অসমে মাদকবিরোধী অভিযান আরও কঠোরভাবে চালানোর বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। ২৬ জুন ২০২৬-এ প্রকাশিত বক্তব্যে তিনি জানান, রাজ্যের তরুণ প্রজন্মকে নেশার কবল থেকে দূরে রাখতে সরকার পুলিশ, প্রশাসন এবং নানা সামাজিক সংগঠনকে একসঙ্গে কাজ করতে বলছে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের মূল সুর ছিল একটাই—যুবসমাজকে বাঁচাতে মাদকবিরোধী অভিযানকে কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না, এটিকে সামাজিক সুরক্ষার লড়াই হিসেবেও এগিয়ে নিতে হবে।
এই মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে সরকারের অবস্থান নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক বক্তব্যে তা আবারও স্পষ্ট হয়েছে। রাজ্যে গাঁজা, হেরোইন ও অন্যান্য নিষিদ্ধ মাদকের চোরাচালান ঠেকাতে প্রশাসন কঠোর নজরদারি বজায় রাখছে বলে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যে ইঙ্গিত মেলে। একই সঙ্গে তিনি যুবসমাজকে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজের যৌথ দায়িত্বের অংশ হিসেবে দেখার কথা বলেন। এই বার্তা এসেছে এমন এক সময়ে, যখন উত্তর-পূর্বের বিভিন্ন রাজ্যে মাদকপথ ও সীমান্ত-সংলগ্ন নেটওয়ার্ক নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
যুবসমাজকে ঘিরে সরকারের উদ্বেগ
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট, মাদকবিরোধী অভিযান-এর কেন্দ্রে রয়েছে তরুণদের ভবিষ্যৎ। নেশা কেবল একজন মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, পরিবারের অর্থনৈতিক স্থিতি, পড়াশোনা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সম্পর্ক—সবকিছুকেই দুর্বল করে দেয়। সেই কারণেই সরকার চাইছে, স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে কর্মজীবনের শুরুতে থাকা যুবক-যুবতীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো হোক।
অসমে নদীপথ, সড়কপথ ও সীমান্তঘেঁষা যোগাযোগব্যবস্থার কারণে মাদকের অনুপ্রবেশ ও পরিবহণ একটি দীর্ঘদিনের উদ্বেগ। সরকারি স্তরে অভিযান চালিয়ে আটক ও উদ্ধার বাড়লেও সমস্যার শিকড় সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে জড়িত। মাদকবিরোধী অভিযান তাই শুধু ধরপাকড় নয়; পুনর্বাসন, কাউন্সেলিং, পরিবারকে সঙ্গে নেওয়া এবং বিকল্প জীবিকার দিকেও নজর দিতে হবে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য সেই বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গিকেই সামনে এনেছে।
প্রশাসনিক কঠোরতা ও সামাজিক অংশগ্রহণ
সরকারি ভাষ্যে মাদকবিরোধী অভিযান-এর সাফল্য নির্ভর করছে মাঠপর্যায়ের সতর্কতার ওপর। পুলিশ যদি নিয়মিত তল্লাশি, তথ্য-সংগ্রহ এবং আন্তঃজেলা সমন্বয় জোরদার করে, তবে মাদকচক্রের গতি অনেকটাই কমানো যায়। কিন্তু কেবল পুলিশি অভিযান যথেষ্ট নয়। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে ইঙ্গিত রয়েছে, পঞ্চায়েত, স্ব-সহায়ক গোষ্ঠী, যুব সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষক সমাজকে এই লড়াইয়ের অংশ হতে হবে।
এই ধরনের উদ্যোগে সচেতনতা শিবির, নেশা-বিরোধী প্রচার, কাউন্সেলিং সেন্টার এবং পুনর্বাসন কর্মসূচি অত্যন্ত জরুরি। মাদকবিরোধী অভিযান সফল হতে হলে পরিবারকেও সতর্ক হতে হবে। অনেক সময় নেশাগ্রস্ত তরুণের প্রথম সমস্যা ধরা পড়ে না, কারণ পরিবার লজ্জা বা অস্বীকারের মধ্যে থাকে। তাই আগাম সনাক্তকরণ এবং সহায়তার ব্যবস্থা না থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার চেষ্টা একা যথেষ্ট ফল দেয় না।
অসম ও বরাক উপত্যকার বাস্তবতা
বরাক উপত্যকা, বিশেষ করে হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের মতো এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান-এর কথা আলাদা গুরুত্ব পায়। কারণ ছোট শহর ও গ্রামীণ এলাকার যুবসমাজ অনেক সময় বড় মাদক নেটওয়ার্কের পণ্য পরিবহণ বা বিক্রির প্রাথমিক স্তরে জড়িয়ে পড়ে। চাকরি, পড়াশোনা, বা দ্রুত আয়ের প্রলোভনে তারা বিপদে পড়তে পারে। তাই এই এলাকার জন্য সচেতনতা শুধু পোস্টার বা সভায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজ, বাজার ও খেলাধুলার মাঠকে কেন্দ্র করে নিয়মিত প্রচার দরকার।
লালা টাউনের মতো জনবহুল এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান কেবল পুলিশি নজরদারির বিষয় নয়, এটি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রশ্নও বটে। স্থানীয় বাসিন্দারা যদি অস্বাভাবিক চলাচল, সন্দেহজনক লেনদেন বা নেশাসংক্রান্ত আচরণ দ্রুত প্রশাসনকে জানান, তাহলে নেটওয়ার্ক ছোট থাকতেই ভেঙে দেওয়া সম্ভব। হাইলাকান্দি জেলার জন্য এ ধরনের নাগরিক সতর্কতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রত্যন্ত এলাকার সমস্যা অনেক সময় শুরুতে ধরা না পড়লে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
কী বার্তা দিচ্ছে এই অবস্থান
মুখ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক অবস্থান থেকে বোঝা যায়, মাদকবিরোধী অভিযান এখন অসম সরকারের জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক স্থিতিশীলতার বড় এজেন্ডা। তিনি যে ভাষায় যুবসমাজকে রক্ষার কথা বলেছেন, তাতে প্রশাসনের কাছে একধরনের নৈতিক তাগিদও আছে—শুধু অপরাধী ধরা নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ভেঙে পড়া থেকে বাঁচানো। রাজ্যের নীতি-নির্ধারকরা যদি স্কুলভিত্তিক সচেতনতা, কিশোর-কেন্দ্রিক কাউন্সেলিং, খেলাধুলা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণকে নেশা-নিরোধের কৌশলের সঙ্গে যুক্ত করেন, তাহলে এই অভিযান দীর্ঘমেয়াদে ফল দিতে পারে।
একই সঙ্গে, মাদকবিরোধী অভিযান-এর সাফল্য মাপতে হবে শুধু জব্দ বা গ্রেপ্তারের সংখ্যা দিয়ে নয়। কজন তরুণ নেশা থেকে বেরিয়ে এলেন, কজন পরিবার সহায়তা পেল, কজন নতুন করে পড়াশোনায় বা কাজে ফিরল—এসবও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আগামী দিনে রাজ্য সরকার যদি এই মানবিক ও প্রতিরোধমূলক দিকগুলোকে শক্তিশালী করে, তাহলে অসমে মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই আরও কার্যকর হতে পারে। হাইলাকান্দি, লালা এবং সমগ্র বরাক উপত্যকার জন্য সেটাই হবে সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর।