প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর পাঁচ দেশ সফর সফলভাবে শেষ করেছেন। সর্বশেষ গন্তব্য ইতালির রাজধানী রোমে বৈঠক সেরে বুধবার তিনি দেশে ফেরেন। UAE, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন ও নরওয়ে হয়ে ইতালিতে শেষ হওয়া এই সফরে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং কৌশলগত অংশীদারিত্ব নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। মোদির পাঁচ দেশ সফর ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে তার স্পষ্ট প্রতিফলন।
রোমে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদির দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হয়েছে। দুই নেতা যৌথ সংবাদ সম্মেলনেও অংশ নেন। উভয় দেশের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও গভীর করার বিষয়ে উভয় পক্ষই আগ্রহ দেখিয়েছে। মেলোনির সঙ্গে আলোচনায় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ-ভারত অর্থনৈতিক করিডোর (IMEC) নিয়ে বিশেষ মনোযোগ ছিল বলে ট্রিবিউন ইন্ডিয়া জানিয়েছে।
পাঁচ দেশ সফরে কী কী আলোচনা হলো
মোদির পাঁচ দেশ সফর শুরু হয়েছিল UAE থেকে। সেখানে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। এরপর নেদারল্যান্ডসে প্রযুক্তি ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে সহযোগিতার বিষয়টি আলোচনায় ছিল। সুইডেনে সবুজ প্রযুক্তি ও পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি নিয়ে কথা হয়েছে। নরওয়েতে সামুদ্রিক শিল্প ও শক্তি খাতে অংশীদারিত্বের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা এগিয়েছে। এবং সর্বশেষ ইতালিতে IMEC করিডোর ও কৌশলগত সম্পর্ককে কেন্দ্রে রেখে আলোচনা শেষ হয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, ইতালির সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে এই বৈঠকে।
এই সফরে মোদি ইতালির FAO সদর দফতরও পরিদর্শন করেছেন বলে জানা গেছে। ট্রিবিউন ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোদি বলেছেন, “ভারত ও ইতালির মধ্যে সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করার উপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।” তাঁর এই মন্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক আগামী দিনে আরও বিস্তৃত হতে পারে।
IMEC করিডোর কেন গুরুত্বপূর্ণ
মোদির পাঁচ দেশ সফরে IMEC করিডোর একটি পুনরাবৃত্ত বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। India-Middle East-Europe Economic Corridor বা IMEC হলো ভারত থেকে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপ পর্যন্ত একটি বহুমাধ্যম সংযোগ পরিকল্পনা, যা বাণিজ্য, শিপিং ও ডিজিটাল যোগাযোগকে নতুনভাবে সংগঠিত করতে পারে। ২০২৩ সালে G20 শীর্ষ সম্মেলনে এই পরিকল্পনার ঘোষণার পর থেকে এটি নিয়ে আলোচনা চলছে। ইতালির ভৌগোলিক অবস্থান ইউরোপের প্রবেশদ্বার হওয়ায় রোমের সঙ্গে আলোচনায় IMEC-এর প্রতিটি ইউরোপীয় সংযোগ নিয়ে কথা হওয়া স্বাভাবিক।
IMEC চালু হলে ভারতের রফতানি ও আমদানি রুটে বড় পরিবর্তন আসবে। বন্দর ব্যবস্থাপনা, শুল্ক সমন্বয় ও ডিজিটাল ট্রেড প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে যুক্ত হওয়া এই করিডোর ভারতের অর্থনৈতিক সংযোগকে বৈশ্বিক মানচিত্রে নতুনভাবে স্থাপন করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই করিডোর চীনের Belt and Road Initiative-এর বিকল্প হিসেবেও কার্যকর হতে পারে, যা ভূরাজনৈতিক দিক থেকেও ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
অসম ও উত্তর-পূর্বের সঙ্গে সংযোগ
মোদির পাঁচ দেশ সফর কেন্দ্রীয় বৈদেশিক নীতির অংশ হলেও এর প্রভাব দেশের প্রতিটি অঞ্চলে পড়ে। বাণিজ্য চুক্তি, বিনিয়োগ সুযোগ এবং প্রযুক্তি সহযোগিতা শেষ পর্যন্ত রাজ্য পর্যায়ে কর্মসংস্থান ও উন্নয়নে প্রভাব ফেলে। অসমে বিশেষত চা শিল্প, বাঁশজাত পণ্য, হস্তশিল্প ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়লে সরাসরি রাজ্যের রফতানি আয় বৃদ্ধি পেতে পারে।
হাইলাকান্দি জেলা ও লালা টাউনের মতো বারাক ভ্যালির এলাকায় চা বাগান এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উপস্থিতি আছে। কেন্দ্রীয় সরকার যদি ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণে আগামী দিনে নতুন উদ্যোগ নেয়, তাহলে উত্তর-পূর্বের এই অঞ্চলগুলির পণ্যেরও আন্তর্জাতিক চাহিদা বাড়তে পারে। তবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে স্থানীয় উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরও কেন্দ্রীয় বাণিজ্য পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় থাকাটা জরুরি।
মোদির পাঁচ দেশ সফর সম্পন্ন হওয়ার পর এখন দেখার বিষয় হবে, এই সফরে স্বাক্ষরিত বা আলোচিত চুক্তিগুলো কত দ্রুত বাস্তবায়নের পথে এগোয়। IMEC করিডোর, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বের মতো বিষয়গুলো কার্যকর হতে সময় লাগলেও, এই সফর ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি সক্রিয় ও বহুমুখী যুগের ইঙ্গিত দিচ্ছে।