অসম সরকার এনএইচ-৩৭ মেরামত নিয়ে আবারও কেন্দ্রের কাছে দ্রুত পদক্ষেপের অনুরোধ জানিয়েছে। শ্রীভূমি শহর থেকে সুতারকান্দি স্থলবন্দর পর্যন্ত এই সড়কটি দীর্ঘদিন ধরেই খারাপ অবস্থায় রয়েছে, আর সে কারণেই স্থানীয় যাত্রী, ব্যবসায়ী ও সীমান্তপথে চলাচলকারী ট্রাকচালকদের ভোগান্তি বাড়ছে। বিধায়ক কৃষ্ণেন্দু পাল এই সমস্যার কথা তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার কাছে হস্তক্ষেপ চান। পরে রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণমন্ত্রী নীতিন গড়কড়ির কাছে রুটটির তাৎক্ষণিক সংস্কারের দাবি জানায়।
এই এনএইচ-৩৭ মেরামত শুধু একটি রাস্তার সংস্কার নয়; এটি শ্রীভূমি-সুতারকান্দি সীমান্ত করিডরের কার্যকারিতা বজায় রাখার প্রশ্ন। সুতারকান্দি স্থলবন্দর ভারত–বাংলাদেশ বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ, এবং এই পথে গমনাগমনকারী পণ্যবাহী যানবাহন, কাস্টমস-সংক্রান্ত পরিষেবা, স্থানীয় পরিবহন ও সাধারণ যাত্রী—সবাই এই সড়কের ওপর নির্ভরশীল। সড়কের গর্ত, জল জমা, ভাঙাচোরা অংশ এবং ধীরগতির কারণে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, সময় নষ্ট হয়, আর বাজার-সরবরাহেও প্রভাব পড়ে।
কেন এই করিডর এত জরুরি
এই এনএইচ-৩৭ মেরামত-এর দাবির পেছনে ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক—দুই ধরনের গুরুত্বই আছে। শ্রীভূমি থেকে সুতারকান্দি পর্যন্ত করিডরটি সীমান্ত-অর্থনীতির সেতু হিসেবে কাজ করে। এখানে সড়কের মান খারাপ হলে শুধু ব্যক্তিগত যাতায়াত নয়, সীমান্ত বাণিজ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহন, জরুরি পরিষেবা ও পর্যটন-সংক্রান্ত চলাচলও বাধাগ্রস্ত হয়। এমনকি বর্ষাকালে সমস্যা আরও বেড়ে যায়, কারণ ক্ষতিগ্রস্ত সড়কে জল জমে যাত্রা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
ন্যাশনাল হাইওয়ে-৩৭ ঐতিহাসিকভাবে অসমের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের নানা জেলার সঙ্গে যুক্ত একটি প্রধান সড়ক। কেন্দ্রীয় তথ্য অনুযায়ী, নতুন এনএইচ-৩৭ বা সংশ্লিষ্ট জাতীয় মহাসড়ক প্রকল্পগুলো অসমে বহু কিলোমিটারজুড়ে উন্নয়ন ও ৪-লেনিংয়ের আওতায় এসেছে। সংসদে জমা দেওয়া তথ্যেও দেখা যায়, নতুন NH-37 অংশগুলোর কাজ ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে, যদিও ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ-সংক্রান্ত দেরি কাজকে ধীর করেছে।
রাজ্য ও কেন্দ্রের মধ্যে আবেদন-প্রক্রিয়া
বিধায়ক কৃষ্ণেন্দু পাল প্রথমে স্থানীয় অসুবিধার কথা তুলে ধরেন এবং মুখ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে কেন্দ্রের কাছে পাঠান। রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নীতিন গড়কড়ির কাছে এই সড়কাংশের দ্রুত, পূর্ণাঙ্গ ও পরিকল্পিত মেরামতের জন্য আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে। এ ধরনের চিঠিপত্র প্রশাসনিক ভাষায় কাজকে ‘প্রাথমিক অনুমোদন’ বা ‘অগ্রাধিকার তালিকা’-তে তুলতে সাহায্য করে।
অসমে NH-37 ফোর-লেন প্রকল্পের জন্য কেন্দ্রীয় অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছিল, যা একই সড়ক নেটওয়ার্কের আধুনিকীকরণের অংশ। অন্যদিকে, TOI-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, কালিবোর-নুমালিগড় অংশে প্রায় ১,১৮৬ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন হয়েছিল, যা দেখায় যে কেন্দ্র অসমের জাতীয় সড়ক ব্যবস্থাকে ধাপে ধাপে উন্নত করছে। এই বৃহত্তর নীতিগত প্রেক্ষাপটে শ্রীভূমি-সুতারকান্দি অংশের মেরামতও গুরুত্ব পাচ্ছে।
স্থানীয়ভাবে এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো বাস্তব কাজ কবে শুরু হবে। কারণ চিঠি, প্রতিশ্রুতি ও প্রকল্প-ঘোষণার পরও অনেক সময় কাজের মাটি দেখা যায় না। সাধারণ মানুষের কাছে রাস্তার অবস্থা বিচার হয় তাদের যাতায়াতে কতটা সময় লাগছে, ট্রাক কতবার থামতে হচ্ছে, আর বর্ষায় কতটা সমস্যা বাড়ছে—এসব দিয়ে। তাই এনএইচ-৩৭ মেরামত নিয়ে এখন কাগজে নয়, মাঠে অগ্রগতি দেখতে চাইছে মানুষ।
বরাক উপত্যকা ও লালাবাজারের প্রভাব
এই এনএইচ-৩৭ মেরামত-এর প্রভাব শ্রীভূমি বা সুতারকান্দি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। লালাবাজার, হাইলাকান্দি এবং গোটা বরাক উপত্যকার যাত্রীরা ও ব্যবসায়ীরাও এ ধরনের রুটের উন্নয়ন থেকে পরোক্ষভাবে লাভবান হন। সীমান্ত করিডর মজবুত হলে পণ্য পরিবহন দ্রুত হয়, স্থানীয় বাজারে সরবরাহ স্থিতিশীল থাকে, আর জরুরি সময়ে জেলা থেকে জেলা বা রাজ্য থেকে রাজ্যে চলাচল সহজ হয়। এই অঞ্চলে চিকিৎসা, শিক্ষা ও বাণিজ্যিক ভ্রমণের ওপরও সড়ক যোগাযোগের বড় প্রভাব থাকে।
বরাক অঞ্চলের জন্য বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এখানকার অনেক ব্যবসা সড়কপথে শ্রীভূমি ও সীমান্ত-সংলগ্ন বাজারের সঙ্গে যুক্ত। রাস্তা ঠিক না থাকলে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, যা শেষ পর্যন্ত পাইকারি ও খুচরো দামের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। লালাবাজারের মতো স্থানীয় বাজারগুলিতে তাই এনএইচ-৩৭ মেরামত কেবল একটি সংবাদ নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের অর্থনৈতিক প্রশ্নও।
কী দেখার এখন
এখন নজর যাবে কেন্দ্রীয় সাড়া, সম্ভাব্য পরিদর্শন, আর বাস্তব মেরামত পরিকল্পনার ওপর। যদি দ্রুত টেন্ডার, বরাদ্দ ও কাজের সময়সূচি চূড়ান্ত হয়, তবে সড়কের ভোগান্তি কমতে পারে। আর যদি প্রশাসনিক স্তরে দেরি হয়, তাহলে বর্ষার মধ্যে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, এনএইচ-৩৭ মেরামত এখন শ্রীভূমি-সুতারকান্দি সীমান্ত করিডরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। সড়কটি ঠিকঠাক হলে বাণিজ্য, চলাচল ও আঞ্চলিক সংযোগ—তিনটিই স্বস্তি পাবে।