অযোধ্যার রাম মন্দিরে ভক্তদের অনুদান আত্মসাতের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে তীব্র ঝড় উঠেছে। রাম মন্দির অনুদান কেলেঙ্কারিতে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT)-এর প্রাথমিক রিপোর্টের ভিত্তিতে পুলিশ আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং তাদের কাছ থেকে প্রায় ৭৯ লক্ষ ৮৫ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। ২৮ জুন ২০২৬ তারিখে এই মামলা নতুন মাত্রায় পৌঁছে যখন বিরোধী দলগুলি BJP ও শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র ট্রাস্টের বিরুদ্ধে তাদের আক্রমণ আরও জোরদার করে। ভক্তদের বিশ্বাসের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ এনে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতিতে বিতর্ক ক্রমশ গভীর হচ্ছে।
SIT তদন্ত ও রাম মন্দির অনুদান কেলেঙ্কারির বিস্তারিত
জুন ২০২৬-এর শুরুতে সমাজবাদী পার্টির সভাপতি অখিলেশ যাদব প্রথম প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন যে রাম মন্দিরের দানবাক্স থেকে কোটি কোটি টাকার অনুদান গায়েব হয়েছে। ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাই প্রাথমিকভাবে এই দাবি অস্বীকার করলেও জনমানসে ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে উত্তরপ্রদেশ সরকার ১৩ জুন একটি তিন সদস্যের SIT গঠন করে। এই দলটিতে লখনৌ বিভাগীয় কমিশনার বিজয় বিশ্বাস পন্থ, IG কিরণ এস এবং বিশেষ সচিব (অর্থ) নীল রতন ছিলেন।
SIT-কে সাত দিনের মধ্যে প্রাথমিক রিপোর্ট এবং ১৫ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তদন্তকারীরা অযোধ্যায় পাঁচ দিন অবস্থান করে দানবাক্স খোলার পদ্ধতি, নগদ গণনা, সংরক্ষণ ও ব্যাংকে জমার পুরো প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখেন। প্রাথমিক রিপোর্টে অনুদান ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক গাফিলতি এবং পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবের কথা উল্লেখ করা হয়।
২৫ জুন ট্রাস্টের সদস্য কৃষ্ণমোহনের অভিযোগের ভিত্তিতে রাম জন্মভূমি থানায় FIR দায়ের করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়া আটজন হলেন রামশঙ্কর যাদব ওরফে টিন্নু ইয়াদব, অনুকল্প মিশ্র, অবিনাশ শুক্লা, করুণেশ পান্ডে, মনীশ কুমার যাদব, লবকুশ মিশ্র, রামাশঙ্কর মিশ্র এবং সুভাষ শ্রীবাস্তব। এদের মধ্যে চম্পত রাইয়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী টিন্নু যাদবের গ্রেপ্তার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
বিরোধীদের আক্রমণ ও BJP-র পাল্টা জবাব
রাম মন্দির অনুদান কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসার পর বিরোধী দলগুলি BJP এবং ট্রাস্টের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বাদ্রা এই ঘটনাকে “দুঃখজনক ও লজ্জাজনক” বলে অভিহিত করে উত্তরপ্রদেশ সরকারের কাছে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানান। তিনি বলেন, “দায় কার? যদি আপনারাই সংগ্রহ করেছেন, তাহলে নিরাপদে রাখার দায়িত্বও আপনাদের।”
কংগ্রেস নেতা পবন খেড়া বলেন, “এটি কেবল আর্থিক কেলেঙ্কারি নয়, এটি বিশ্বাসের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা।” সিনিয়র কংগ্রেস নেতা দিগ্বিজয় সিং জানান, দলটি এই বিষয়টি প্রতিটি গ্রামে তুলে ধরবে এবং ওয়ার্ড থেকে জেলা স্তর পর্যন্ত কমিটি গঠন করা হবে। কংগ্রেস নেতা গৌরব গোগোই FIR নথিভুক্ত করতে দেরির বিষয়ে প্রশ্ন তুলে অভিযোগ করেন যে মূল অভিযুক্তকে রক্ষা করা হয়েছিল।
শিবসেনা (UBT) প্রধান উদ্ধব ঠাকরে BJP-র হিন্দুত্বের রাজনীতিকে আক্রমণ করে বলেন, ধর্মীয় ভাবাবেগকে ব্যবহার করে হিন্দুদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। অন্যদিকে উত্তরপ্রদেশের উপ-মুখ্যমন্ত্রী কেশব প্রসাদ মৌর্য কংগ্রেস ও সমাজবাদী পার্টিকে মিথ্যা প্রচারের অভিযোগে পাল্টা আক্রমণ করেন। তিনি বলেন, “SIT তদন্তের পর FIR দায়ের করা হয়েছে এবং গ্রেপ্তারও হয়েছে। দোষীরা ছাড় পাবে না।”
SIT তদন্তে উন্মোচিত গাফিলতি ও ব্যাপ্তি
SIT-এর তদন্তে উন্মোচিত হয়েছে যে, রাম মন্দিরের দানবাক্স পরিচালনায় নিয়মতান্ত্রিক পর্যবেক্ষণের গুরুতর ঘাটতি ছিল। নগদ গণনা ও মূল্যবান দ্রব্য সংরক্ষণের প্রতিটি পর্যায়ে তদারকির অভাব ছিল। তদন্তের আওতা শুধু দানের অর্থ আত্মসাতেই সীমাবদ্ধ না থেকে জমি লেনদেন, নির্মাণ সামগ্রীর ক্রয় এবং মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো দৈনিক রিপোর্টের বিষয়গুলিও পরীক্ষা করা হচ্ছে।
আদালতে পেশ করা তথ্য অনুযায়ী, সুভাষ শ্রীবাস্তব ছাড়া বাকি সাতজনের কাছ থেকে মোট ৭৯ লক্ষ ৮৫ হাজার ৪৯৩ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়াও কিছু বিদেশি মুদ্রাও জব্দ করা হয়েছে। আদালত সকল আটজনকে ২৯ জুন পর্যন্ত জুডিশিয়াল হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছে। পরিস্থিতি গুরুতর হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাই পদত্যাগও করেছেন বলে জানা গেছে।
অসম ও বরাক ভ্যালির পরিপ্রেক্ষিতে
অযোধ্যার এই ঘটনা অসম এবং বরাক ভ্যালির ধর্মপ্রাণ মানুষদের কাছে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের বহু বাসিন্দা রাম মন্দির নির্মাণে অনুদান দিয়েছেন। তাদের দেওয়া অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে কিনা তা নিয়ে স্থানীয় ভক্তদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় একজন সমাজসেবী জানান, “আমরা সম্মিলিতভাবে অনেক অর্থ মন্দিরের জন্য পাঠিয়েছিলাম। এই ঘটনা শুনে মনে কষ্ট লাগছে। কিন্তু আইন নিজের কাজ করছে, এটাও আশার কথা।” বরাক ভ্যালির বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন ঘটনার পরিপূর্ণ তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।
রাম মন্দির অনুদান কেলেঙ্কারি কেবল একটি আর্থিক দুর্নীতির মামলা নয়—এটি লক্ষ লক্ষ ধর্মপ্রাণ মানুষের বিশ্বাস ও আবেগের সঙ্গে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। SIT-এর চূড়ান্ত রিপোর্ট এবং আদালতের পরবর্তী শুনানিতে এই মামলার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা স্পষ্ট হবে। দোষীদের বিচার হবে কি না এবং মন্দিরের অনুদান ব্যবস্থাপনায় কী ধরনের সংস্কার আনা হবে—সেটাই এখন সারা দেশের সঙ্গে বরাক ভ্যালির মানুষেরাও গভীর আগ্রহে অনুসরণ করছেন।