কাছাড় ও ডিমা হাসাও সীমান্তবর্তী অংশে শিলচর-হাফলং সড়ক-এ বড় ভূমিধসের কারণে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বারাক বুলেটিন ও অন্যান্য স্থানীয় সূত্রে বলা হয়েছে, প্রবল বৃষ্টির পর পাহাড়ের মাটি ও পাথর ধসে পড়ে সড়কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বন্ধ হয়ে যায়। পরে কিছুটা মাটি সরিয়ে ছোট গাড়ির চলাচল আংশিকভাবে শুরু করা হলেও পণ্যবাহী যানবাহনের জন্য রাস্তাটি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
এই শিলচর-হাফলং সড়ক-এ ভূমিধসের ঘটনাটি নতুন নয়। বর্ষা এলেই পাহাড়ি ঢালের দুর্বল অংশগুলো বারবার বিপদ তৈরি করে। স্থানীয়দের মতে, এই সড়কে একবার বড় ধস নামলে শুধু যাত্রী নয়, ওষুধ, খাদ্যপণ্য, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সরবরাহও বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে দুর্গম পাহাড়ি অংশের পাশাপাশি শিলচর শহরের বাজার ও আশপাশের অঞ্চলেও চাপ পড়ে।
কোথায় থেমে গেল চলাচল
খবরে বলা হয়েছে, ভূমিধসটি মূলত দুরবিন টিলার কাছাকাছি ঘটেছে, যা শিলচর-হাফলং সড়ক-এর একটি ঝুঁকিপূর্ণ অংশ হিসেবে পরিচিত। প্রাথমিকভাবে রাস্তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। পরে কিছুটা মাটি সরানোর পর ছোট যানবাহনের জন্য সীমিত চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়। তবে ভারী ট্রাক, লরি এবং মালবাহী গাড়ি চলাচল এখনো কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে। এতে যাত্রীবাহী বাস, পণ্য পরিবহন এবং দৈনন্দিন যাতায়াতে সমস্যা তৈরি হয়েছে।
এই রুটে ২০২২ সালেও ভয়াবহ ভূমিধসের কারণে কয়েক ঘণ্টা থেকে একাধিক দিন পর্যন্ত ট্রাফিক থেমে গিয়েছিল। পাহাড়ি এলাকায় টানা বৃষ্টি হলে একই ধরনের পরিস্থিতি বারবার ফিরে আসছে। স্থানীয় প্রশাসন ও সড়ক কর্তৃপক্ষ আগেভাগে প্রস্তুতি না নিলে, প্রতি বর্ষাতেই এমন ভোগান্তি দেখা দেবে বলে বাসিন্দাদের অভিযোগ।
কেন এই সড়ক এত গুরুত্বপূর্ণ
শিলচর-হাফলং সড়ক শুধু দুই শহরকে যুক্ত করে না, এটি দক্ষিণ আসামের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথ। সিলেটি সীমান্তঘেঁষা এই অঞ্চলে রোগী পরিবহন, স্কুল-কলেজের যাতায়াত, কৃষিপণ্য আনা-নেওয়া, পর্যটন এবং বাণিজ্য—সবকিছুর উপর এই সড়কের প্রভাব রয়েছে। ফলে সামান্য ভূমিধসও স্থানীয় অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনে বড় ধাক্কা দেয়।
দুর্গম পাহাড়ি সড়কে ভূমিধস ঘটলে সবচেয়ে আগে ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ যাত্রী ও ছোট ব্যবসায়ীরা। হাফলংয়ের দিকে যাওয়া বহু মানুষকে মাঝপথে নেমে হেঁটে যেতে হয়, আবার শিলচরের দিক থেকেও যানজট তৈরি হয়। ফলে এই সড়কের সংস্কার, ঢাল মজবুতকরণ এবং নিকাশিনালা উন্নয়ন এখন খুবই জরুরি। স্থানীয়দের মতে, শুধুমাত্র ধস সরিয়ে ফেললেই চলবে না; প্রতিরোধমূলক কাজও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ভূমিধসের পেছনের কারণ
এই শিলচর-হাফলং সড়ক-এ ভূমিধসের সবচেয়ে বড় কারণ প্রবল বৃষ্টি হলেও একে শুধু প্রাকৃতিক ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। পাহাড় কাটা, নিকাশির দুর্বলতা, ঢালের দুর্বল স্থিতিশীলতা এবং মাটি সরে যাওয়ার ঝুঁকি—সব মিলিয়ে এই সড়কটি দীর্ঘদিন ধরেই বিপজ্জনক। বৃষ্টি শুরু হলেই এই সমস্যা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
একই ধরনের ঝুঁকি আগেও দেখা গিয়েছিল। ২০২৫ সালে ডিমা হাসাওয়ের কয়েকটি অংশে বড় ভূমিধসের পর জেলা প্রশাসন সড়কে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করেছিল। তখনও জনস্বার্থে রাস্তা খোলা-বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। এই ধারাবাহিকতা দেখাচ্ছে যে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া কেবল জরুরি পরিষ্কারের ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়।
স্থানীয় মানুষের ভোগান্তি
কাছাড়, শিলচর এবং হাফলংয়ের মানুষ এই শিলচর-হাফলং সড়ক-এর ওপর নানাভাবে নির্ভরশীল। রোগী, ছাত্রছাত্রী, ব্যবসায়ী, পর্যটক—সবার জন্যই এই রুট গুরুত্বপূর্ণ। ভূমিধসের পর অনেক সময় অ্যাম্বুলেন্সও আটকে যায়, ফলে জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়ে। আবার বাজারে পণ্য পৌঁছাতে দেরি হলে দামও প্রভাবিত হতে পারে।
লালাবাজার, হাইলাকান্দি ও আশপাশের এলাকার পাঠকেরাও জানেন, বর্ষাকালে পাহাড়ি পথের এই ধরনের বিঘ্ন কেবল দূরের ঘটনা নয়। বরাক উপত্যকার সামগ্রিক যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক আছে। তাই এমন ধস স্থানীয় জীবনে এক ধরণের অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
এখন কী হতে পারে
এখন সবার নজর থাকবে রাস্তা পুরোপুরি কবে খুলবে এবং পণ্যবাহী যানবাহন কবে স্বাভাবিকভাবে চলতে পারবে। প্রশাসন যদি দ্রুত মাটি সরিয়ে, ঢাল মজবুত করে এবং ঝুঁকিপূর্ণ অংশে নজরদারি বাড়ায়, তাহলে ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব। তবে দীর্ঘমেয়াদে শিলচর-হাফলং সড়ক-এর স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে প্রকৌশলগত কাজই আসল সমাধান।
সব মিলিয়ে, এই ভূমিধস শুধু একটি রাস্তা বন্ধ হওয়ার খবর নয়; এটি পাহাড়ি অবকাঠামোর দুর্বলতা, বৃষ্টিজনিত ঝুঁকি এবং বরাক উপত্যকার যোগাযোগ সংকটকে আবার সামনে এনে দিয়েছে। যথাযথ প্রস্তুতি ও স্থায়ী সমাধান ছাড়া এমন ভোগান্তি প্রতি বর্ষাতেই ফিরে আসতে পারে।