জ্বালানির দাম বৃদ্ধি প্রতিবাদ জানাতে গুয়াহাটির রাস্তায় নামল CPI(M)। পেট্রোল-ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং LPG সরবরাহ সংকটকে কেন্দ্র করে দলটি সম্প্রতি গুয়াহাটিতে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে। বিক্ষোভকারীরা কেন্দ্রীয় সরকারের জ্বালানি মূল্যনীতির বিরুদ্ধে সরব হয়ে অবিলম্বে দাম কমানোর দাবি জানিয়েছেন। এই কর্মসূচি এমন এক সময়ে হলো যখন সারা দেশ, বিশেষ করে অসমের বিভিন্ন জেলায়, LPG সিলিন্ডারের মূল্য সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের উপর ভারী চাপ ফেলছে।
বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা জানান, শুধু পেট্রোল-ডিজেল নয়, বাণিজ্যিক LPG সিলিন্ডারের দাম হঠাৎ এবং ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়া সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। ছোট হোটেল, রেস্তোরাঁ, চায়ের দোকান থেকে শুরু করে গৃহস্থালির রান্নাঘর পর্যন্ত সবখানেই এই চাপ অনুভূত হচ্ছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি প্রতিবাদে বিভিন্ন দলের কর্মসূচি এখন অসমজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
LPG মূল্যবৃদ্ধি অসম: কতটা বেড়েছে দাম
এ বছরের শুরু থেকে পর্যায়ক্রমে LPG সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে। ইন্ডিয়া টুডে-র তথ্য অনুযায়ী, ১ মে ২০২৬ থেকে ১৯ কেজির বাণিজ্যিক LPG সিলিন্ডারের দাম একধাক্কায় ৯৯৩ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এর আগে মার্চ ও এপ্রিলে পর্যায়ক্রমে দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, গুয়াহাটিতে বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের দাম এখন ৩,২৯৩ টাকা ছুঁয়েছে। তবে বারাক ভ্যালিতে পরিবহণ খরচ যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন।
ব্যবহারিক দিক থেকে দেখলে, যে রেস্তোরাঁ বা হোটেল মাসে ১০টি বাণিজ্যিক সিলিন্ডার ব্যবহার করে, তার খরচ এক মাসেই প্রায় ১০,০০০ টাকার বেশি বেড়ে গেছে। অল অসম রেস্তোরাঁ অ্যাসোসিয়েশন (AARA) এরই মধ্যে সতর্ক করেছে যে এভাবে দাম বাড়তে থাকলে অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। সেই সঙ্গে রেস্তোরাঁ ও হোটেলে খাবারের দামও ১০-২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
CPI(M)-এর পলিট ব্যুরো ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকারকে LPG মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে। দলটির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “বাণিজ্যিক এবং ৫ কেজির সিলিন্ডারের দামে এই ব্যাপক বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠেছে। অবিলম্বে এই মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যাহার করতে হবে।”
গুয়াহাটি বিক্ষোভ ও বিরোধী দলগুলোর একত্রীকরণ
শুধু CPI(M) নয়, অসমে একাধিক বিরোধী দল এবং সংগঠন জ্বালানির দাম বৃদ্ধি প্রতিবাদে পথে নেমেছে। গুয়াহাটির কটন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ছাত্র মুক্তি সংগ্রাম সমিতি পেট্রোল, ডিজেল ও LPG-র মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখিয়েছে। কংগ্রেস দলও পিছিয়ে নেই। অসম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি (APCC) মার্চ মাসে রাজ্যজুড়ে বিক্ষোভের নির্দেশ দিয়েছিল। APCC সভাপতি গৌরব গগৈ-এর নির্দেশে জেলায় জেলায় বাজার এলাকায় বিক্ষোভ পালিত হয়েছে।
APCC-র বিবৃতিতে বলা হয়, “ঘরের রান্নার গ্যাস এবং বাণিজ্যিক সিলিন্ডার — দুই দিক থেকেই সাধারণ মানুষ আক্রান্ত। সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।” বিরোধী দলগুলোর এই সমবেত সক্রিয়তা দেখাচ্ছে যে জ্বালানি সংকট কেবল অর্থনৈতিক প্রশ্ন নয়, এটি ক্রমশ রাজনৈতিক চাপের বিষয়ও হয়ে উঠেছে।
হাইলাকান্দি ও বারাক ভ্যালিতে সবচেয়ে বেশি মার
বারাক ভ্যালির হাইলাকান্দি, কাছাড় ও করিমগঞ্জ জেলায় বাণিজ্যিক LPG সিলিন্ডারের দাম গুয়াহাটির চেয়েও বেশি। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে হাইলাকান্দি সহ বারাক ভ্যালি ও পার্বত্য জেলাগুলোতে ১৯ কেজির বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের দাম ৩,৫০০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। পরিবহণ দূরত্ব ও অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে এই অতিরিক্ত ব্যয় অনিবার্যভাবে যুক্ত হয়।
লালা টাউনের ছোট হোটেল, চায়ের দোকান এবং মুদি দোকানের মালিকদের জন্য এই মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণ হচ্ছে। যাঁরা দিনে ২-৩টি সিলিন্ডার ব্যবহার করেন, তাঁদের মাসিক খরচ কয়েক হাজার টাকা বেড়েছে। এই চাপ তারা পুরোপুরি ক্রেতার উপর চাপাতে না পারায় মুনাফা কমছে। অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ইতিমধ্যেই পরিচালন খরচ কমাতে বিভিন্ন পথ খুঁজছেন। সুতরাং জ্বালানির দাম বৃদ্ধি প্রতিবাদ এই অঞ্চলে কেবল রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, এটি স্থানীয় জীবিকার প্রশ্নও।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধি প্রতিবাদ এখন অসমজুড়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি ইস্যু হয়ে উঠছে। বিরোধী দলগুলো কেন্দ্রীয় সরকারের উপর চাপ বাড়াচ্ছে, আর সাধারণ মানুষ প্রতিদিনের বাজারে গিয়ে পার্থক্যটা হাড়ে হাড়ে বুঝছেন। আগামী দিনে সরকার মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যাহার করে বা কোনো ভর্তুকি ব্যবস্থার কথা ঘোষণা করে কিনা, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ততদিন বারাক ভ্যালির মতো প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষদের এই বাড়তি খরচ বহন করতেই হবে।