Read today's news --> ⚡️Click here 

নেপাল হড়পা বান নিখোঁজ ৭৫০, তিব্বত সীমান্তে মৃত ১৬৩

নেপাল হড়পা বান নিখোঁজ করেছে ৭৫০-রও বেশি মানুষকে, যার মধ্যে ১০৫ জন ভারতীয় নাগরিকও রয়েছেন। বুধবার, ২৬ আগস্ট তিব্বত সীমান্তবর্তী মধ্য নেপালে আঘাত হানা এই ভয়াবহ বন্যায় এখন পর্যন্ত ১৬৩ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে, এবং মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তারা ।

তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ বিস্ফোরণ ও ভূমিধসের ফলে এই ভয়াবহ বন্যার সূত্রপাত ঘটে বলে নেপাল সরকারি সূত্রে জানা গেছে। নেপালের বৈদেশিক মন্ত্রী শিশির খানাল সংসদে জানিয়েছেন যে তিব্বত অঞ্চলে সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে এবং তার মাত্র তিন মিনিট পরেই হড়পা বানের খবর পাওয়া যায় ।

কীভাবে ছড়িয়ে পড়লো এই বিপর্যয়

নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রাসুয়া জেলার তিমুরে সীমান্ত শহরে ভোটে কোশি নদী দিয়ে এই বিশাল বন্যা ত্রিশূলী নদীতে প্রবেশ করে, যা নেপাল-তিব্বত সীমান্তে অবস্থিত লেন্দে নদীর শিলাধস ও স্ফীতির কারণে সৃষ্ট হয়েছিল। এরপর এই বন্যা নদীপথ ধরে নুওয়াকোট, চিতওয়ান, গোর্খা, তানাহু ও নওলপরাসি পূর্বসহ কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে ।

এই বিপর্যয়ে অন্তত আটটি চালু জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, যাদের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ৩৫৪ মেগাওয়াট, এবং নুওয়াকোট ও রাসুয়া জেলায় নির্মাণাধীন পাঁচটি প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়াও ১৯টি যান চলাচলযোগ্য সেতু সম্পূর্ণভাবে ভেসে গেছে, যা উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে বড় বাধার সৃষ্টি করছে ।

কৈলাস মানসরোবর যাত্রীদের ওপর প্রভাব

এই বিপর্যয়ের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, নিখোঁজদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক ভারতীয় কৈলাস মানসরোবর যাত্রায় গিয়েছিলেন। নেপাল পর্যটন বোর্ডের মুখপাত্র সুনীল শর্মা জানিয়েছেন যে তিব্বতের কৈলাস মানসরোবরের উদ্দেশ্যে যাত্রাকারী প্রায় ১৩৩ জন ভারতীয় তীর্থযাত্রী নিখোঁজ রয়েছেন, যা হিন্দুদের জন্য একটি অত্যন্ত পবিত্র তীর্থস্থান ।

নেপাল পর্যটন বোর্ডের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, রাসুয়াগড়ি চেকপোস্টে মোট ৩৮৪ জন যাত্রীর সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, যাদের মধ্যে ২৯১ জন বিদেশি নাগরিক এবং ৯৩ জন নেপালি। বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে ১০৫ জন ভারতীয় নাগরিক এবং ৩৭ জন প্রবাসী ভারতীয় (এনআরআই) রয়েছেন, যা চিহ্নিত হওয়া গোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে বড় । এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া ও নেদারল্যান্ডসসহ দুই ডজনেরও বেশি দেশের পর্যটকও নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছেন ।

ভারতের ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে সমস্ত ধরনের মানবিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। এক্স-এ প্রকাশিত এক বার্তায় মোদী বলেন, “নেপালে বন্যায় প্রাণহানির জন্য আমি প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহর সঙ্গে কথা বলেছি এবং সমবেদনা জানিয়েছি। এই কঠিন সময়ে ভারতের জনগণ নেপালের ভাই-বোনদের পাশে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের দল উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে” ।

ভারত ইতিমধ্যে ১০ টন মানবিক সহায়তা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ নেপালে পাঠিয়েছে একটি ভারতীয় বিমানবাহিনীর সি-১৩০জে বিমানের মাধ্যমে, যাতে অস্থায়ী আশ্রয়, কম্বল, স্বাস্থ্যবিধি সামগ্রী, সৌর বাতি ও ওষুধ রয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জানিয়েছেন যে আরও একটি সি-১৭ বিমান ২৭ আগস্ট সকালে নেপালের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে, এবং ভারতীয় বিমানবাহিনীর সি-১৩০জে ও সি-২৯৫ বিমানের বহর প্রস্তুত রাখা হয়েছে ।

জরুরি হেল্পলাইন তথ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়া

কাঠমান্ডুতে ভারতীয় দূতাবাস ভারতীয় নাগরিকদের সহায়তার জন্য জরুরি নম্বর চালু করেছে—+৯৭৭ ৯৮৫ ১৩১ ৬৮০৭ এবং +৯৭৭ ৯৭০ ৯১০ ৭৫০০। এছাড়াও ভারত সরকার দিল্লি থেকে +৯১-৭৪২৮১৩৫০৪৪, +৯১-৮৫২৭৫৮০২৪৫ এবং ০১১-২৩০১২৮০৭ নম্বরে হেল্পলাইন চালু করেছে । উত্তরপ্রদেশ ও কেরালাসহ একাধিক ভারতীয় রাজ্য সরকারও নিজস্ব হেল্পলাইন নম্বর চালু করেছে, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো তাদের প্রিয়জনদের সম্পর্কে তথ্য পেতে পারে ।

নেপালে ভারতের রাষ্ট্রদূত নবীন শ্রীবাস্তব ব্যক্তিগতভাবে নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদন গুরুং ও বৈদেশিক মন্ত্রী শিশির খানালের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রেখে ভারতীয় পর্যটকদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করার সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করছেন ।

চীনের প্রতিক্রিয়া সীমান্তের দুই পাশে ক্ষয়ক্ষতি

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিসিটিভি জানিয়েছে যে তিব্বতের গিয়ারং কাউন্টিতে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিখোঁজদের খুঁজে বের করতে এবং উদ্ধার করতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টার নির্দেশ দিয়েছেন এবং শিগাৎসে থেকে পিপলস আর্মড পুলিশের ১৪৫ জন কর্মকর্তা ও সেনা মোতায়েন করা হয়েছে ।

নেপালের পক্ষ থেকে সেনাবাহিনী, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী ও নেপাল পুলিশের সদস্যদের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কাজে মোতায়েন করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ১০০ জনকে বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ৩০ জন কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষণ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ।

উত্তর-পূর্ব ভারত বরাক উপত্যকার জন্য প্রাসঙ্গিকতা

যদিও এই বিপর্যয় সরাসরি বরাক উপত্যকা বা হাইলাকান্দি জেলার সঙ্গে ভৌগোলিকভাবে যুক্ত নয়, তবে উত্তর-পূর্ব ভারতের অনেক মানুষ, বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা, কৈলাস মানসরোবর যাত্রায় অংশ নিয়ে থাকেন। হাইলাকান্দি ও লালা টাউনসহ বরাক উপত্যকার যেসব পরিবারের সদস্য এই যাত্রায় গিয়েছেন বা ভবিষ্যতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য এই ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের উচিত নেপাল ভ্রমণের আগে আবহাওয়া পরিস্থিতি ও সরকারি সতর্কবার্তা সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং প্রয়োজনে ভারতীয় দূতাবাসের হেল্পলাইন নম্বরগুলো সংরক্ষণ করে রাখা। যদি কোনো পরিবারের সদস্য বর্তমানে নেপালে অবস্থান করছেন, তাহলে তাদের উচিত অবিলম্বে ভারতীয় দূতাবাস বা রাজ্য সরকারের হেল্পলাইনে যোগাযোগ করা।

আগামী দিনে কী প্রত্যাশিত

উদ্ধারকারী দলগুলো এখনও দুর্গম এলাকায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছে, তবে ধ্বংসপ্রাপ্ত সেতু ও রাস্তা এই কাজকে জটিল করে তুলেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীন ও নেপাল মিলিয়ে প্রায় ১,৫০০ মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন, এবং মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কর্মকর্তারা ।

আগামী দিনগুলোতে উদ্ধার অভিযানের অগ্রগতি এবং নিখোঁজ ভারতীয় তীর্থযাত্রীদের সন্ধান পাওয়া যায় কিনা তার দিকেই এখন নজর থাকবে সবার। ভারত সরকারের অব্যাহত সহায়তা ও নেপাল-চীনের যৌথ উদ্ধার প্রচেষ্টা এই দুর্যোগ মোকাবিলায় কতটা কার্যকর হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য আশার আলো কতটা উজ্জ্বল হবে।

নেপাল হড়পা বান নিখোঁজ ৭৫০, তিব্বত সীমান্তে মৃত ১৬৩
Scroll to top