হাইলাকান্দি জেলার কিলারবক এলাকায় ধলেশ্বরী নদীর ভয়াবহ ভাঙনে অন্তত ১৫টি পরিবারের ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি বিপন্ন হয়ে পড়েছে, একই সাথে হুমকির মুখে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ রেল সেতু ও রেললাইন। কিলারবকের বাসিন্দারা ধলেশ্বরী নদীর ভাঙনে ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি ধ্বংস হওয়ার পর জরুরি সরকারি হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন, যেখানে ভাঙন একটি রেল সেতু ও রেলপথকেও হুমকির মুখে ফেলেছে । হাইলাকান্দি কিলারবক ভাঙন এই সমস্যা নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টির পর তা আরও গুরুতর আকার ধারণ করেছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা ও নিরাপত্তার জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রেললাইনের কাছে নতুন ফাটল, বাড়ছে উদ্বে
হাইলাকান্দি জেলার কিলারবকে ধলেশ্বরী নদী সেতুর কাছে একটি নতুন ফাটল দেখা দিয়েছে, যা দুই বছর আগে ভাঙনের পর মেরামত করা একটি অংশের কাছাকাছি অবস্থিত । স্থানীয় বাসিন্দারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে বর্ষার স্রোত বাঁধকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে। এই ফাটল কাটাখাল-বাইরাবি রেলপথে ইতিমধ্যে চলমান একটি সংকটের মধ্যেই দেখা দিয়েছে, যেখানে জামিরা ও বাইরাবির মধ্যবর্তী অংশে ভূমিধস ও মাটি ক্ষয়ের কারণে প্রায় ৭০ মিটার রেলপথ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং পরিষেবা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে হয়েছিল।
উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ে (এনএফআর) এর আগে জানিয়েছিল যে আবহাওয়া অনুকূল থাকলে তারা এক সপ্তাহের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। ১০ দিনের নিরলস প্রচেষ্টার পর ১২ সেপ্টেম্বর জামিরা-বাইরাবি অংশ পুনরুদ্ধার করা হয়েছিল এবং ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে পর্যায়ক্রমে ট্রেন পরিষেবা পুনরায় চালু করা হয়েছিল । তবে কিলারবকের এই নতুন ফাটল প্রমাণ করে যে সমগ্র এলাকা এখনও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
কিলারবকের ভাঙনের দীর্ঘমেয়াদি ইতিহাস
কিলারবক এলাকাটি হাইলাকান্দি শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে, আসাম-মিজোরাম সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত, এবং এই এলাকায় ধলেশ্বরী নদীর ভাঙন কোনো নতুন সমস্যা নয়। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে একই এলাকায় ২০০ মিটারেরও বেশি রেলপথ ধসে পড়েছিল এবং প্রায় ৫০টি ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গিয়েছিল, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল ।
সেই সময় ধলেশ্বরী নদীর জলস্তর না কমা পর্যন্ত পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি, এবং মিজোরামগামী যাত্রীদের জামিরা স্টেশনে নেমে সড়কপথে বাকি যাত্রা সম্পন্ন করতে হয়েছিল । হাইলাকান্দি জেলার বন্যা কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, ধলেশ্বরী ও কাটাখাল—এই দুটি নদীর তীরবর্তী এলাকায় প্রতি বছরই ভাঙন, বাঁধ ভাঙা ও প্লাবনের ঘটনা ঘটে, যা জেলার চারটি রাজস্ব সার্কেলেই ঘরবাড়ি ও কৃষিজমির ক্ষতি করে থাকে ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্দশা ও দাবি
কিলারবকের ১৫টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার তাদের ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে, যা তাদের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র উৎস। গ্রামীণ এই এলাকায় কৃষিকাজের উপর নির্ভরশীল পরিবারগুলির জন্য জমি হারানো মানে তাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত হওয়া। স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে সরকারের কাছে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ ও ভাঙন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে আসছেন, তবে বারবার আংশিক মেরামতির পরও সমস্যা পুনরাবৃত্ত হচ্ছে।
আসাম দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাইলাকান্দি জেলায় কাটাখাল নদীর তীরে থাকা স্লুইস গেটগুলির অনেকগুলি সঠিকভাবে কাজ করছে না, যা বন্যার ক্ষতি আরও জটিল করে তুলছে । লালা এলাকার নতুন বাজার থেকে হাইলাকান্দি শহরের কাছে বরইতলি পর্যন্ত কাটাখাল নদীর উভয় তীরে নতুন বাঁধ নির্মাণের একটি প্রস্তাবও প্রযুক্তিগত পরামর্শদাতা কমিটির (টিএসি) বৈঠকে উত্থাপনের কথা রয়েছে।
বরাক উপত্যকা ও মিজোরাম সংযোগের জন্য ঝুঁকি
কাটাখাল-বাইরাবি রেলপথ আসাম ও মিজোরামের মধ্যে একমাত্র রেল সংযোগ, এবং কিলারবক এলাকায় বারবার ভাঙনের ঘটনা এই গুরুত্বপূর্ণ সংযোগকে বারবার বিপর্যস্ত করছে। এই রেলপথ ব্যবহারকারী শিলচর, হাইলাকান্দি ও মিজোরামের যাত্রীদের জন্য প্রতিটি ভাঙনের ঘটনা মানে দীর্ঘ বিলম্ব, বিকল্প সড়কপথে যাত্রা এবং অতিরিক্ত খরচ। লালা টাউন ও হাইলাকান্দির বাসিন্দারাও এই রেলপথের উপর নির্ভরশীল, বিশেষত যারা মিজোরামে ব্যবসা বা পারিবারিক কাজে যাতায়াত করেন।
বারবার ভাঙনের এই চক্র থেকে স্পষ্ট হয় যে সাময়িক মেরামতির পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি প্রকৌশলগত সমাধান প্রয়োজন। ধলেশ্বরী নদীর গতিপ্রকৃতি ও তীরবর্তী মাটির ক্ষয়প্রবণতা বিবেচনা করে একটি টেকসই বাঁধ ব্যবস্থা তৈরি না হলে, কিলারবক এলাকা প্রতি বর্ষা মৌসুমেই একই সংকটের সম্মুখীন হতে থাকবে, যা রেল যোগাযোগ ও স্থানীয় জীবনযাত্রা উভয়কেই ক্রমাগত ঝুঁকিতে ফেলবে।
আগামী দিনের পদক্ষেপ ও প্রত্যাশা
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি অনুযায়ী, জেলা প্রশাসন ও জল সম্পদ বিভাগের কাছ থেকে এখন প্রয়োজন একটি দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে সহায়তা প্রদান করা যায় এবং ভবিষ্যতে আরও ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো যায়। এনএফআর কর্তৃপক্ষকেও রেল সেতু ও লাইনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কিলারবক এলাকায় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় শক্তিশালীকরণের কাজ চালিয়ে যেতে হবে।
হাইলাকান্দি জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা হলো ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জন্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা, পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ভাঙন প্রতিরোধ প্রকল্পের জন্য রাজ্য সরকারের কাছে জরুরি ভিত্তিতে অর্থ বরাদ্দের অনুরোধ জানানো। আগামী দিনগুলোতে প্রশাসন কীভাবে এই সংকট মোকাবিলা করে এবং কিলারবকের বাসিন্দারা কতটা দ্রুত সহায়তা পান, তার দিকেই এখন নজর থাকবে সমগ্র হাইলাকান্দি জেলার মানুষের।