ভারতের প্রথম সম্পূর্ণ Digital Census ২০২৭-এর প্রস্তুতিকে সুশৃঙ্খল ও সময়মতো সম্পন্ন করতে অসম সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিল। ২০২৬ সালের ২৫ মে গুয়াহাটির অসম প্রশাসনিক স্টাফ কলেজে রাজ্যের প্রিন্সিপাল সেন্সাস অফিসারদের (PCO) এক রাজ্যস্তরীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে জনগণনার প্রথম পর্যায় হাউসলিস্টিং ও হাউজিং সেন্সাসের কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হয়। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এই প্রথম জনগণনা সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে।
সম্মেলনে কারা ছিলেন, কী আলোচনা হল
অসমের মুখ্য সচিব রবি কোটার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ভারতের রেজিস্ট্রার জেনারেল ও সেন্সাস কমিশনার মৃত্যুঞ্জয় কুমার নারায়ণ, জেলা কমিশনার, পৌর কমিশনার এবং অসম সেন্সাস অপারেশনস অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সম্মেলনটি অসম সরকারের সাধারণ প্রশাসন বিভাগ এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন সেন্সাস অপারেশনস অধিদপ্তর যৌথভাবে আয়োজন করে।
মুখ্য সচিব রবি কোটা সম্মেলনে বলেন, জনগণনার মসৃণ পরিচালনার জন্য প্রশাসনিক সমন্বয়, জনঅংশগ্রহণ এবং সময়মতো প্রস্তুতি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। অসমের মুখ্য প্রিন্সিপাল সেন্সাস অফিসার অজয় তিওয়ারি সাংবাদিকদের বলেন, “এই সম্মেলনে জেলা কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা এবং আসন্ন জনগণনা কার্যক্রমে পারস্পরিক সমন্বয়ের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে।”
Digital Census ২০২৭ এরদুই পর্যায়ের সময়সূচি
Census ২০২৭ দুটি পর্যায়ে সম্পন্ন হবে। প্রথম পর্যায়ে হাউসলিস্টিং ও হাউজিং সেন্সাস ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সারা দেশে পরিচালিত হবে। অসমে এই পর্যায়টি ২১ আগস্ট থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত নির্ধারিত। প্রতিটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলকে এই ছয় মাসের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে ৩০ দিনব্যাপী হাউসলিস্টিং কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে।
দ্বিতীয় পর্যায়ে জনসংখ্যা গণনা (Population Enumeration) এবং জাতীয় জনসংখ্যা নিবন্ধন (NPR) হালনাগাদ করার কাজ ২০২৭ সালের ৯ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সম্পন্ন হবে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা ইতিমধ্যে এই জনগণনার জন্য ১১,৭১৮ কোটি টাকার বরাদ্দ অনুমোদন করেছে। এছাড়া প্রথমবারের মতো ১৯৩১ সালের পর জনগণনায় জাতিভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ করা হবে, যা এটিকে ঐতিহাসিকভাবে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
স্বতঃগণনা ও ডিজিটাল পদ্ধতি: কীভাবে কাজ করবে
Digital Census ২০২৭ -এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল স্বতঃগণনা (Self-Enumeration) সুবিধা। নাগরিকরা সরকারি পোর্টালের মাধ্যমে নিজেরাই তাদের তথ্য জমা দিতে পারবেন। হাউসলিস্টিং শুরুর ১৫ দিন আগে থেকে এই সুবিধা চালু থাকবে। মাঠ পর্যায়ের গণনাকারীরা Android ও iOS—উভয় প্ল্যাটফর্মে চলা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ ও আপলোড করবেন।
পুরো প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণের জন্য Census Management & Monitoring System (CMMS) নামে একটি বিশেষ পোর্টাল তৈরি করা হয়েছে। সারা দেশে প্রায় ৩০ লক্ষেরও বেশি মাঠকর্মী এই জনগণনায় অংশ নেবেন। কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ডেমোগ্রাফিক, শিক্ষা, অভিবাসন, প্রজনন এবং আর্থসামাজিক তথ্যসহ বিস্তারিত তথ্য এই পর্যায়ে সংগ্রহ করা হবে।
হাইলাকান্দিতে আগেই হয়েছিল প্রি-টেস্ট, লালা টাউনের জন্য প্রাসঙ্গিকতা
বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি জেলা ও লালা টাউনের বাসিন্দাদের জন্য এই খবর বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে ভারতের প্রথম Digital Census Pre-Test পরিচালনার জন্য সারা দেশে মাত্র তিনটি জেলা বেছে নেওয়া হয়েছিল — ডিব্রুগড়, পশ্চিম কার্বি আংলং এবং হাইলাকান্দি। হাইলাকান্দি রেভেনিউ সার্কেলের ৭টি গ্রামে ১০ থেকে ৩০ নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত এই Pre-Test পরিচালিত হয়। এর আগে ১ থেকে ৭ নভেম্বরের মধ্যে অনলাইন Self-Enumeration-এর পরীক্ষামূলক কার্যক্রমও এই জেলায় সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
এর অর্থ হল, জাতীয়ভাবে ডিজিটাল জনগণনার পথিকৃৎ জেলাগুলির মধ্যে হাইলাকান্দির নাম রয়েছে। লালা টাউন ও আশপাশের এলাকার মানুষ এর আগেই এই ডিজিটাল পদ্ধতির সঙ্গে কিছুটা পরিচিত হয়েছেন। আসন্ন মূল গণনার সময় স্থানীয়দের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সচেতনতামূলক প্রচারণাও চালানো হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভারতের স্বাধীনতার পর থেকে জনগণনা দশ বছর অন্তর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কার্যক্রম হিসেবে পরিচালিত হয়ে আসছে। কিন্তু COVID-১৯ মহামারির কারণে ২০২১ সালের নির্ধারিত জনগণনা স্থগিত হয়ে যায় এবং প্রায় ছয় বছর পর ২০২৭ সালে তা পরিচালিত হতে চলেছে। এই দীর্ঘ বিরতির পর ডিজিটাল মাধ্যমে পরিচালিত এই জনগণনা দেশের প্রশাসনিক পরিকল্পনা, নীতি নির্ধারণ, বাজেট বরাদ্দ এবং কল্যাণমূলক কর্মসূচির জন্য অপরিহার্য তথ্যভান্ডার তৈরি করবে।
অসমে মূল কার্যক্রম শুরুর আগে জেলা কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, মাঠকর্মী নিয়োগ এবং জনসচেতনতামূলক প্রচারণা আরও জোরদার করা হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সফলভাবে ডিজিটাল জনগণনা সম্পন্ন করতে পারলে ভবিষ্যতে সরকারি তথ্য সংগ্রহের পুরো পদ্ধতিতেই একটি আমূল পরিবর্তন আসবে। Digital Census ২০২৭ -এর সফল বাস্তবায়ন দেশের প্রশাসনিক কার্যক্রমকে আরও স্বচ্ছ, দ্রুত ও কার্যকর করবে।