এলপিজি সিলিন্ডারবাহী ট্রাক দুর্ঘটনা এড়ানো গেল একেবারে শেষ মুহূর্তে। মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই দুপুরে কাছাড় জেলার বোরখোলা থানার ডুরবিনটিলা এলাকায় শিলচর-হাফলং হাইওয়েতে হাফলং থেকে শিলচরের দিকে আসা একটি ট্রাকের চাকা খুলে গেলে গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারায় । ট্রাকটিতে এলপিজি সিলিন্ডার বোঝাই ছিল, ফলে ঘটনাস্থলে মুহূর্তেই আতঙ্ক তৈরি হয়। তবে সৌভাগ্যক্রমে বড় বিস্ফোরণ বা প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। প্রাথমিকভাবে এটি একটি যান্ত্রিক ত্রুটিজনিত দুর্ঘটনা বলেই মনে করা হচ্ছে।
কীভাবে ঘটল দুর্ঘটনা
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ট্রাকটির রেজিস্ট্রেশন নম্বর ছিল AS-01UC-3967 এবং এটি হাফলং থেকে শিলচরের দিকে যাচ্ছিল । ডুরবিনটিলার কাছে প্রথমে একটি পেছনের চাকা গাড়ি থেকে আলাদা হয়ে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই সামনের আরেকটি চাকা খুলে পাশের গভীর খাদে গড়িয়ে পড়ে, আর সেই ধাক্কায় ট্রাকটির চালক আর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেননি । এলপিজি সিলিন্ডারবাহী ট্রাক দুর্ঘটনা হওয়ায় শুরুতে আশপাশের মানুষ বিস্ফোরণের আশঙ্কায় ভয়ে ছুটে আসেন, কিন্তু পুলিশ পরে নিশ্চিত করে যে কোনো আগুন বা বিস্ফোরণ হয়নি।
চালক সামান্য আহত হলেও প্রাণে বেঁচে যান বলে জানিয়েছে । তীব্র গতিতে চলন্ত ট্রাক থেকে চাকা খুলে যাওয়ার ঘটনা শুধু গাড়ির যান্ত্রিক সমস্যাই নয়, হাইওয়েতে ভারী পণ্যবাহী যানবাহনের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তোলে। বিশেষ করে এলপিজি সিলিন্ডারের মতো দাহ্য পণ্য বহনের সময় সামান্য দুর্ঘটনাও বড় বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। এই কারণে স্থানীয়রা ঘটনাস্থলে গিয়ে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য পুলিশকে চাপ দেন ।
পুলিশ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা
এলপিজি সিলিন্ডারবাহী ট্রাক দুর্ঘটনার খবর পেয়ে বোরখোলা থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাব-ইন্সপেক্টর আব্দুল হক লস্করের নেতৃত্বে দলটি পৌঁছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয় । পুলিশ ট্রাকটিকে সরিয়ে নেওয়া, সড়কে ঝুঁকি কমানো এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কাজ শুরু করে। দুর্ঘটনার কারণ জানতে তদন্তও শুরু হয়েছে । এখন প্রাথমিকভাবে যান্ত্রিক ত্রুটি, চাকার সংযোগ আলগা হয়ে যাওয়া, বা রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি—এসব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ ধরনের দুর্ঘটনা নতুন নয়। ২০২৪ সালে মরিগাঁওয়ে একটি সিলিন্ডারবাহী ট্রাক স্টিয়ারিং লক হয়ে উল্টে গিয়েছিল, যদিও তখনও বড় কোনো প্রাণহানি হয়নি । ২০২৫ সালে ত্রিচিতে আরেকটি সিলিন্ডারবাহী ট্রাক উল্টে গিয়ে ধারাবাহিক বিস্ফোরণ ঘটে, যা কয়েক ঘণ্টার জন্য হাইওয়ে বন্ধ করে দেয় । তুলনামূলকভাবে দেখা যাচ্ছে, এলপিজি বহনকারী যানবাহনের ক্ষেত্রে সড়ক নিরাপত্তা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং জরুরি প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটুখানি ভুলও বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
শিলচর–হাফলং রুটের ঝুঁকি
শিলচর-হাফলং হাইওয়ে বরাবর পণ্যবাহী যান চলাচল প্রতিদিনই হয়, আর এই করিডোরটি বরাক উপত্যকা ও পাহাড়ি এলাকার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ । ডুরবিনটিলার মতো অংশে ঢাল, বাঁক, খাদের নিকটতা এবং রাস্তার প্রশস্ততা—এসব কারণে বড় গাড়ির ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। এলপিজি সিলিন্ডারবাহী ট্রাক দুর্ঘটনা তাই কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এই রুটে ভারী যান নিয়ন্ত্রণ, লোডিং মান এবং টায়ার-অ্যাক্সেল রক্ষণাবেক্ষণের গুরুত্বও সামনে নিয়ে আসে।
স্থানীয়দের মতে, এই পথে অতিরিক্ত গতি, ওভারলোডিং এবং মাঝেমধ্যে রাস্তার অবস্থা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। যদিও এই দুর্ঘটনায় কারও মৃত্যু হয়নি, তথাপি এলাকাবাসী মনে করছেন যে হাইওয়েতে বিপজ্জনক পণ্যবাহী গাড়ির জন্য আরও কড়া তদারকি দরকার । বিশেষ করে গ্যাস সিলিন্ডার, জ্বালানি বা রাসায়নিক বহনকারী যানবাহনের জন্য আলাদা নিরাপত্তা প্রোটোকল থাকা উচিত। এই ধরনের ট্রাকের চাকা, ব্রেক, লকিং মেকানিজম, এবং ওজনবণ্টন নিয়মিত পরীক্ষা না হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যায়।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির প্রভাব
এলপিজি সিলিন্ডারবাহী ট্রাক দুর্ঘটনার খবর হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের মানুষের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শিলচর-হাফলং হাইওয়ে বরাক উপত্যকার পণ্য সরবরাহের একটি প্রধান লাইফলাইন। এই পথ দিয়ে সিলিন্ডার, খাদ্যপণ্য, নির্মাণসামগ্রী এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র চলাচল করে। যদি এমন ট্রাক দুর্ঘটনায় বড় আগুন লাগত, তাহলে কেবল সড়কই বন্ধ হতো না, আশপাশের এলাকায় সরবরাহ ব্যবস্থাও ব্যাহত হতে পারত। তাই এই ঘটনায় বড় বিপদ এড়ানো গেলেও ঝুঁকিটা পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছে।
লালা টাউন বা হাইলাকান্দির যেকোনো পণ্যবাজারের জন্য এমন রুটে নিরাপদ পরিবহন অত্যন্ত জরুরি। একদিকে রান্নার গ্যাসের চাহিদা, অন্যদিকে আঞ্চলিক বাণিজ্য—দুটোই এই ধরনের ট্রাকের ওপর নির্ভরশীল। ফলে দুর্ঘটনার পর শুধু পুলিশের তদন্ত নয়, পরিবহন সংস্থাগুলোরও নিজেদের রক্ষণাবেক্ষণ পদ্ধতি খতিয়ে দেখা উচিত। চালকদের বিশ্রাম, গাড়ির সার্ভিসিং এবং লোডিং মানদণ্ড মানা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা না গেলে এমন ঘটনা বারবার ফিরে আসতে পারে।
এলপিজি সিলিন্ডারবাহী ট্রাক দুর্ঘটনা শেষ পর্যন্ত বড় ক্ষতি না ঘটালেও একটি সতর্কবার্তা দিয়ে গেল। ভারী পণ্যবাহী যান, বিশেষ করে দাহ্য পণ্য পরিবহনের সময় নিরাপত্তা ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। পুলিশ তদন্তের ফল এবং পরিবহন সংস্থার প্রতিক্রিয়া এখন দেখার বিষয়।