মহিলা সংরক্ষণ বিল লোকসভায় পরাজিত হয়েছে — শুক্রবার ১৭ এপ্রিল সংসদের বিশেষ অধিবেশনে ঘটা এই ঘটনায় সারা দেশে রাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে উঠেছে। সংবিধান (১৩১তম সংশোধনী) বিল, ২০২৬ — যা ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে থেকে সংসদ ও রাজ্য বিধানসভায় মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা কার্যকর করার জন্য আনা হয়েছিল — সেটি পাস হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ব্যর্থ হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা কড়া ভাষায় Congress-নেতৃত্বাধীন বিরোধীদের আক্রমণ করেছেন এবং এই দিনটিকে ভারতীয় নারীদের জন্য “কালো দিন” বলে আখ্যা দিয়েছেন।
ভোটের হিসাব: কেন পাস হলো না বিলটি
লোকসভায় মহিলা সংরক্ষণ বিল লোকসভায় পরাজিত হওয়ার পেছনে রয়েছে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। সংবিধান সংশোধনী বিল পাস করাতে হলে উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন। শুক্রবারের ভোটে মোট ৫২৮ জন সদস্য ভোট দেন — তার মধ্যে ২৯৮ জন বিলের পক্ষে এবং ২৩০ জন বিপক্ষে ভোট দেন। পক্ষে বেশি ভোট পড়েছে, কিন্তু তবুও বিলটি পাস হলো না — কারণ প্রয়োজনীয় সীমা ছিল ৩৫২ ভোট। লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা ফলাফল ঘোষণা করে বলেন: “সংবিধান (১৩১তম সংশোধনী) বিলটি পাস হয়নি কারণ ভোটে এটি প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি।”
বিলটির বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলোর প্রধান আপত্তি ছিল — সংরক্ষণটিকে সীমানা নির্ধারণ (Delimitation) প্রক্রিয়া ও জনগণনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বিলে লোকসভার আসন সংখ্যা বর্তমানের ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে ৮১৬ পর্যন্ত করার কথা বলা হয়েছিল, যা ২০১১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে হবে। সংসদীয় বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বলেন, বিরোধী দলগুলো একটি ঐতিহাসিক সুযোগ নষ্ট করেছে। অন্যদিকে Congress নেতা রাহুল গান্ধী দাবি করেন, বিলটি মহিলাদের ক্ষমতায়নের সঙ্গে নয়, বরং ভারতের নির্বাচনী মানচিত্র পরিবর্তনের চেষ্টার সঙ্গে সম্পর্কিত।
হিমন্তের তীব্র প্রতিক্রিয়া ও BJP-র পাল্টা আক্রমণ
মহিলা সংরক্ষণ বিল লোকসভায় পরাজিত হওয়ার খবরে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা একটি পোস্ট করেন এবং এই দিনটিকে “কালো দিন” আখ্যা দিয়ে বিরোধী দলকে “মহিলাবিরোধী” বলে চিহ্নিত করেন। তিনি অভিযোগ করেন, বিলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া বিরোধীরা প্রমাণ করেছে যে তারা মহিলাদের বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব চান না।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বিলের উপর দীর্ঘ বিতর্কে জবাব দিতে উঠে বিরোধীদের কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন এবং বলেন: “পরবর্তী নির্বাচনে তারা মহিলাদের রোষের সম্মুখীন হবে।” BJP তার বিবৃতিতে বিরোধীদের বিরুদ্ধে “৭০ কোটি মহিলার বিরুদ্ধে গুরুতর বিশ্বাসঘাতকতা” করার অভিযোগ এনেছে। বিলটি পরাজিত হওয়ার পর NDA জোটের মহিলা সাংসদরা সংসদ চত্বরে বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
বিরোধীদের যুক্তি ও Delimitation বিতর্ক
বিরোধী INDIA জোটের পক্ষ থেকে বলা হয়, তারা মহিলা সংরক্ষণের বিরুদ্ধে নয় — বরং Delimitation-এর সঙ্গে সংরক্ষণ জুড়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে। PRS India-র বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৭ সালের জনগণনা ভিত্তিক Delimitation ২০২৯ নির্বাচনের আগে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই — কারণ সর্বশেষ Delimitation কমিশন ২০০২ সালে গঠিত হয়ে তার আদেশ চূড়ান্ত করতে ২০০৮ সাল পর্যন্ত লেগেছিল। ফলে বিরোধীরা মনে করছেন, সংরক্ষণকে Delimitation-এর সঙ্গে যুক্ত করলে ২০২৯ সালেও মহিলা সংরক্ষণ কার্যকর নাও হতে পারে।
Congress নেতা গৌরব গগৈ বলেন: “আমি বিশ্বাস করি যদি প্রধানমন্ত্রী মোদি ও BJP সরকার Delimitation বা জনগণনার শর্ত ছাড়া একটি সহজ মহিলা সংরক্ষণ বিল এনেছিলেন, তাহলে মহিলা সংরক্ষণ অনেক এগিয়ে যেত।” দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলো, বিশেষত DMK, উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে Delimitation-এর ফলে জনসংখ্যায় কম বৃদ্ধিপ্রাপ্ত দক্ষিণী রাজ্যগুলো সংসদে তাদের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব হারাবে।
আসাম ও বরাক উপত্যকায় এই বিলের প্রাসঙ্গিকতা
মহিলা সংরক্ষণ বিল লোকসভায় পরাজিত হওয়া আসাম ও বরাক উপত্যকার রাজনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলে। আসামের বর্তমান লোকসভা আসন ১৪টি — Delimitation হলে সেই সংখ্যা পরিবর্তন হতে পারত। হাইলাকান্দি লোকসভা আসনে বরাক উপত্যকার বাঙালি, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের ভোটার রয়েছেন — সীমানা পুনর্নির্ধারণে এই প্রতিনিধিত্ব কীভাবে পরিবর্তিত হত, তা নিয়ে এখানেও বিতর্ক ছিল। বরাক উপত্যকার কংগ্রেস ও বিরোধী নেতারা বলছেন, তারা মহিলা সংরক্ষণের পক্ষে কিন্তু Delimitation ছাড়া তা বাস্তবায়ন চান — এই অবস্থান কেন্দ্রীয় কংগ্রেসের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।
২০২৩ সালে পাস হওয়া মূল নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম — যা মহিলা সংরক্ষণ আইন হিসেবে পরিচিত — জনগণনা ও Delimitation শেষ হওয়ার পরই কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। এই নতুন বিলে সেই প্রক্রিয়াকে ২০২৯ সালের নির্বাচনের আগে সম্পন্ন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। বিলটি পাস না হওয়ায় ২০২৯ সালের নির্বাচনে মহিলা সংরক্ষণ কার্যকর হওয়ার পথ এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। আগামী দিনে সরকার নতুন কোনো পদক্ষেপ নেবে কিনা, বিরোধীরা Delimitation-মুক্ত সংরক্ষণ বিলের প্রস্তাব দেবে কিনা — এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখন সংসদের পরবর্তী অধিবেশন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।