গুয়াহাটি ক্যাব অবরোধ মেঘালয়ের বিরুদ্ধে শুক্রবার, ২১ আগস্ট দ্বিতীয় দিনে গড়িয়েছে, শিলংয়ে ছাত্র সংগঠনের মিছিল ঘিরে সহিংসতার প্রতিক্রিয়ায় অসমের বাসিন্দাদের ওপর হামলার অভিযোগে। গুয়াহাটির ক্যাব চালকরা জোড়াবাট ও খানাপাড়ায় মেঘালয়গামী যানবাহনের যাতায়াত রুদ্ধ করে দিয়েছেন, যা দুই রাজ্যের মধ্যে যাত্রী ও পণ্যবাহী গাড়ির স্বাভাবিক চলাচলে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে অসম সরকার আটকে পড়া মানুষদের সহায়তায় হেল্পলাইন নম্বর চালু করেছে ।
প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, বুধবার শিলংয়ে খাসি স্টুডেন্টস ইউনিয়নের (কেএসইউ) আয়োজিত একটি কালো-পতাকা বাইক র্যালিতে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর। মেঘালয় পুলিশের তথ্য অনুসারে, এই ঘটনায় অন্তত ৩১টি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ১৬ জন আহত হন এবং দুটি গাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয় ।
জোড়াবাট-খানাপাড়ায় অবরোধের বাস্তব চিত্র
জোড়াবাট ও খানাপাড়া—অসম থেকে মেঘালয়ে প্রবেশের মূল দুটি পয়েন্ট—এই দুই স্থানে অবরোধের ফলে যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহনের চলাচল ভীষণভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। যাত্রীদের রাজ্যের সীমান্তে গাড়ি বদল করতে বাধ্য করা হচ্ছে, এবং বহু পণ্যবাহী গাড়ি দুই পাশেই আটকে পড়েছে। তবে প্রতিবাদকারীরা জানিয়েছেন, জরুরি সেবায় ব্যবহৃত যানবাহনগুলোকে যাতায়াতের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে ।
জোড়াবাটে অবস্থান বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী এক ক্যাব চালক বলেন, “স্থায়ী সমাধান না পাওয়া পর্যন্ত আমরা এই প্রতিবাদ চালিয়ে যাব। মেঘালয়ে অসমের গাড়ি ও চালকদের হয়রানির ঘটনা এটি বারবার ঘটছে একটি বিষয়” । তিনি অসম ও মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রীদের মধ্যে ফোনালাপের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন, বলেন, “মুখ্যমন্ত্রীরা বলেছেন তারা ফোনে কথা বলেছেন। কিন্তু আমাদের ভয় দূর হয়নি। আমরা চাই আমাদের জীবন ও গাড়ির সুরক্ষা নিশ্চিত করা হোক” । অন্য এক প্রতিবাদকারী অসম সরকারের বিরুদ্ধে পরিবহন ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ শুনতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ তুলে বলেন, “কোনো কর্মকর্তা আমাদের সঙ্গে কথা বলেননি বা আমাদের সমস্যা জানতে চেষ্টা করেননি” ।
অসম পুলিশের হেল্পলাইন এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা
মেঘালয়ে আটকে পড়া অসমের বাসিন্দাদের সহায়তার জন্য রাজ্য সরকার হেল্পলাইন নম্বর চালু করেছে। অসম পুলিশের বিবৃতি অনুসারে, হোয়াটসঅ্যাপ হেল্পলাইন নম্বর ৯১৮১০১৪৮৮৮ এবং ল্যান্डলাইন নম্বর ০৩৬১২৩৮১৫১১ চালু করা হয়েছে, যাতে মেঘালয়ে আটকে পড়া বা যাতায়াতে অসুবিধায় থাকা অসমবাসীদের সহায়তা দেওয়া যায় ।
পুলিশ পরিবারের সদস্য, আত্মীয় বা যে কাউকে মেঘালয়ে আটকে পড়া ব্যক্তি বা যানবাহন সম্পর্কে তথ্য থাকলে হেল্পলাইনের মাধ্যমে তা জানাতে অনুরোধ করেছে। এই তথ্য মেঘালয়ের স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের কাছে সমন্বয় ও সহায়তার জন্য পাঠানো হবে বলে জানানো হয়েছে। অসম পুলিশ আরও জানিয়েছে, রাজ্য সরকার মেঘালয় প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় বজায় রাখছে এবং জনসাধারণকে শান্ত থাকার পাশাপাশি শুধুমাত্র যাচাই করা তথ্য শেয়ার করার আহ্বান জানিয়েছে ।
সহিংসতার পূর্ণ প্রেক্ষাপট
বুধবার, ১৯ আগস্ট শিলংয়ে সরকারি নিয়োগ সংস্কার-সহ একাধিক দাবিতে কেএসইউ-র আয়োজিত বাইক র্যালি সহিংস রূপ নেয়। প্রায় ২০০টি বাইকের এই মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা শহরের বিভিন্ন স্থানে সরকারি ও ব্যক্তিগত যানবাহনে হামলা চালায়, পথচারীদের মারধর করে এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও স্বামী বিবেকানন্দের মূর্তি ভাঙচুর করে বলে অভিযোগ ওঠে । পূর্ব খাসি হিলস জেলার পুলিশ সুপার বিবেক শ্যেম জানান, এই ঘটনায় ৩১টি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ১৬ জন আহত হয়েছেন এবং দুটি গাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে ।
মেঘালয় পুলিশ ঘটনার পর ১৫টি এফআইআর দায়ের করেছে এবং সহিংসতায় জড়িত অভিযুক্তদের খুঁজতে অভিযান শুরু করেছে। কেএসইউ-র সভাপতি রেমন্ড খারজিয়াংসহ তিনজন শীর্ষ নেতাকে গ্রেফতার করে মেঘালয় জনশৃঙ্খলা রক্ষা আইনে (এমএমপিও) ১৪ দিনের বিচারিক হেফাজতে পাঠানো হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিলংয়ে কেন্দ্রীয় বাহিনীর পাঁচটি অতিরিক্ত কোম্পানি, যার মধ্যে একটি র্যাফ ইউনিটও রয়েছে, মোতায়েন করা হয়েছে । মেঘালয় হাইকোর্ট এই ঘটনায় দ্রুত পদক্ষেপের নির্দেশ দিয়েছে, আদালত বলেছে যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং স্কুলছাত্রসহ বাসিন্দাদের বিপন্ন হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত গুরুতর ।
মুখ্যমন্ত্রীদের আলোচনা ও ট্রান্সপোর্ট সমিতির প্রতিক্রিয়া
সহিংসতার প্রেক্ষিতে অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা এবং মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড কে. সাংমা বৃহস্পতিবার ফোনে কথা বলেন এবং শান্তি ও স্বাভাবিকতা পুনরুদ্ধারে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে সম্মত হন। বিশ্বশর্মা জানান, অসমের সীমান্ত সুরক্ষা মন্ত্রী অতুল বরাকে মেঘালয় প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করে শান্তি নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ।
তবে এই আশ্বাস সত্ত্বেও অসম রাজ্য চালক সংগঠন (এএসডিএ) সন্তুষ্ট নয়। সংগঠনের সভাপতি ধ্রুবজ্যোতি দেবনাথ জানান, মেঘালয় থেকে আসা যানবাহন জোড়াবাটে আটকে দেওয়া হচ্ছে এবং শুধুমাত্র রোগী পরিবহনকারী গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্সকে যাতায়াতের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে, এমনকি মেঘালয় পুলিশের গাড়িকেও ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। সংগঠনটি ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির মালিক ও চালকদের জন্য মেঘালয় সরকারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে এবং বহিরাগতদের ওপর পুনঃপুনঃ হামলার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। অবরোধের জেরে জোড়াবাটে ১০ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়েছে, বহু পর্যটক ফিরে গেছেন এবং হোটেল-হোমস্টেতে বুকিং বাতিলের ঘটনাও ঘটেছে ।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির জন্য গুরুত্ব
এই অবরোধ ও উত্তেজনার প্রভাব সরাসরি গুয়াহাটি-শিলং করিডরে পড়লেও, বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দি জেলার বাসিন্দাদের জন্যও এটি প্রাসঙ্গিক। লালা টাউন ও আশপাশের এলাকা থেকে অনেক মানুষ শিক্ষা, চিকিৎসা বা কর্মসূত্রে মেঘালয় হয়ে যাতায়াত করেন, এবং শিলং দীর্ঘদিন ধরে বরাক উপত্যকার পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় গন্তব্য। যদি এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে বরাক উপত্যকা থেকে মেঘালয়গামী যাত্রী ও পর্যটন ব্যবসায়ীদেরও ভোগান্তির মুখে পড়তে হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় পরিবহন সংগঠন ও যাত্রীদের উচিত অসম পুলিশের হেল্পলাইন নম্বরগুলো হাতের কাছে রাখা, যাতে জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত সহায়তা পাওয়া যায়। একই সঙ্গে মেঘালয়গামী যাত্রার পরিকল্পনা থাকলে বর্তমান পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আগে বিকল্প ব্যবস্থার কথা বিবেচনা করাই বিচক্ষণতার পরিচয়।
সামনে কী অপেক্ষা করছে
মুখ্যমন্ত্রীদের সদিচ্ছা প্রকাশ সত্ত্বেও জোড়াবাট ও খানাপাড়ায় বাস্তব পরিস্থিতির পরিবর্তন এখনও দৃশ্যমান নয়। ক্যাব চালকদের অসন্তোষ, ক্ষতিপূরণের দাবি এবং প্রশাসনিক তরফে সরাসরি সংলাপের অভাব—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করলে বোঝা যায়, অবরোধ প্রত্যাহারের জন্য কেবল ফোনালাপ যথেষ্ট নয়, বরং সুনির্দিষ্ট ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ প্রয়োজন।
আগামী দিনগুলোতে অসম সরকার মেঘালয়ের সঙ্গে যে সমন্বয় প্রক্রিয়া শুরু করেছে, তার বাস্তব ফলাফল এবং ক্যাব সংগঠনগুলোর দাবি কতটা পূরণ হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে গুয়াহাটি-শিলং যাতায়াত কত দ্রুত স্বাভাবিক হয়। এই সময়ে অসমের হেল্পলাইন ব্যবস্থা আটকে পড়া মানুষদের জন্য সাময়িক স্বস্তির উৎস হলেও, প্রকৃত সমাধানের জন্য দুই রাজ্যের প্রশাসনের মধ্যে আরও কঠোর ও দৃশ্যমান সমন্বয় জরুরি।