অসম সচিবালয় বরাক উপত্যকা নামে আনুষ্ঠানিকভাবে নামকরণ করা হয়েছে শিলচরের ‘মিনি সচিবালয়, বরাক উপত্যকা’-কে, রাজ্য মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী। সাধারণ প্রশাসন বিভাগ (জিএডি) কর্তৃক ২১ আগস্ট জারি করা এই বিজ্ঞপ্তি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়েছে, এবং এতে শিলচরের এই প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান থেকে কোন কোন দপ্তর পরিচালিত হবে তার বিস্তারিত তালিকাও উল্লেখ করা হয়েছে ।
মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা আগেই জানিয়েছিলেন, রাজ্য সরকারের মোট ৫৯টি দপ্তরের মধ্যে ৩২টি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর এই বরাক উপত্যকা শাখা থেকে কাজ করবে। ১৮ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “বরাক উপত্যকার প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কেও আমরা একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত মিনি সচিবালয় এখন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অসম সচিবালয়, বরাক উপত্যকা নামে পরিচিত হবে” ।
কোন কোন দপ্তর শিলচর থেকে পরিচালিত হবে
শিলচরের এই সচিবালয়ে যেসব গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর কাজ করবে তার মধ্যে রয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর সচিবালয়, সাধারণ প্রশাসন, কৃষি, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ, উচ্চশিক্ষা, বিদ্যালয় শিক্ষা, বিদ্যুৎ, গণপূর্ত, রাজস্ব ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পঞ্চায়েত ও গ্রামীণ উন্নয়ন, গৃহনির্মাণ ও নগর বিষয়ক, পরিবহন, জলসম্পদ, পরিবেশ ও বন এবং খাদ্য ও গণবণ্টন বিভাগসহ আরও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর ।
তালিকায় আরও রয়েছে বরাক উপত্যকা উন্নয়ন দপ্তর, সংখ্যালঘু কল্যাণ ও উন্নয়ন দপ্তর, সীমান্ত সুরক্ষা ও উন্নয়ন দপ্তর এবং মহিলা ও শিশু উন্নয়ন দপ্তর। মন্ত্রিসভা একইসঙ্গে বরাক উপত্যকা সচিবালয় থেকে দপ্তরগুলোর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রমিত কার্যপ্রণালী (এসওপি) ও নির্দেশিকাও অনুমোদন করেছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আমরা সমস্ত এসওপি ও নির্দেশিকা উপস্থাপন করেছি” ।
সচিবালয়ের নির্মাণ ও পটভূমি
শিলচরের শ্রীকোনায় নির্মিত এই সচিবালয় ভবনটি ১৫ বিঘা জমির ওপর তৈরি, যার নির্মিত এলাকা ১৮,৫৮৫ বর্গমিটার। মাত্র ৩৬ মাসের মধ্যে এই ভবনের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। ২০২৬ সালের ১৪ মার্চ মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা এই সচিবালয় আনুষ্ঠানিকভাবে জনগণের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন এবং একই সঙ্গে বরাক উপত্যকার তিনটি জেলা—কাছাড়, হাইলাকান্দি ও শ্রীভূমি জুড়ে প্রায় ৩৪০ কোটি টাকা মূল্যের একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও শিলান্যাস করেন ।
এই সচিবালয়ের ষষ্ঠ তলায় মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয়, মুখ্যমন্ত্রীর অতিরিক্ত মুখ্য সচিবের কার্যালয় এবং বরাক উপত্যকা উন্নয়ন দপ্তরের মন্ত্রীর কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। এই মিনি সচিবালয়ের ধারণা প্রথম অনুমোদিত হয়েছিল ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে, যখন রাজ্য মন্ত্রিসভা ব্যক্তিগত, রাজস্ব ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জিএডি, কৃষি, মৎস্য এবং পশুপালন ও পশুচিকিৎসা বিভাগ—এই ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর নিয়ে এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল । নির্মাণের জন্য তৎকালীন সময়ে ১১৬ কোটি টাকা মঞ্জুর করা হয়েছিল ।
প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের বৃহত্তর লক্ষ্য
মার্চ মাসে সচিবালয় উদ্বোধনের সময় মুখ্যমন্ত্রী সরমা বলেছিলেন, “দীর্ঘদিন ধরে অসমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া মূলত রাজধানীতেই কেন্দ্রীভূত ছিল। গত পাঁচ বছর ধরে আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার ছিল এই মানসিকতা ভেঙে দিয়ে রাজ্যের প্রতিটি কোণে শাসনব্যবস্থা ও উন্নয়ন পৌঁছে দেওয়া নিশ্চিত করা” । তিনি আরও যোগ করেন, “এগুলো নিছক ভবন নয়, বরং আমাদের অভিপ্রায়ের দৃঢ় বার্তা।”
মুখ্যমন্ত্রী ব্যাখ্যা করেন যে সরকার জেলা প্রশাসনগুলোকে একাধিক নির্বাহী ক্ষমতা অর্পণ করেছে এবং একাধিক কো-ডিস্ট্রিক্ট তৈরি করেছে যাতে তৃণমূল পর্যায়ে শাসনব্যবস্থা উন্নত হয়। এই সংস্কারের লক্ষ্য হলো নাগরিকদের জেলা সদর বা রাজ্যের রাজধানীতে দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দিয়ে সরকারি পরিষেবা পাওয়ার দীর্ঘদিনের প্রথা বন্ধ করা। “সরকারকে জনগণের কাছে পৌঁছাতে হবে, জনগণকে সরকারের কাছে যেতে হবে না,” সরমা বলেন ।
হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের জন্য তাৎপর্য
এই সিদ্ধান্ত হাইলাকান্দি জেলা ও লালা টাউনের বাসিন্দাদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শিলচরের এই সচিবালয় থেকে পরিচালিত ৩২টি দপ্তরের সেবা এখন থেকে গুয়াহাটির পরিবর্তে অনেক কাছে থেকে পাওয়া সম্ভব হবে। কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, রাজস্ব, পরিবহন ও গ্রামীণ উন্নয়নের মতো দপ্তরগুলো সরাসরি হাইলাকান্দির বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত, এবং এই দপ্তরগুলোর সেবা শিলচর থেকেই পাওয়া গেলে সময় ও অর্থ উভয়ই সাশ্রয় হবে।
বরাক উপত্যকা উন্নয়ন দপ্তরকেও এই সচিবালয়ের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা হাইলাকান্দিসহ গোটা উপত্যকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনতে পারে। মার্চ মাসে সচিবালয় উদ্বোধনের সময় ঘোষিত ৩৪০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে হাইলাকান্দি জেলাও অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা প্রমাণ করে যে এই প্রশাসনিক পুনর্গঠনের সুফল সরাসরি স্থানীয় উন্নয়নে প্রতিফলিত হচ্ছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
মন্ত্রী কৌশিক রাই এর আগে মুখ্যমন্ত্রীর বরাক উপত্যকা উন্নয়ন দপ্তর প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তকে “সাহসী পদক্ষেপ” বলে অভিহিত করেছিলেন। মার্চ মাসের অনুষ্ঠানে রাই বলেছিলেন যে শিলচরে অসম সচিবালয় প্রতিষ্ঠা প্রশাসনিক দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করবে এবং সমগ্র উপত্যকার মানুষের জন্য সরকারি পরিষেবা দ্রুততর ও অধিকতর সহজলভ্য করে তুলবে ।
তবে এই উদ্যোগ শুরুর সময় থেকেই রাজনৈতিক বিতর্কের মুখেও পড়েছিল। ২০২১ সালে মিনি সচিবালয় অনুমোদনের সময় কংগ্রেস দল একে “ভাবমূর্তি রক্ষার প্রচেষ্টা” বলে সমালোচনা করেছিল এবং দাবি করেছিল যে গণপূর্ত বিভাগের অতিরিক্ত মুখ্য প্রকৌশলীর কার্যালয় স্থাপনের মতো এই পদক্ষেপও বরাক উপত্যকার প্রতি দীর্ঘদিনের অবহেলার ট্যাগ মুছে ফেলার একটি প্রচেষ্টা মাত্র ।
আগামী দিনে কী প্রত্যাশিত
মন্ত্রিসভার অনুমোদিত এসওপি ও নির্দেশিকা বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিলচরের এই সচিবালয় কতটা কার্যকরভাবে কাজ করে, তার ওপরই নির্ভর করবে বরাক উপত্যকার বাসিন্দাদের জন্য প্রকৃত সুবিধা কতটা বাস্তবায়িত হয়। এপ্রিল মাসে মুখ্যমন্ত্রী নিজেই সামাজিক মাধ্যমে উল্লেখ করেছিলেন যে বরাক উপত্যকার উন্নয়নে সরকার “বিশেষ গুরুত্ব” দিচ্ছে এবং এই সচিবালয় শাসনব্যবস্থাকে জনগণের আরও কাছে নিয়ে যাওয়ার একটি মূল উদ্যোগ ।
আগামী দিনগুলোতে দেখার বিষয় হলো, এই ৩২টি দপ্তর কত দ্রুত এবং কতটা সুষ্ঠুভাবে শিলচর থেকে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করে এবং হাইলাকান্দিসহ বরাক উপত্যকার অন্যান্য জেলার বাসিন্দারা প্রকৃতপক্ষে কতটা দ্রুত ও সহজে সরকারি পরিষেবা পান। যদি এই বিকেন্দ্রীকরণ সফল হয়, তাহলে তা কেবল প্রশাসনিক সুবিধাই নয়, বরং বরাক ও ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার মধ্যে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক দৃঢ় করার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হয়ে উঠবে।