আসামের দুই প্রজন্মের শিশুদের প্রিয় ম্যাগাজিন মৌচাক এবং নতুন আবিষ্কার এখন থেকে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের পাঠক ও গবেষকদের কাছে সহজলভ্য হবে। ২৫ মে, ২০২৬ তারিখে আসামের মন্ত্রী বিমল বরা জানান, এই দুই ঐতিহ্যবাহী অসমীয়া শিশু ম্যাগাজিন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল আর্কাইভে স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। মৌচাক নতুন আবিষ্কার ডিজিটাল আর্কাইভে যুক্ত হওয়ার এই পদক্ষেপকে আসামের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে মনে করছেন সংস্কৃতি ও সাহিত্য অঙ্গনের মানুষজন।
মন্ত্রী বিমল বরা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম X-এ (সাবেক টুইটার) একটি পোস্টের মাধ্যমে এই খবর জানান। তিনি লেখেন, “মৌচাক ও নতুন আবিষ্কার — প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আসামের শিশুদের মন গড়ে দেওয়া এই ম্যাগাজিনগুলি এখন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল আর্কাইভে স্থান পেয়েছে। আমাদের গল্প, আমাদের ভাষা, আমাদের কল্পনার জগৎ — সবই এখন বিশ্বের জন্য সংরক্ষিত।” তাঁর এই ঘোষণা সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
মৌচাক ও নতুন আবিষ্কার — আসামের শিশু সাহিত্যের দুই স্তম্ভ
মৌচাক এবং নতুন আবিষ্কার দীর্ঘকাল ধরে অসমীয়া শিশু সাহিত্যের কেন্দ্রে রয়েছে। এই দুটি ম্যাগাজিন আসামের শিশুদের সাহিত্য, বিজ্ঞান, কল্পনাশক্তি ও গল্প বলার শিল্পের সঙ্গে পরিচিত করে এসেছে। বহু প্রজন্ম ধরে শহর-গ্রাম নির্বিশেষে আসামের অগণিত শিশু এই ম্যাগাজিনের মাধ্যমে তাদের পাঠজীবন শুরু করেছে।
মৌচাক মূলত সাহিত্যনির্ভর — গল্প, কবিতা, রম্যরচনা ও নানা বিষয়ের নিবন্ধে সমৃদ্ধ। অন্যদিকে নতুন আবিষ্কার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে শিশুদের বোধগম্য ভাষায় উপস্থাপন করার জন্য পরিচিত। দ্য সেন্টিনেল আসামের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই দুটি প্রকাশনা অসমীয়া ভাষার শিশু সাহিত্যে একটি অনন্য ও স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে। এই ঐতিহ্যই এখন ডিজিটাল পরিসরে চিরস্থায়ী রূপ পেল।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল আর্কাইভে সংরক্ষণের তাৎপর্য
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে একটি এবং তাদের ডিজিটাল আর্কাইভ সারা বিশ্বের বিরল ও মূল্যবান প্রকাশনা সংরক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এই আর্কাইভে স্থান পাওয়ার অর্থ হলো, মৌচাক নতুন আবিষ্কার ডিজিটাল আর্কাইভ থেকে এখন থেকে যেকোনো গবেষক, ছাত্র বা সাহিত্যপ্রেমী অনলাইনে এই ম্যাগাজিনগুলির পাতা উল্টাতে পারবেন।
মন্ত্রী বিমল বরার মতে, এই সংরক্ষণ কেবল কাগজের পাতা টিকিয়ে রাখা নয়, বরং অসমীয়া ভাষা, শিশু সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার সুযোগ। ইন্ডিয়া টুডে নর্থইস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ডিজিটাল সংরক্ষণ ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে আসামের শিশু সাহিত্যের উত্তরাধিকার পৌঁছে দেবে এবং দেশে-বিদেশে গবেষণার নতুন দরজা খুলবে।
বারাক উপত্যকা ও আসামের শিশু সাহিত্য সংরক্ষণে এই উদ্যোগের প্রাসঙ্গিকতা
হাইলাকান্দি জেলা সহ বারাক উপত্যকার বাংলাভাষী অঞ্চলে অসমীয়া শিশু সাহিত্য সরাসরি পঠিত না হলেও, এই ধরনের ডিজিটাল সংরক্ষণের প্রবণতা সমগ্র আসামের সাহিত্য ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ায়। লালা টাউনসহ হাইলাকান্দির স্কুল-কলেজের শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীরা এই আর্কাইভ ব্যবহার করে উত্তর-পূর্ব ভারতের শিশু সাহিত্যের বিস্তার ও বৈচিত্র্য সম্পর্কে গবেষণা ও প্রকল্পকাজ করতে পারবেন।
স্থানীয় শিক্ষক মহলের মতে, এই ধরনের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ বারাক উপত্যকার বাংলা শিশু সাহিত্যকেও ডিজিটাল আর্কাইভে তুলে আনার অনুপ্রেরণা দেয়। অনেক শিক্ষার্থীই জানেন না যে তাঁদের পাশের রাজ্যের শিশু ম্যাগাজিন এখন ক্যালিফোর্নিয়ার মতো বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত। এটি আঞ্চলিক সাহিত্যের প্রতি গর্বের একটি নতুন উপলব্ধি তৈরি করতে পারে।
ভবিষ্যতের পথ — আসামের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ডিজিটাল যাত্রা
এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে আসামের অন্যান্য ঐতিহাসিক প্রকাশনাকেও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষণের পথ খুলে দিতে পারে। মৌচাক নতুন আবিষ্কার ডিজিটাল আর্কাইভে স্থান পাওয়ার পর এখন প্রশ্ন উঠছে, আসামের আরও কত মূল্যবান সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক নথি হারিয়ে যাওয়ার আগেই ডিজিটাল রূপ পেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকারি উদ্যোগ ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন ভাষার শিশু সাহিত্য, লোকসাহিত্য ও পত্রিকাগুলিও একইভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব। মন্ত্রী বিমল বরার ঘোষণা আসামের সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার একটি সূচনা মাত্র — সামনের দিনগুলিতে এই যাত্রা আরও বিস্তৃত হবে বলে আশা করা যায়।