লুমডিং-বদরপুর রেললাইনে ভূমিধস রোধে নতুন প্রযুক্তিগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেল (NFR)। ডিমা হাসাও জেলার পাহাড়িয়া এই রুটে বর্ষার সময় বারবার ভূমিধসের কারণে ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়। এই সমস্যা সমাধানের জন্য NFR এবার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে জিওব্যাগ এবং বাঁশের পাইলিং ব্যবহার করে মাটির বাঁধ স্থিতিশীল করার উদ্যোগ নিয়েছে। এই পদক্ষেপের ফলে বরাক উপত্যকা, ত্রিপুরা, মণিপুর এবং মিজোরামের সঙ্গে রেল যোগাযোগ আরও সুরক্ষিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে ।
রেল কর্তৃপক্ষের মতে, নিউ হারাঙ্গাজাও স্টেশনের কাছে লাইন ১ এবং লাইন ২-এ মাটির বসে যাওয়ার সমস্যা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে কঠোর নজরদারির মধ্যে শুধুমাত্র লাইন ৩ দিয়ে ট্রেন চলাচল করছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ৭০০-এরও বেশি শ্রমিক এবং জেসিবিসহ ভারী যন্ত্রপাতি মোতায়েন করা হয়েছে। বালি, পাথর, পাথরের গুঁড়ো এবং জিওব্যাগ ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর সংস্কার কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে ।
জিওব্যাগ প্রযুক্তি ও আধুনিক সার্ভে
জিওব্যাগ হলো এক ধরনের বিশেষ সিন্থেটিক বস্তা, যা বালি বা মাটি দিয়ে ভর্তি করে ভাঙন বা ধস রোধে ব্যবহার করা হয়। এটি মাটিকে ধরে রাখে এবং জলের প্রবাহেও সহজে ক্ষয় হতে দেয় না। NFR-এর এক আধিকারিক জানিয়েছেন, পাহাড়ের ঢালগুলোকে স্থিতিশীল রাখতে জিওব্যাগের পাশাপাশি মাইক্রো-পাইলিং এবং অন্যান্য কাঠামোগত ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে ।
এছাড়াও, লুমডিং-বদরপুর রেললাইনে ভূমিধস প্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করতে NFR ড্রোন-ভিত্তিক লাইডার (LiDAR), এরিয়াল ইমেজিং এবং ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক সার্ভে শুরু করেছে। এই অত্যাধুনিক ভূ-ভৌত সার্ভের মাধ্যমে মাটির নিচের ফাটল, জল জমার স্থান এবং সম্ভাব্য ধস প্রবণ এলাকাগুলো আগে থেকেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে ।
স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া কেন্দ্র স্থাপন
ভূমিধস এবং বন্যা মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতির জন্য NFR তাদের নেটওয়ার্কের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া কেন্দ্র (Automatic Weather Stations – AWS) বসানোর কাজ শুরু করেছে। এর মধ্যে লুমডিং-বদরপুর সেকশনও রয়েছে। এই কেন্দ্রগুলো রিয়েল-টাইমে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেবে, যার ফলে ভারী বৃষ্টির আগে রেল কর্তৃপক্ষ ট্রেন চলাচলের বিষয়ে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে পারবে ।
ইতিমধ্যেই তিনটি আবহাওয়া কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে এবং বাকিগুলোর কাজ মে মাসের মধ্যেই শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছিল। যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে বর্তমানে সন্ধ্যা ৭টা থেকে সকাল ৫টা পর্যন্ত এই রুটে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে এবং দিনের বেলায় নিয়ন্ত্রিত গতিতে ট্রেন চালানো হচ্ছে l
বরাক উপত্যকা ও লালার উপর প্রভাব
লুমডিং-বদরপুর রুটটি বরাক উপত্যকার প্রাণরেখা। হাইলাকান্দি জেলার লালা টাউনসহ সমগ্র দক্ষিণ অসম, ত্রিপুরা ও মিজোরামের মানুষ চিকিৎসার প্রয়োজনে, ব্যবসার কাজে এবং উচ্চশিক্ষার জন্য এই রেলপথের ওপর নির্ভরশীল। ভূমিধসের কারণে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকলে এই অঞ্চলের জনজীবন কার্যত স্তব্ধ হয়ে যায়।
সম্প্রতি হাইলাকান্দিতে ভূমিধসের পর রেল যোগাযোগ আবার চালু হয়েছে । তবে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য NFR-এর এই নতুন পরিকাঠামোগত উদ্যোগ লালা টাউনের বাসিন্দাদের মনে আশা জাগিয়েছে। জিওব্যাগ এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে যদি ধসের হার কমানো যায়, তবে বর্ষাকালেও ট্রেন পরিষেবা স্বাভাবিক থাকবে, যা স্থানীয় অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত লাভজনক হবে।