রাশিয়ান তেল নিষেধাজ্ঞায় ভারতে প্রভাব এখন সরাসরি অনুভূত হতে শুরু করবে। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বুধবার ঘোষণা দিলেন যে রাশিয়ান তেল কেনার ক্ষেত্রে যে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা-ছাড় দেওয়া হয়েছিল, সেটি আর নবায়ন করা হবে না। একই সাথে ইরানি তেল কেনার ক্ষেত্রেও ছাড়ের মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে ১৯ এপ্রিল। এই সিদ্ধান্ত ভারতের জ্বালানি কৌশলে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে — কারণ দেশটি ক্রুড তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানি করে এবং হরমুজ প্রণালীর ব্যাঘাতে ইতিমধ্যে সরবরাহ-শৃঙ্খল চাপে রয়েছে।
ছাড়টি কেন দেওয়া হয়েছিল এবং কতটুকু সুবিধা পেল ভারত?
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল ইরানে যৌথ বিমান হামলা চালানোর পর থেকে পরিস্থিতি বদলে যায়। ইরান পাল্টা পদক্ষেপ নিয়ে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে কার্যত বাধা তৈরি করে — যে পথ দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ হয়। এই সংকটের মুখে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ৫ মার্চ একটি অস্থায়ী ৩০-দিনের ছাড় ঘোষণা করে — শুধুমাত্র সমুদ্রে আটকে থাকা রাশিয়ান তেল ভারতীয় বন্দরে আনার অনুমতি দেওয়া হয়। ট্রেজারি সেক্রেটারি বেসেন্ট তখন স্পষ্ট বলেছিলেন, “এটি ইচ্ছাকৃতভাবে স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থা — রাশিয়ার সরকারকে আর্থিকভাবে সুবিধা দেওয়ার জন্য নয়, শুধুমাত্র সমুদ্রে আটকে থাকা তেলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।”
এই ছাড়ের সুযোগে ভারতীয় পরিশোধনাগারগুলো দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। সব মিলিয়ে প্রায় ৬ কোটি ব্যারেল রাশিয়ান ক্রুড তেলের অর্ডার দেওয়া হয়। ইরানি তেলের ক্ষেত্রেও প্রায় ৪০ লক্ষ ব্যারেল আনা হয় — যা প্রায় সাত বছরে প্রথম ইরানি তেল আমদানি। ব্লুমবার্গের জাহাজ-ট্র্যাকিং তথ্য অনুযায়ী, ‘জয়া’ নামের ট্যাংকার পূর্ব উপকূলের পারাদিপে এবং ‘ফেলিসিটি’ পশ্চিম উপকূলের সিক্কায় ইরানি তেল খালাস করে — উভয় ট্যাংকারই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিল। তেল কোম্পানিগুলোর মার্চ মাসে রাশিয়া থেকে ক্রুড আমদানির মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৬২০ কোটি ডলার — যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল মাত্র ১৬০ কোটি ডলার, অর্থাৎ চারগুণ বৃদ্ধি।
ছাড় শেষে ভারতের সামনে কোন পথ খোলা?
রাশিয়ান তেল নিষেধাজ্ঞায় ভারতে প্রভাব এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হল — সরবরাহ কোথা থেকে আসবে? মার্কিন বেসেন্ট সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন: “আমরা যে দেশগুলো ইরানি তেল কিনছে তাদের জানিয়ে দিয়েছি — ইরানের অর্থ যদি আপনাদের ব্যাংকে থাকে, আমরা এখন সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে প্রস্তুত।” এই পরিপ্রেক্ষিতে ভারতকে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের বিকল্প উৎসে মনোযোগ বাড়াতে হবে।
তবে সুখের খবর হল — ভারত ইতিমধ্যে বিকল্প পথে কাজ শুরু করেছে। বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্সে স্পষ্ট বলেছিলেন যে ভারতীয় তেল কোম্পানিগুলো প্রাপ্যতা, মূল্য ও ঝুঁকি বিবেচনা করে নিজেদের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেবে। বর্তমানে ভারত ৪১টিরও বেশি দেশ থেকে তেল আমদানি করে — যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, সৌদি আরব, ইরাক সহ আটলান্টিক বেসিনের একাধিক উৎস থেকে। ২০২৬ সালে মাত্র ৪০ শতাংশ তেল হরমুজের পথে আসছে, বাকি ৬০ শতাংশ বিকল্প রুটে — এটি গত এক দশকে ভারতের কৌশলগত বৈচিত্র্যায়নের ফল।
দ্রিষ্টি আইএএস-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারতের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম সঞ্চয় বর্তমানে মাত্র ৯-১০ দিনের চাহিদা মেটাতে পারে — আন্তর্জাতিক মানদণ্ড যেখানে ৯০ দিন। এই ঘাটতি পূরণে সরকার ওডিশার চণ্ডীখোলে ৪০ লক্ষ মেট্রিক টন এবং কর্ণাটকের পাদুরে আরও ২৫ লক্ষ মেট্রিক টন ক্ষমতার নতুন মজুত ভাণ্ডার নির্মাণ করছে।
লালা ও হাইলাকান্দিতে জ্বালানির দামে চাপ
রাশিয়ান তেল নিষেধাজ্ঞায় ভারতে প্রভাব শুধু কাগজে-কলমের অর্থনীতির বিষয় নয় — লালা ও হাইলাকান্দির সাধারণ মানুষও এর প্রত্যক্ষ প্রভাব অনুভব করছেন। হরমুজ প্রণালীর সংকট শুরুর পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১৯ ডলারে উঠেছিল এবং পরে আপেক্ষিক স্থিতিশীলতায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি রয়েছে। Kpler-এর গবেষক সুমিত রিটোলিয়া BBC-কে জানিয়েছেন, “এই ছাড় ভারতের মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলের উপর কাঠামোগত নির্ভরশীলতাকে মৌলিকভাবে বদলায় না।”
হরমুজ সংকটের কারণে লালা ও আসামের বাজারে ইতিমধ্যে পরিবহন খরচ বেড়েছে — কারণ ডিজেলের দাম বাড়লে ট্রাক ভাড়া, নৌকা পরিবহন এবং চাষাবাদের যন্ত্রপাতির চালানো খরচও বাড়ে। অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন যে যদি হরমুজের স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল আরও তিন মাসের বেশি বিলম্বিত হয়, তাহলে বিশ্বব্যাপী তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১৩২ ডলারে পৌঁছাতে পারে। বাস্তবতা হল, ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পরেও হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল এখনও স্বাভাবিক হয়নি।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা-ছাড়ের মেয়াদ শেষ হওয়া এবং হরমুজের অনিশ্চয়তা — এই দুটি বিষয়ের সমন্বয়ে ভারতের জ্বালানি কৌশল এখন নতুন পরীক্ষার মুখে। সরকার পরিস্থিতি সামলাতে সক্রিয় হলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, পরবর্তী কয়েক মাসে দেশের ভেতরে জ্বালানির দামের উপর চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে পারমাণবিক শক্তি, সবুজ হাইড্রোজেন এবং নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে আমদানি নির্ভরতা কমানোর পথেই ভারতের টেকসই সমাধান নিহিত বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।