KSU র্যালিতে ৩ নেতা গ্রেপ্তার হয়েছেন বুধবার গভীর রাতে, খাসি স্টুডেন্টস ইউনিয়নের (KSU) একটি ব্ল্যাক-ফ্ল্যাগ বাইক র্যালি চলাকালীন সহিংসতার ঘটনায়। মেঘালয় পুলিশ জাইয়াও চ্যাপেল রোডে অবস্থিত সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে সভাপতি রেমন্ড খারজানা, সহ-সভাপতি পিংকমেনল্যাং সানমিয়েত এবং সাধারণ সম্পাদক রুবেন নাজিয়ারকে গ্রেপ্তার করে। বুধবার, ১৯ আগস্ট শিলংজুড়ে অনুষ্ঠিত এই র্যালিতে অন্তত ৩১টি গাড়ি ভাঙচুর হয় এবং একটি সরকারি যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় ।
পূর্ব খাসি হিলস জেলার পুলিশ সুপার বিবেক সিয়েম জানান, “নাগরিকদের ওপর হামলা, ৩১টি গাড়ি ভাঙচুর—যার মধ্যে একটি গাড়িতে আগুন লাগানো হয়েছে—এবং সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করার পাশাপাশি জনমনে ভীতি সৃষ্টি করার অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।” গ্রেপ্তারকৃত নেতাদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা, ২০২৩-এর সরকারি সম্পত্তি নষ্ট, নাগরিকদের ওপর হামলা এবং আইন লঙ্ঘন সংক্রান্ত একাধিক ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে ।
পাঁচ দফা দাবি ও ১৫ দিনের চূড়ান্ত সময়সীমা
এই সহিংসতার মূলে রয়েছে KSU-র পাঁচ দফা দাবি, যা নিয়ে সংগঠনটি গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আন্দোলন চালিয়ে আসছিল। ৩ আগস্ট মেঘালয় সরকারকে ১৫ দিনের একটি চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, যা ১৮ আগস্ট পার হয়ে যাওয়ার পরই সংগঠনটি রাজ্যজুড়ে আন্দোলন তীব্র করার ঘোষণা দেয় ।
দাবিগুলোর মধ্যে প্রথমটি হলো, পূর্ব জৈন্তিয়া হিলস জেলার লুম সিরমানে শ্রী সিমেন্টস লিমিটেডের ১,৮০০ কোটি টাকার একটি সমন্বিত সিমেন্ট কারখানা ও চুনাপাথর খনির প্রকল্পের জন্য ৩১ জুলাই অনুষ্ঠিত পরিবেশগত জনশুনানি বাতিল করা, যা KSU-র দাবি অনুযায়ী বিরোধিতা দমন করতেই আয়োজন করা হয়েছিল। এছাড়া, এই জনশুনানিতে জমির মালিক ও কৃষকদের অংশগ্রহণে বাধা দেওয়ার অভিযোগে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ প্রধান এবং মেঘালয় রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের কর্মকর্তাদের অপসারণও দাবি করা হয়েছে ।
মেঘালয় বাসিন্দা সুরক্ষা আইন বাস্তবায়নের দাবি
দ্বিতীয় ও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো, ইনার লাইন পারমিট (ILP) ব্যবস্থা চালু না হওয়া পর্যন্ত মেঘালয় রেসিডেন্টস সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাক্ট (MRSSA), ২০১৬-এর সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন। KSU-র অভিযোগ, প্রায় এক দশক পুরনো এই আইনটি সরকার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে। সংগঠনটি খাসি ও জৈন্তিয়া হিলসের চিহ্নিত ১৮টি স্থানে সুবিধা কেন্দ্র স্থাপন, প্রতিটি জেলায় কার্যকর জেলা টাস্কফোর্স এবং অনলাইন নিবন্ধনের পরিবর্তে দরবার শ্নংয়ের মাধ্যমে যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছে ।
তৃতীয় দাবি হলো, স্থানীয় কর্মসংস্থান রক্ষা ও অভিবাসী শ্রমিকদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কমেন অ্যাক্ট, ২০২০-এর সংশোধনী বাস্তবায়ন। চতুর্থ দাবিতে NEIGRIHMS-এর নিয়োগ প্রক্রিয়ার তাৎক্ষণিক পর্যালোচনা চাওয়া হয়েছে, যেখানে নার্সিং নিয়োগে ৮০:২০ নারী-পুরুষ অনুপাত এবং খাসি-জৈন্তিয়া ও গারো প্রার্থীদের জন্য সংরক্ষণ পর্যালোচনার দাবি রয়েছে। পঞ্চম দাবি হলো, গ্রেড বি, সি ও ডি পদে ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার বাতিলসহ স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা প্রবর্তন ।
সহিংসতার বিস্তার ও ক্ষয়ক্ষতি
বিকেল ৪টায় জাইয়াও থেকে শুরু হওয়া এই র্যালিটি লুমডিয়েংজরি, মালকি, ধনখেতি, উম্পলিং, গল্ফ লিংক ও মাওলাই মাওরো ঘুরে আবার জাইয়াওতে ফিরে আসার কথা ছিল। তবে পোলো, বারিক ও মাওলাই এলাকায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে মুখোশধারী ব্যক্তিরা সাধারণ ও সরকারি গাড়িতে হামলা চালায়। ক্ষতিগ্রস্ত যানবাহনের মধ্যে মেঘালয় হাইকোর্ট, ন্যাশনাল ইনফরমেটিক্স সেন্টার (NIC) এবং টেলিকম বিভাগের গাড়িও ছিল ।
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও স্বামী বিবেকানন্দের মূর্তিও এই সহিংসতায় ভাঙচুরের শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রাস্তায় সাধারণ পথচারীদের ওপরও হামলা চালানো হয়, এমনকি শিশুদের বহনকারী একটি বাসও এই ঘটনার শিকার হয় । পুলিশ এই সহিংসতাকে “রাষ্ট্রের আইনের সম্পূর্ণ লঙ্ঘন” বলে অভিহিত করেছে, কারণ শান্তিপূর্ণ থাকার মুচলেকা দিয়েই র্যালির অনুমতি নেওয়া হয়েছিল।
সরকারের প্রতিক্রিয়া ও আলোচনার আহ্বান
সহিংসতার দিনই মেঘালয়ের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী ওয়াইল্যাড শায়লা জানান, সরকার KSU-র পাঁচ দফা দাবি নিয়ে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, সরকার এই বিষয়গুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে এবং সংগঠনের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজার চেষ্টা করবে ।
তবে সহিংসতার ঘটনার পর সরকার ও KSU-র মধ্যে সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। গ্রেপ্তারের আগে সংগঠনের নেতারা সংবাদমাধ্যমের সামনে সহিংসতার জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেও তাদের আন্দোলনের যৌক্তিকতা তুলে ধরেছিলেন।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির জন্য প্রাসঙ্গিকতা
মেঘালয়ে ইনার লাইন পারমিট বা অনুরূপ প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর হলে তা বরাক উপত্যকা থেকে শিলংগামী যাত্রী, ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের জন্যও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে। হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের বাসিন্দারা প্রায়ই চিকিৎসা, শিক্ষা বা ব্যবসায়িক কাজে শিলং যাতায়াত করেন। ভবিষ্যতে এই ধরনের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর হলে ভ্রমণের নিয়মকানুনে পরিবর্তন আসতে পারে।
এছাড়া, এই সহিংসতার ঘটনা প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর মধ্যে আন্তঃরাজ্য যোগাযোগ ও নিরাপত্তার প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে আসে। বরাক উপত্যকার পরিবহন সংস্থা ও নিয়মিত যাত্রীদের উচিত মেঘালয়ে যেকোনো আন্দোলন বা কর্মসূচির খবর সম্পর্কে আগে থেকে সচেতন থাকা।
ভবিষ্যতে কী হতে পারে
তিন শীর্ষ নেতার গ্রেপ্তারের পর KSU-র ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা এখন অনিশ্চিত। সংগঠনটি তাদের দাবি আদায়ে অনড় থাকবে নাকি সরকারের সঙ্গে আলোচনার পথে হাঁটবে, তা আগামী দিনগুলোতে স্পষ্ট হবে। পুলিশ সহিংসতায় জড়িত অন্যান্য ব্যক্তিদেরও শনাক্ত করার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে।
সরকার ও KSU-র মধ্যে যদি শীঘ্রই একটি অর্থবহ সংলাপ শুরু না হয়, তাহলে রাজ্যে আরও অস্থিরতার আশঙ্কা রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির মালিকদের ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের সহিংসতা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণই এখন মেঘালয় প্রশাসনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।