আসাম সরকারি স্কুল প্রতিভা বিকাশে আরও সক্রিয় ভূমিকা নেবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। ২ জুন ২০২৬-এ করা তাঁর মন্তব্যে স্পষ্ট করা হয়, রাজ্যের সরকারি বিদ্যালয়গুলো এখন শুধু পরীক্ষার নম্বর কিংবা পাঠ্যপুস্তকের সীমায় আটকে থাকবে না; বরং ছাত্রছাত্রীদের সৃজনশীলতা, খেলাধুলা, শিল্প, বিতর্ক ও নেতৃত্বগুণও বিকাশের সুযোগ দেবে। শিক্ষা ব্যবস্থাকে বহুমাত্রিক করে তোলাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য, যা রাজ্যের গ্রামীণ ও শহরাঞ্চল দুই জায়গাতেই সমানভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির মতো জেলায় যেখানে প্রতিভাবান শিশুদের বড় অংশই যথাযথ পরিসর পায় না, এই বার্তা নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে।
কেন উঠে এল প্রতিভা বিকাশের প্রশ্ন
আসাম সরকারি স্কুল প্রতিভা বিকাশের বিষয়টি সামনে এসেছে এমন এক সময়ে, যখন দেশের নানা প্রান্তে স্কুলশিক্ষাকে কেবল পরীক্ষাকেন্দ্রিক রাখার সমালোচনা বাড়ছে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের সারকথা হলো—শিশুদের শুধু পাস করানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, তাদের ভেতরের প্রতিভা খুঁজে বের করা এবং তাকে পরিণত করা। রাজ্যের সরকারি স্কুলগুলোতে যদি সংগীত, চিত্রকলা, নাটক, খেলাধুলা, বিজ্ঞান প্রদর্শনী বা বিতর্কের মতো ক্ষেত্রকে গুরুত্ব দেওয়া যায়, তবে অনেক শিশুই পড়াশোনার বাইরেও নিজেদের পরিচয় গড়ে তুলতে পারবে। এতে আত্মবিশ্বাস বাড়বে, স্কুলে উপস্থিতি বাড়বে, এবং দীর্ঘমেয়াদে ঝরে পড়ার হার কমতেও পারে।
শিক্ষাবিদদের মতে, এই ধরনের উদ্যোগ কেবল সৃজনশীলতা বাড়ায় না, সমাজে নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্রও তৈরি করে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক শিশুর বাড়িতে বাড়তি কোচিং, প্রশিক্ষণ বা আলাদা মেন্টরশিপ পাওয়ার সুযোগ থাকে না। সরকারি স্কুল যদি সেই ভূমিকা নিতে পারে, তবে শিক্ষার বৈষম্য কিছুটা হলেও কমবে। হিমন্ত বিশ্ব শর্মার বক্তব্য সেই দিকেই ইঙ্গিত করেছে। তবে নীতি ঘোষণার পাশাপাশি বাস্তব রূপ দেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
পাঠ্যবহির্ভূত শিক্ষা ও স্কুল সংস্কার আসাম
আসাম সরকারি স্কুল প্রতিভা বিকাশের সঙ্গে জড়িত আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো পাঠ্যবহির্ভূত শিক্ষার পরিসর। শুধু ক্লাসরুমভিত্তিক শিক্ষা দিয়ে নতুন প্রজন্মকে সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত করা যায় না। স্কুলে যদি নিয়মিত ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিজ্ঞান মেলা, গ্রুপ ডিসকাশন, পরিবেশ সচেতনতা কর্মসূচি এবং লাইব্রেরি-ভিত্তিক পাঠচর্চা বাড়ানো যায়, তবে ছাত্রছাত্রীরা বাস্তব জীবনের জন্যও তৈরি হবে। মুখ্যমন্ত্রীর এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, রাজ্য সরকার শিক্ষা খাতকে আরও কার্যকর ও মানবিক করতে চায়।
স্কুল সংস্কার আসামে ইতিমধ্যেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে। অনেক সরকারি স্কুলে শিক্ষকসংকট, অবকাঠামোর অভাব, খেলার মাঠের ঘাটতি এবং উপকরণের সীমাবদ্ধতা এখনও বড় সমস্যা। ফলে প্রতিভা বিকাশের পরিকল্পনা সফল করতে হলে আগে সেই ঘাটতিগুলো পূরণ করতে হবে। একটি শিশুর মধ্যে ফুটবলারের সম্ভাবনা থাকলেও যদি মাঠ না থাকে, বা সংগীতশিল্পীর সম্ভাবনা থাকলেও যদি প্রশিক্ষক না মেলে, তবে উদ্যোগটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তাই স্কুল সংস্কারের সঙ্গে প্রতিভা-ভিত্তিক শিক্ষার সমন্বয়ই ভবিষ্যৎ পথনির্দেশ করতে পারে।
বরাক উপত্যকা ও লালা টাউনের সম্ভাবনা
এই নীতির প্রভাব বরাক উপত্যকায়ও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। হাইলাকান্দি, করিমগঞ্জ, শিলচর এবং লালা টাউনের বহু সরকারি স্কুলে এমন অনেক শিক্ষার্থী আছে, যারা পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, আবৃত্তি, গান, নাচ বা চিত্রকলায় দক্ষ। কিন্তু সুযোগের অভাবে তাদের অনেক প্রতিভা স্কুলপর্বেই হারিয়ে যায়। আসাম সরকারি স্কুল প্রতিভা বিকাশের পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এই অঞ্চলগুলোর ছাত্রছাত্রীরা রাজ্যস্তরের মঞ্চে উঠে আসতে পারে। এতে শুধু স্কুলই নয়, স্থানীয় সমাজও উপকৃত হবে।
লালা বাজার এলাকার একাধিক শিক্ষক মনে করেন, ছোট শহর ও গ্রামাঞ্চলের শিশুদের জন্য স্কুলই সবচেয়ে বড় সুযোগের দরজা। পরিবারে সবাই যদি কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা বা দৈনন্দিন শ্রমে ব্যস্ত থাকে, তাহলে শিশুর প্রতিভা বিকাশে বাড়তি সহায়তা পাওয়া কঠিন। সে ক্ষেত্রে সরকারি স্কুলই শিশুর প্রতিভা শনাক্তের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। বিশেষত বরাক অঞ্চলে বাংলা, অসমীয়া, হিন্দি ও মণিপুরি ভাষাভাষী শিক্ষার্থীদের বৈচিত্র্যকে কাজে লাগিয়ে স্কুলগুলো যদি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়ায়, তাহলে শিক্ষা আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে। এই কারণে লালার মানুষজনও বিষয়টিকে কেবল গুয়াহাটি-কেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন না; বরং নিজেদের ভবিষ্যতের সঙ্গেও যুক্ত করছেন।
কার্যকর করতে কী প্রয়োজন
আসাম সরকারি স্কুল প্রতিভা বিকাশকে সফল করতে হলে কয়েকটি বিষয়ে জোর দিতে হবে। প্রথমত, প্রতিটি স্কুলে শিশুদের প্রতিভা চিহ্নিত করার জন্য নিয়মিত মূল্যায়ন দরকার। দ্বিতীয়ত, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কাজে প্রশিক্ষিত শিক্ষক বা প্রশিক্ষকের ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, স্কুলগুলোর লাইব্রেরি, কম্পিউটার ল্যাব, খেলার সরঞ্জাম ও মঞ্চসজ্জার মতো অবকাঠামো উন্নত করতে হবে। চতুর্থত, জেলা পর্যায়ে প্রতিযোগিতা ও বাছাইয়ের সুযোগ বাড়াতে হবে, যাতে প্রত্যন্ত এলাকার প্রতিভাও সামনে আসে।
অনেক সময় সরকারি উদ্যোগ কেবল ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকে, আর মাঠপর্যায়ে তার প্রভাব কম দেখা যায়। তাই রাজ্য সরকার যদি এই প্রকল্পকে স্থায়ী কাঠামো দিতে চায়, তবে বাজেট, মনিটরিং এবং ফলাফল পর্যালোচনা—তিনটিই সমান গুরুত্ব পাবে। শিক্ষাবিদদের মতে, অভিভাবক, শিক্ষক, স্কুল পরিচালনা কমিটি এবং স্থানীয় প্রশাসনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শুধু মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য নয়, বাস্তবে একটি পরিবেশ তৈরি করাই আসল কাজ।
সব মিলিয়ে, আসাম সরকারি স্কুল প্রতিভা বিকাশ এখন একটি নীতিগত ইঙ্গিতের পর্যায়ে থাকলেও এর তাৎপর্য বড়। এটি সফল হলে আসামের স্কুলগুলো কেবল পরীক্ষাপাসের কারখানা না থেকে শিশুদের সম্ভাবনা বিকাশের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। আর সেই পরিবর্তনের প্রভাব গুয়াহাটি থেকে হাইলাকান্দি, লালা টাউন থেকে সমগ্র বরাক উপত্যকা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে।