গ্রামীণ ডিজিটাল ব্যাংকিং পরিষেবাকে আরও শক্তিশালী করতে আসাম সরকার এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিল। ১৯ মে ২০২৬-এ কামরূপ জেলার আমিনগাঁওয়ে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে ডিজিপে সখী ল্যাপটপ আসাম কর্মসূচির আওতায় মোট ৭১ জন DigiPay Sakhi-কে ল্যাপটপ বিতরণ করা হয়। দীনদয়াল অন্ত্যোদয় যোজনা — জাতীয় গ্রামীণ জীবিকা মিশন (DAY-NRLM)-এর অধীনে পরিচালিত এই উদ্যোগের লক্ষ্য হল গ্রামের স্বনির্ভর গোষ্ঠীর (SHG) মহিলাদের ডিজিটাল ব্যাংকিং প্রতিনিধি হিসেবে প্রস্তুত করা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কামরূপ জেলার ডেপুটি কমিশনার দেবকুমার মিশ্র এবং জেলা প্রশাসনের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ আধিকারিক। এই ডিজিপে সখী ল্যাপটপ আসাম উদ্যোগ গ্রামীণ মহিলাদের প্রযুক্তিগত ক্ষমতায়নের দিক থেকে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
DigiPay Sakhi কী এবং কেন এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ
DAY-NRLM-এর অধীনে DigiPay Sakhi হলেন সেই মহিলারা, যাঁরা SHG-র সদস্যা হিসেবে তাঁদের গ্রামে ব্যাংকিং পরিষেবার সেতুবন্ধন তৈরি করেন। তাঁরা গ্রামবাসীদের ডিজিটাল পেমেন্ট, Direct Benefit Transfer (DBT) সংগ্রহ, এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ে সহায়তা করেন। Assam State Rural Livelihoods Mission (ASRLM)-এর তথ্য অনুযায়ী, আসাম এই DigiPay Sakhi উদ্যোগে গোটা দেশে এক শীর্ষস্থানীয় রাজ্য হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে — ২০২৫ সালের মার্চ মাসে আসামের DigiPay Sakhi-রা মোট ১.৬৯ লক্ষ ট্র্যানজাকশন সম্পন্ন করেছেন।
এই প্রেক্ষিতে ল্যাপটপ বিতরণের সিদ্ধান্তটি বিশেষভাবে কার্যকর। মোবাইল ফোনে সীমিত সুযোগের তুলনায় ল্যাপটপে বড় স্ক্রিন, দ্রুত প্রক্রিয়াকরণ, এবং একাধিক সেবা পরিচালনার সুবিধা রয়েছে। ডিজিপে সখী ল্যাপটপ আসাম কর্মসূচির মাধ্যমে এই মহিলারা আরও দক্ষতার সঙ্গে গ্রামীণ স্তরে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিতে পারবেন। প্রযুক্তির সহায়তায় তাঁদের কাজের পরিধি ও বিশ্বাসযোগ্যতা — দুটোই বাড়বে।
DAY-NRLM ও নারী স্বনির্ভরতায় জাতীয় প্রেক্ষাপট
DAY-NRLM বর্তমানে ভারতের সবচেয়ে বড় গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিগুলির একটি। কেন্দ্রীয় গ্রামীণ উন্নয়ন মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, এই মিশনের আওতায় সারা দেশে প্রায় ১০ কোটি মহিলাকে SHG-তে সংগঠিত করা হয়েছে এবং ব্যাংক লিঙ্কেজের মাধ্যমে ১২ লক্ষ কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। সম্প্রতি DAY-NRLM 2026–31 মেয়াদের জন্য নতুন কৌশলপত্র তৈরি করেছে, যেখানে ‘লখপতি দিদি’ মডেলকে ৬ কোটি মহিলার কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মার দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, এই উদ্যোগটি অন্ত্যোদয় এবং নারীশক্তির লক্ষ্যকে সামনে রেখে পরিচালিত হচ্ছে। DigiPay Sakhi-রা মধ্যস্থতাকারীদের নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি DBT পৌঁছানো, সরকারি সুবিধার স্বচ্ছ বিতরণ, এবং আর্থিক সাক্ষরতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন। ASRLM-এর কৌশলপত্রে উল্লেখ আছে, প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েতে একজন করে DigiPay Sakhi নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে — এটি বাস্তবায়িত হলে গোটা আসামের গ্রামাঞ্চলে একটি শক্তিশালী ডিজিটাল ব্যাংকিং জাল তৈরি হবে।
বারাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির সংযোগ
এই কর্মসূচি বর্তমানে কামরূপ জেলায় অনুষ্ঠিত হলেও ASRLM-এর কার্যক্রম আসামের প্রতিটি জেলায় বিস্তৃত — যার মধ্যে হাইলাকান্দি জেলাও রয়েছে। বারাক উপত্যকার গ্রামীণ এলাকায়, বিশেষ করে লালা, কাটলিছড়া ও আলগাপুরের মতো প্রত্যন্ত এলাকায় ব্যাংকিং পরিষেবার অভাব এখনও বড় সমস্যা। SHG মহিলাদের DigiPay Sakhi হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে এবং তাঁদের হাতে প্রযুক্তি তুলে দেওয়া হলে, এই অঞ্চলের পরিবারগুলি ঘরে বসেই সরকারি সুবিধা পেতে পারবেন।
হাইলাকান্দি জেলায় ASRLM-এর কর্মকাণ্ড ইতিমধ্যে SHG গঠন ও ব্যাংক সংযোগের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফলাফল দিচ্ছে। ডিজিপে সখী ল্যাপটপ আসাম কর্মসূচি যদি হাইলাকান্দি পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়, তাহলে লালার মতো শহরের আশপাশের গ্রামীণ নারীরাও এই সুযোগের আওতায় আসতে পারবেন। এটি কেবল আর্থিক লেনদেনের সুবিধাই নয়, নারীর সামাজিক মর্যাদা ও আত্মবিশ্বাসের ক্ষেত্রেও একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
SHG ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং ভবিষ্যতের পথ
গবেষণা বলছে, DAY-NRLM-এর সঙ্গে সংযুক্ত মহিলারা রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত — সব ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য উন্নতির কথা জানিয়েছেন। ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধি পেলে SHG সদস্যারা শুধু ব্যাংকিং এজেন্ট হিসেবে নয়, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবেও নিজেদের গড়ে তুলতে পারেন। ল্যাপটপের মাধ্যমে তাঁরা অনলাইন বাজার, সরকারি পোর্টাল, এবং দূরশিক্ষার সুযোগও নিতে পারবেন — যা একটি দীর্ঘমেয়াদি জীবিকার ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
আসাম সরকারের এই পদক্ষেপ কেবল একটি প্রযুক্তিপণ্য বিতরণ নয় — এটি গ্রামীণ মহিলাদের হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তি তুলে দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া। ডিজিপে সখী ল্যাপটপআসাম কর্মসূচির সাফল্য নির্ভর করবে প্রশিক্ষণ, ইন্টারনেট সংযোগ এবং স্থানীয় স্তরে ধারাবাহিক সহায়তার উপর। আগামী দিনে এই মহিলারা গ্রামীণ আসামের ডিজিটাল অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারেন — সেই সম্ভাবনার দিকেই এখন তাকিয়ে থাকছেন সরকার ও সুশীল সমাজ।