অসম মেঘালয় শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছে বৃহস্পতিবার, শিলংয়ে সাম্প্রতিক সহিংসতার প্রেক্ষিতে দুই রাজ্যের মধ্যে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে। মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড কে. সাংমা অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার সঙ্গে ফোনে কথা বলেন ১৯ আগস্ট শিলংয়ে ঘটে যাওয়া সহিংসতা এবং তার প্রতিক্রিয়ায় উভয় রাজ্যের মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও যাতায়াত ব্যাহত হওয়া নিয়ে। দুই মুখ্যমন্ত্রীই পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে সম্মত হয়েছেন ।
সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ (পূর্বে টুইটার) সাংমা লেখেন, “আমরা সবসময়ের মতো পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে একসঙ্গে কাজ করতে সম্মত হয়েছি।” তিনি জানান, আলোচনা এগিয়ে নিতে অসম ও মেঘালয়ের মনোনীত মন্ত্রিসভার সদস্যরা বৈঠকে বসবেন এবং শান্তি, বিশ্বাস ও স্বাভাবিকতা পুনরুদ্ধারের উপায় খুঁজে বের করবেন ।
কী নিয়ে কথা হয়েছে দুই মুখ্যমন্ত্রীর মধ্যে
সাংমা জানান, হিমন্ত বিশ্বশর্মার সঙ্গে তার কথোপকথনে মূলত সহিংসতা এবং তার পরবর্তী প্রতিক্রিয়া “উভয় রাজ্যের সাধারণ মানুষ ও যাত্রীদের” ওপর কী প্রভাব ফেলেছে, তা নিয়েই আলোচনা হয়েছে। তিনি উভয় রাজ্যের মানুষকে শান্তি, সম্প্রীতি ও সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানান, একইসঙ্গে জোর দিয়ে বলেন যে অসম ও মেঘালয়ের মধ্যে গভীর ঐতিহাসিক ও জনসংযোগমূলক সম্পর্ক রয়েছে ।
জবাবে হিমন্ত বিশ্বশর্মা জানান, তিনিও শিলংয়ের সাম্প্রতিক ঘটনা, বিশেষ করে অসমের নম্বরপ্লেটযুক্ত গাড়িগুলোর ওপর হামলা নিয়ে অসমের উদ্বেগের কথা সাংমাকে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “অসম ও মেঘালয় ভগ্নী রাজ্য, যারা গভীর ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও জনসংযোগমূলক বন্ধনে আবদ্ধ।” তিনি আরও জানান, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংযম ও সংবেদনশীলতা নিয়েই এই ঘটনার প্রতিক্রিয়া জানানো উচিত এবং উভয় রাজ্যের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি, বন্ধুত্ব ও সদিচ্ছা বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি ।
দুই মন্ত্রীর নেতৃত্বে সমন্বয় প্রক্রিয়া
মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা জানান, তিনি অসমের সীমান্ত সুরক্ষা মন্ত্রী অতুল বরাকে মেঘালয় প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় সাধন করে শান্তি ও স্বাভাবিকতা পুনরুদ্ধারের কাজে নিয়োজিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। পূর্ব খাসি হিলস জেলার জেলাশাসক অভিলাষ বরনওয়াল নিশ্চিত করেছেন যে মেঘালয়ের উপমুখ্যমন্ত্রী স্নিয়াবলাং ধর এবং অসমের মন্ত্রী অতুল বরাকে দুই রাজ্যের সরকার যৌথভাবে এই সমন্বয়ের দায়িত্ব দিয়েছে ।
জেলাশাসক জানান, “উভয় রাজ্য থেকে একজন করে মন্ত্রিসভা স্তরের প্রতিনিধি নিয়োগ করা হয়েছে, যারা একে অপরের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে যাত্রীদের এই ধরনের অসুবিধা যাতে ভবিষ্যতে আর না হয়, তা নিশ্চিত করতে কাজ করবেন” । এই মনোনীত মন্ত্রিদ্বয়ের বৈঠক মূলত উত্তেজনা প্রশমন এবং দুই প্রতিবেশী রাজ্যের মধ্যে স্বাভাবিক যাতায়াত ও জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের ওপর কেন্দ্রীভূত থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে ।
দীর্ঘদিনের সীমান্ত সমস্যা ও পূর্ববর্তী উদ্যোগ
অসম ও মেঘালয়ের মধ্যে সীমান্ত বিরোধ দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা, যেখানে ১২টি চিহ্নিত বিরোধপূর্ণ এলাকা রয়েছে। এর মধ্যে ইতিমধ্যে ৬টি এলাকায় সমাধান হয়েছে, তবে বাকি ৬টি নিয়ে এখনও আলোচনা চলছে। ২০২২ সালের মার্চে দুই রাজ্যের মধ্যে ৬টি বিরোধপূর্ণ এলাকা নিয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল এবং সেই থেকে আঞ্চলিক কমিটিগুলো বাকি এলাকাগুলো নিয়ে সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে ।
এর আগেও একাধিকবার দুই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সীমান্তবর্তী উত্তেজনা প্রশমনে একসঙ্গে কাজ করেছেন। গত মে মাসে পশ্চিম জৈন্তিয়া হিলসের লাপাংগাপ এলাকায় উত্তেজনা দেখা দিলে দুই মুখ্যমন্ত্রী দিসপুরে সরাসরি বৈঠক করে সমাধানের পথ খুঁজেছিলেন। সাংমা তখন বলেছিলেন, “আমরা কিছু ব্যবস্থা তৈরি করেছি, যা পরিস্থিতি প্রশমিত করতে সাহায্য করবে” ।
জোড়াবাটে প্রতিবাদ ও চলমান উত্তেজনা
মুখ্যমন্ত্রীদের এই সমঝোতা সত্ত্বেও অসম-মেঘালয় সীমান্তবর্তী জোড়াবাট এলাকায় প্রতিবাদ অব্যাহত থাকায় উভয় রাজ্যের যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ এখনও কাটেনি। এই প্রতিবাদগুলো দুই রাজ্যের মধ্যে যাতায়াতকারী যাত্রী ও পরিবহন ব্যবসায়ীদের জন্য অতিরিক্ত অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। মেঘালয়ের প্রশাসন জানিয়েছে, শিগগিরই এই পরিস্থিতি সমাধানে দুই রাজ্যের মন্ত্রীদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে ।
মুখ্যমন্ত্রীদের এই উদ্যোগ সত্ত্বেও কেএসইউ-র (KSU) মিছিলের অনুমতি প্রশাসন কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে, যা নির্দেশ করে যে স্থানীয় পর্যায়ে উত্তেজনা এখনও পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি ।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির জন্য প্রাসঙ্গিকতা
অসম-মেঘালয় সম্পর্কের এই স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়া বরাক উপত্যকার বাসিন্দাদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের অনেক মানুষ কর্মসূত্রে, শিক্ষার জন্য বা পর্যটনের উদ্দেশ্যে শিলং যাতায়াত করেন। দুই রাজ্যের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমিত হলে এবং যাতায়াত স্বাভাবিক হলে তা বরাক উপত্যকার পরিবহন ব্যবসায়ী ও নিয়মিত যাত্রীদের জন্যও স্বস্তির খবর।
স্থানীয় পরিবহন সংগঠনগুলোর উচিত অসম ও মেঘালয়ের মনোনীত মন্ত্রীদের বৈঠকের অগ্রগতির দিকে নজর রাখা, যাতে ভবিষ্যতে মেঘালয়গামী যাত্রীদের নিরাপত্তা ও যাতায়াতের স্বাভাবিকতা নিশ্চিত করা যায়। দুই রাজ্যের মধ্যে দীর্ঘদিনের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকাই এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভবিষ্যতে কী প্রত্যাশিত
অসম ও মেঘালয়ের মনোনীত মন্ত্রীদ্বয়ের বৈঠক শীঘ্রই অনুষ্ঠিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যেখানে উভয় রাজ্যের মধ্যে যাতায়াত স্বাভাবিক করা এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হবে। দুই মুখ্যমন্ত্রীর এই সদিচ্ছা প্রকাশ ইতিবাচক হলেও, বাস্তবে পরিস্থিতি কতটা দ্রুত স্বাভাবিক হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে দুই রাজ্যের মধ্যে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ।
আগামী দিনগুলোতে জোড়াবাটের প্রতিবাদ প্রশমিত হয় কিনা এবং মন্ত্রীদ্বয়ের বৈঠক থেকে কোনো কার্যকর সমাধান বের হয় কিনা, তার দিকেই এখন নজর থাকবে উভয় রাজ্যের বাসিন্দাদের। অসম ও মেঘালয়ের দীর্ঘদিনের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে উভয় পক্ষের ধৈর্য ও সংযমী আচরণই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।