আন্দামান সাগরে একটি অভিবাসী নৌকা ডুবিতে ২৫০ জনেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ হয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মালয়েশিয়াগামী এই অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই ট্রলারটি ৯ এপ্রিল ২০২৬ আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি সমুদ্রে ডুবে যায়। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা UNHCR এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা IOM ১৪ এপ্রিল এই বিপর্যয়ের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে। বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড (BCG) মাত্র ৯ জনকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে — বাকিদের ভাগ্য এখনো অজানা।
৩৬ ঘণ্টা সমুদ্রে ভেসে: বেঁচে ফেরা যাত্রীর বিবরণ
এই ভয়াবহ অভিবাসী নৌকা ডুবির ঘটনায় বেঁচে ফেরা মাত্র ৯ জনের মধ্যে অন্যতম ৪০ বছর বয়সী রফিকুল ইসলাম। Al Jazeera-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, মানব পাচারকারীরা তাঁকে মালয়েশিয়ায় ভালো কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই ট্রলারে তুলেছিল। ট্রলারের ভেতরের পরিস্থিতি ছিল মর্মান্তিক — যাত্রীদের অনেককে সংকীর্ণ হোল্ডে গাদাগাদি করে রাখা হয়েছিল, যেখানে অক্সিজেনের অভাবে কিছু মানুষ ট্রলার ডোবার আগেই মারা যান। রফিকুল ইসলাম জানান, ট্রলার থেকে তেল চুঁইয়ে তাঁর শরীর পুড়ে গিয়েছিল।
রফিকুলের ভাষায়, ট্রলার ডুবে যাওয়ার পর তিনি একটি ড্রামের সাহায্যে ভাসতে ভাসতে প্রায় ৩৬ ঘণ্টা সমুদ্রে কাটান। পানীয় জল নেই, খাবার নেই, শুধু অসহ্য রোদ আর অথৈ সমুদ্র। এই দীর্ঘ সময় পর বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের একটি জাহাজ তাঁদের দেখতে পায় এবং উদ্ধার করে। BCG মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজান AFP-কে জানান, “আমাদের ক্রু আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছে গভীর সমুদ্রে ড্রাম ও লগ ব্যবহার করে ভাসমান কিছু মানুষকে দেখে তাদের উদ্ধার করে।” উদ্ধার পাওয়া ৯ জনের মধ্যে ৬ জন বাংলাদেশি এবং ৩ জন রোহিঙ্গা।
কোথা থেকে এলেন এই যাত্রীরা, কীভাবে হল এই বিপর্যয়?
অভিবাসী নৌকা ডুবির এই ঘটনার পেছনে রয়েছে একটি সুসংগঠিত মানব পাচারের নেটওয়ার্ক। বেঁচে ফেরা যাত্রীদের বিবরণ এবং তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, ট্রলারটি ৪ এপ্রিল বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার ইনানি সমুদ্রসৈকত সংলগ্ন এলাকা থেকে ছোট ছোট নৌকায় যাত্রী সংগ্রহ করে এবং ‘তাঞ্জিনা সুলতানা’ নামের বড় ট্রলারে স্থানান্তর করে। সেই ট্রলারে আনুমানিক ২৭০ থেকে ২৮০ জন যাত্রী ছিলেন — ক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি। UNHCR জানিয়েছে, “প্রবল বাতাস, উত্তাল সমুদ্র এবং অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই”-এর সম্মিলিত চাপে ট্রলারটি ডুবে যায়। বেঁচে থাকা যাত্রীদের অনুমান, ট্রলার ডোবার আগেই হোল্ডের ভেতরে ২৫ থেকে ৩০ জন মারা গিয়েছিলেন।
এই ট্রলারে যাঁরা ছিলেন তাঁদের অধিকাংশই মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলিম সম্প্রদায় এবং বাংলাদেশের দরিদ্র অভিবাসী। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির মধ্যে চলমান সংঘর্ষ পরিস্থিতির অবনতি ঘটার পর থেকে রোহিঙ্গাদের সমুদ্রপথে পালানোর প্রবণতা বেড়েছে। বাংলাদেশের কক্সবাজারে ১০ লক্ষেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী গাদাগাদি করে শিবিরে বাস করছেন — কোনো স্থায়ী ভবিষ্যৎ নেই, কোনো কাজের সুযোগ নেই। এই মরিয়া পরিস্থিতিই মানব পাচারকারীদের ব্যবসার জমি তৈরি করে দিচ্ছে।
UNHCR ও IOM-এর প্রতিক্রিয়া: “স্থায়ী সমাধান চাই”
UNHCR এবং IOM এই অভিবাসী নৌকা ডুবির ঘটনাকে “দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি এবং স্থায়ী সমাধানের অনুপস্থিতির ভয়াবহ পরিণতি” বলে অভিহিত করেছে। দুটি সংস্থা যৌথ বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যেন রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ এবং বৈধ অভিবাসনের পথ খোলা হয়, এবং বাংলাদেশ-সহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে শরণার্থীদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়।
Human Rights Watch-এর তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগরে এই ধরনের শত শত মানব পাচার নৌযান বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরেও একটি রোহিঙ্গা নৌকা ডুবে কমপক্ষে ২১ জনের মৃত্যু হয়েছিল। প্রতিটি ঘটনার পর আন্তর্জাতিক উদ্বেগ প্রকাশ পায়, কিন্তু মানব পাচারের এই চক্র বন্ধ হয় না — কারণ মূল সমস্যাটি, অর্থাৎ রোহিঙ্গাদের জন্মভূমিতে ফেরার নিরাপদ পরিবেশ এবং আশ্রয়দাতা দেশে স্থায়ী বসবাসের অধিকার — কোনোটিই এখনো নিশ্চিত হয়নি।
আসাম ও ভারতের প্রেক্ষাপটেও এই ঘটনা প্রাসঙ্গিক। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে, বিশেষত আসাম ও দিল্লিতে, অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের উপস্থিতি একটি চলমান রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা-বিষয়ক আলোচনার বিষয়। হাইলাকান্দি ও বরাক উপত্যকার সীমান্তবর্তী অবস্থানের কারণে অবৈধ অনুপ্রবেশের প্রশ্নটি স্থানীয়ভাবেও প্রশাসনের নজরে রয়েছে। এই আন্তর্জাতিক মানবিক বিপর্যয়গুলো মনে করিয়ে দেয় যে মানব পাচার ও শরণার্থী সংকট কোনো দূরের সমস্যা নয় — এর ঢেউ সীমান্ত পেরিয়ে এই উপমহাদেশের প্রতিটি প্রান্তকেই স্পর্শ করে।
আন্দামান সাগরের এই মর্মান্তিক অভিবাসী নৌকা ডুবির ঘটনা আরও একবার স্মরণ করিয়ে দিল যে মানব পাচারের বিরুদ্ধে শুধু উদ্ধার অভিযান যথেষ্ট নয়। রোহিঙ্গা সংকটের মূলে থাকা রাজনৈতিক ও মানবিক প্রশ্নগুলোর সমাধান না হলে এই বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রা বন্ধ হবে না, এবং প্রতিবছর মানুষ জীবন দিয়ে চলবে একটুকরো নিরাপদ ভবিষ্যতের খোঁজে।