যভাবে উপকৃত হয়েছে বলেও উল্লেখ করেছেন।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির সম্ভাবনা
আসাম জ্বালানি অনুসন্ধান কেন্দ্র আলোচনায় যে সিদ্ধান্তগুলো হয়েছে তার সুফল বরাক উপত্যকায়ও পৌঁছাতে পারে। বিশেষত, উত্তর-পূর্ব গ্যাস গ্রিড (NEGG) প্রকল্পের ১,৬৭০ কিমি পাইপলাইনের মাধ্যমে হাইলাকান্দি ও লালা টাউন অঞ্চলেও পরিষ্কার জ্বালানি গ্যাসের সংযোগ পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সিটি গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন (CGD) নেটওয়ার্কের বিস্তারও বরাক উপত্যকার পরিবারগুলোর জন্য সাশ্রয়ী রান্নার গ্যাসের সংস্থান করতে পারে।
এছাড়া FTA-র সুবিধায় হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের চা বাগান মালিক এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারেন। অনেক বছর ধরেই বরাক উপত্যকার চা রপ্তানিকারকরা মূল্যস্তরের সমস্যায় ভুগছেন — FTA-র ছাড়ে ইউরোপীয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে আসামের চা প্রতিযোগিতামূলকভাবে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
১ জুনের এই তিনটি বৈঠক আসামের উন্নয়নে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের একটি ইতিবাচক দিক তুলে ধরেছে। জ্বালানি, বাণিজ্য ও পরিকাঠামো — এই তিনটি ক্ষেত্রে একসাথে কেন্দ্রের সাথে সমন্বয় করা গেলে আসাম সত্যিকার অর্থেই ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিকাশের ইঞ্জিন হয়ে উঠতে পারে। আগামী দিনগুলোতে এই আলোচনাগুলো থেকে সুনির্দিষ্ট প্রকল্প বরাদ্দ ও নীতিগত সিদ্ধান্ত কতটা দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।