জোড়াবাট বৈঠক অসম মেঘালয়ের মধ্যে শুরু হয়েছে শনিবার, ২২ আগস্ট গুয়াহাটির খানাপাড়ার সরকারি অতিথিশালায়। অসমের সীমান্ত সুরক্ষা ও উন্নয়ন মন্ত্রী অতুল বরা এবং মেঘালয়ের উপমুখ্যমন্ত্রী স্নিয়াবলাং ধর উভয় রাজ্যের ঊর্ধ্বতন আধিকারিকদের নিয়ে এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসেছেন, যাতে শিলংয়ে ১৯ আগস্ট ঘটে যাওয়া সহিংসতা এবং তার জেরে জোড়াবাটে চলা অবরোধের সমাধান খোঁজা যায় ।
বৈঠক শুরুর আগে অতুল বরা সাংবাদিকদের জানান, শিলংয়ের ঘটনা “অপ্রয়োজনীয় ও দুর্ভাগ্যজনক” এবং অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমার সঙ্গে কথা বলে এই বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমি উভয় রাজ্যের মানুষের কাছে আবেদন করছি শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে, কারণ আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত প্রাচীন” । এই বৈঠকের মূল লক্ষ্য দুই রাজ্যের মধ্যে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক করা এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
বৈঠকের মূল এজেন্ডা ও দাবিদাওয়া
শিলংয়ে ১৯ আগস্ট খাসি স্টুডেন্টস ইউনিয়নের (কেএসইউ) কালো-পতাকা মিছিলে অসমের পর্যটকবাহী গাড়িগুলোতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার পর থেকে জোড়াবাট ও খানাপাড়ায় অসমের ক্যাব চালক ও পরিবহন শ্রমিকরা মেঘালয়গামী যানবাহনের চলাচল রুদ্ধ করে রেখেছে। প্রতিবাদকারীদের প্রধান দাবি—শিলংয়ে ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির মালিক ও চালকদের জন্য ক্ষতিপূরণ এবং মেঘালয় সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা ।
অতুল বরা জানান, মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার নির্দেশেই এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে এবং মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমা উপমুখ্যমন্ত্রী স্নিয়াবলাং ধরকে এই বিষয়ে আলোচনার দায়িত্ব দিয়েছেন। বৈঠকে দুই রাজ্যের প্রতিনিধিরা শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখার পাশাপাশি দুই রাজ্যের মধ্যে যাতায়াতের স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করছেন বলে জানা গেছে ।
অবরোধের চতুর্থ দিনে জটিলতা বাড়ছে
জোড়াবাট অবরোধ শনিবার চতুর্থ দিনে গড়িয়েছে, এবং পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। অসম স্টেট ড্রাইভার্স ইউনিয়ন ও অন্যান্য ক্যাব অপারেটর সংগঠনগুলো শুক্রবার ঘোষণা করেছে যে তারা রানি, বোকো, হাহিম ও লাম্পি রোড—এই চারটি বিকল্প প্রবেশপথেও অবরোধ ছড়িয়ে দিচ্ছে, যা মেঘালয় সরকারের বিকল্প রাস্তা ব্যবহারের পরামর্শকে কার্যত অকার্যকর করে তুলছে ।
একজন প্রতিবাদী ক্যাব চালক জোড়াবাটে সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা যতক্ষণ না স্থায়ী সমাধান পাচ্ছি, ততক্ষণ এই প্রতিবাদ চালিয়ে যাব। অর্ধেক সমাধান আমরা গ্রহণ করব না।” তিনি আরও জানান, সরকার তাদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করেনি এবং মন্ত্রীপর্যায়ের বৈঠকের ফলাফল নিয়েও তাঁদের মধ্যে সংশয় রয়েছে । তবে প্রতিবাদকারীরা স্পষ্ট করেছে যে জরুরি পরিষেবার গাড়িগুলোকে তারা থামাচ্ছে না।
জ্বালানি সংকট ও মেঘালয়ের মুখ্য সচিবের গাড়ি আটক
অবরোধের প্রভাব এখন শুধু যাত্রী পরিবহনে সীমাবদ্ধ নেই। নর্থ ইস্ট পেট্রোলিয়াম মজদুর ইউনিয়ন ঘোষণা করেছে যে শান্তি প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত তারা মেঘালয়গামী জ্বালানি পণ্যের লোডিং-আনলোডিং অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখবে। এর ফলে শিলংয়ে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে, অনেক পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন পড়ে গেছে এবং কিছু পাম্প বন্ধ হয়ে গেছে নতুন সরবরাহ না পৌঁছানোর কারণে ।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝা যায় এখান থেকে যে, শনিবার সকালে মেঘালয়ের মুখ্য সচিব শাকিল পি আহমেদের গাড়িও জোড়াবাটে আটকে পড়েছিল এবং কিছু সময়ের জন্য সেখানেই stranded হয়ে ছিল বলে ইন্ডিয়া টুডে এনই জানিয়েছে । এই ঘটনা প্রমাণ করে যে অবরোধ কতটা কঠোরভাবে পালন করা হচ্ছে এবং এটি কেবল সাধারণ যাত্রী নয়, বরং উচ্চপর্যায়ের সরকারি আধিকারিকদের যাতায়াতেও প্রভাব ফেলছে।
AJYCP-র হুঁশিয়ারি ও অর্থনৈতিক অবরোধের ডাক
এই পরিস্থিতিতে অসম জাতীয়তাবাদী যুব ছাত্র পরিষদ (AJYCP) আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সংগঠনটির সভাপতি পলাশ চাংমাই শুক্রবার সাংবাদিকদের সতর্ক করে বলেন, “যদি তারা ক্ষমা না চায়, তাহলে আমরা মেঘালয়ের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ শুরু করব।” তিনি আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “আসামে আমরা কখনো মেঘালয়ের ছাত্র বা কর্মীদের সমস্যা সৃষ্টি করিনি। কিন্তু যদি আমাদের মানুষকে আবার লক্ষ্যবস্তু করা হয়, তাহলে আমরাও আসাম থেকে মেঘালয়ের মানুষকে বের করে দেব” ।
সেন্টিনেল আসামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নাগরিক সুরক্ষা সমিতি, আসাম নামক আরেকটি সংগঠন সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক অবরোধের ডাক দিয়েছে এবং আসামের মানুষকে রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে একত্রিত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে । এই হুঁশিয়ারিগুলো পরিস্থিতিকে আরও সংকটময় করে তুলছে, কারণ মেঘালয়ের পর্যটন ও বাণিজ্যের একটি বড় অংশ আসামের পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভরশীল।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির জন্য প্রাসঙ্গিকতা
জোড়াবাট অবরোধ দীর্ঘায়িত হলে তার প্রভাব সরাসরি বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দি জেলার বাসিন্দাদের ওপরও পড়বে। লালা টাউন ও আশপাশের এলাকা থেকে বহু মানুষ প্রতি বছর শিক্ষা, চিকিৎসা ও পর্যটনের জন্য শিলং যাতায়াত করেন, এবং তাদের অনেকেই গুয়াহাটি হয়েই মেঘালয়ে প্রবেশ করেন। জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ থাকা এবং যানবাহন চলাচলে বিধিনিষেধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তা বরাক উপত্যকা থেকে মেঘালয়গামী যাত্রী ও পরিবহন ব্যবসায়ীদের জন্যও বাড়তি ভোগান্তির কারণ হতে পারে।
AJYCP সভাপতি পলাশ চাংমাই নিজেই উল্লেখ করেছেন যে বরাক উপত্যকা রুট দিয়েও মানুষকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য সরাসরি প্রভাব ফেলছে । স্থানীয় পরিবহন সংগঠন ও নিয়মিত যাত্রীদের উচিত আজকের গুয়াহাটি বৈঠকের ফলাফলের দিকে নজর রাখা, কারণ এই বৈঠকেই নির্ধারিত হতে পারে কবে নাগাদ গুয়াহাটি-শিলং যাতায়াত পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে।
এখন কী প্রত্যাশিত
আজকের গুয়াহাটি বৈঠক এই সংকট সমাধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বৈঠকে ফলপ্রসূ সিদ্ধান্ত না এলে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ থাকা, পাল্টাপাল্টি অবরোধ, AJYCP-র মতো সংগঠনগুলোর হুঁশিয়ারি এবং মেঘালয়ে ছড়িয়ে পড়া অগ্নিসংযোগের ঘটনা—এই চারটি বিষয় একত্রে পরিস্থিতিকে আরও সংকটময় করে তুলতে পারে।
আগামী কয়েক ঘণ্টায় মন্ত্রী অতুল বরা ও উপমুখ্যমন্ত্রী স্নিয়াবলাং ধরের আলোচনা থেকে কী সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসে, তার ওপরই নির্ভর করবে জোড়াবাট, খানাপাড়া ও অন্যান্য প্রবেশপথে অবরোধ প্রত্যাহার হবে কিনা এবং দুই রাজ্যের মধ্যে যাতায়াত কত দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে। ততক্ষণ পর্যন্ত যাত্রী, পরিবহন ব্যবসায়ী ও দুই রাজ্যের সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের জন্য অপেক্ষা আর সতর্কতাই একমাত্র পথ।